জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ধর্ষণ, নির্যাতনের প্রতিবাদ: নিরাপত্তা চেয়ে মধ্যরাতে নারীদের পদযাত্রা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪: ৪১
শেকল ভাঙার পদযাত্রা। স্ট্রিম ছবি

ধর্ষণ, নির্যাতন, নারী বিদ্বেষের প্রতিবাদ ও নিরাপত্তার দাবিতে মধ্যরাতে ‘শেকল ভাঙার পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কর্মসূচিতে নারী অধিকারকর্মী, মানবাধিকারকর্মী, সংস্কৃতিকর্মীরা ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। যৌন সহিংসতায় যুক্ত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসহ ১০ দফা দাবি তুলে ধরেন তাঁরা।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে রাজধানীর শাহবাগ মোড় থেকে পদযাত্রাটি শুরু হয়। এরপর কাঁটাবন, সাইয়েন্সল্যাব, কলাবাগান, ধানমন্ডি ৩২, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয় এলাকা ঘুরে জাতীয় সংসদ ভবরনের সামনে গিয়ে প্রতিবাদী অবস্থানের মাধ্যমে শেষ হয়।

বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্লেকার্ড ও মশাল হাতে পদযাত্রা শুরু করেন তাঁরা। এ সময় প্রায় ২০০ নারী-পুরুষ পদযাত্রায় অংশ নেন। পদযাত্রায় তাঁরা ‘নারী থেকে নারীতে, বিদ্রোহ ছুঁয়ে যাক’, ‘রোকেয়ার বাংলায়, নারী বিদ্বেষের ঠাঁই নাই’, ‘দিনে হোক রাতে হোক, সামলিয়ে রাখো চোখ’ ‘পুরুষের ক্ষমতা, ভেঙে হোক সমতা’, ‘নির্বাচিত সরকার, আনভীরের চাই বিচার’, ‘রক্ত দিল জনতা, এবার চাই সমতা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন।

পদযাত্রায় অংশ নেওয়া নারীরা জানান, ‘দিনে হোক বা রাতে, স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে, নারী হিসেবে আমাদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। অপরাধ সংঘটিত হলেই “মেয়েরা এত রাতে বাইরে কেন?”-জাতীয় সামাজিক ট্যাবু বন্ধ করে দিতে চাই।’

শেকল ভাঙার পদযাত্রার সংগঠক ও গবেষক ইশাবা শুহরাত স্ট্রিমকে বলেন, ‘নারী নির্যাতনের যে বিচারগুলো গত স্বৈরাচারের সময়ে ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে হয়নি, আমরা চাই যে নির্বাচিত সরকার আসবে, তারা যেন বিচারগুলো করে। বিশেষ করে বসুন্ধরা গ্রুপের সায়েম সোবহান আনভীর, আপন জুয়েলার্সের সাফাত আহমেদ এবং এই ধরনের শিল্পপতি বা ধনকুবেরদের—যারা রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে থাকার কারণে বিচারের মুখোমুখী হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই তাদের অনেক সময় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

ইশাবা শুহরাত আরও বলেন, ‘পাহাড়ে নারীরা বিভিন্নভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। কিন্তু সেটা বিচার হওয়া তো দূরের কথা, মেইনস্ট্রিম সংবাদমাধ্যমেও সেসব ঘটনার খবর আমরা দেখতে পাই না। আমরা চাই সেই সংবাদগুলোও আসুক এবং সেগুলোর বিচার হোক।’

শেকল ভাঙ্গার পদযাত্রার আরেকজন সংগঠক ও অ্যাক্টিভিস্ট প্রাপ্তী তাপসী স্ট্রিমকে বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সামনের কাতারে ছিলেন নারীরা, কিন্তু গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়েও নারীদের প্রতি কাঠামবদ্ধ নিপীড়ন, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং আইনসিদ্ধ নিপীড়নের চিত্র পাল্টায়নি। আমরা দেখেছি, যুগ যুগ ধরে চরিত্র হননকারী ধারাগুলো আইনে রয়েছে, সেগুলো এখনো বিদ্যমান।’

প্রাপ্তী তাপসী আরও বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণার নামে, ধর্মীয় বক্তব্যের নামে নারীর প্রতি অবমাননাকর, নিপীড়নমূলক ও বিদ্বেষমূলক বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ইলেকশন কমিশন থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার—কেউই এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। নারীদের বাদ দিয়ে কোনো রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক রূপান্তর সম্ভব নয়।’

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে পদযাত্রা শেষে অবস্থান। স্ট্রিম ছবি
জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে পদযাত্রা শেষে অবস্থান। স্ট্রিম ছবি

নির্বাচন-পরবর্তী সরকার যদি নারী নির্যাতকদের বিচার না করে তাহলে তাদের সব সময় চাপের মুখে রাখা হবে বলেও উল্লেখ করেন তাপসী।

পদযাত্রায় অংশ নেওয়া সংগীতশিল্পী সায়ান স্ট্রিমকে বলেন, ‘যে সংগ্রামটা চলছে, সেটা ধারাবাহিকভাবে চলতে হবে এবং সেখানে সবাইকেই অংশ নিতে হবে। নারীদের অধিকারগুলো আদায় করে আনতে হবে এবং পুরুষতন্ত্র বলতে আমরা যা বুঝি—এই যে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা, মানুষকে শাসন, দমন, নিপীড়ন, অপমান করার যে প্রবণতা—সেটাকে একেবারে উৎপাটন করা যায়, সেই প্রক্রিয়াটার জন্যই কিন্তু এই আয়োজনগুলো।’

পদযাত্রা শেষে ১০টি দাবি তুলে ধরেন সংগঠকরা। দবিগুলো হলো—

১. ধর্মীয় বক্তব্যের নামে অনলাইনে ও অফলাইনে নারী অবমাননাকর বক্তব্য প্রচার বন্ধ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

২. ধর্ষণ মামলার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ (সংশোধিত) এর ১৪৬ (৩) ধারা পুনঃসংস্কার করার মাধ্যমে আইনের দিক সহ জাতি-ধর্ম-বর্ণ-বয়স-লৈঙ্গিক পরিচয় নির্বিশেষে যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে যেকোনোভাবেই 'ভিক্টিম ব্লেমিং' (দোষারোপ করা/নিন্দা জানানো) বন্ধ করতে হবে।

৩. সায়েম সোবহান আনভীর, শাফাত আহমেদের মত শিল্পপতি-ধনকুবেরদের নারী নিপীড়নমূলক অপরাধ বিচারের আওতায় এনে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে অন্যায্যভাবে খারিজ হয়ে যাওয়া মামলাগুলো পুনঃতদন্তের ব্যবস্থা করতে হবে।

৪. সেনা প্রহরার পাহাড়ে নারীর ওপর সংঘটিত সামরিক-বেসামরিক পুরুষদের যৌন সন্ত্রাসের খবরসমূহ গণমাধ্যমে আসার অবাধ প্রক্রিয়া নিশ্চিতকরণ, অভিযোগ যথাযথভাবে আমলে নেওয়া ও সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে পাহাড়ে নারীর জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

৫. মাদ্রাসার শিশুসহ সকল শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হলে ৯০ দিনের মধ্যে দ্রুততম ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে হবে।

৬. হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সরকারি, বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে যৌন নির্যাতনবিরোধী সেল কার্যকর ও পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। সিডো সনদে বাংলাদেশকে স্বাক্ষর ও তার পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে।

৭. প্রাথমিক লেভেল থেকেই পাঠ্যপুস্তকে যৌন শিক্ষা (গুড টাচ-ব্যাড টাচের শিক্ষা, সম্মতি বা কন্সেন্ট এর গুরুত্ব, প্রাইভেট পার্টস সম্পর্কে অবহিত করা) যোগ করার সাথে সাথে এর কার্যকরী পাঠদান নিশ্চিত করতে হবে।

৮. যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে প্রান্তিক অঞ্চলের নারীদের সুবিধার্থে হটলাইনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। গ্রামীণ সালিশ/পঞ্চায়েতের মাধ্যমে ধর্ষণের অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে।

৯. কোনো নারী নিপীড়নের শিকার হলে অভিযোগ জানাতে গেলে থানা ও আদালতে পুলিশি ও অন্যান্য হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

১০. গণপরিবহনে নারীদের সুরক্ষা এবং নিরাপত্তার ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে।

উল্লেখ্য, ২০২০ সালের ধর্ষণবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে শেকল ভাঙার পদযাত্রা নামের প্ল্যাটফর্মটি। এটি ছিল পদযাত্রার পঞ্চম পর্ব।

Ad 300x250

সম্পর্কিত