নির্বাচনী ইশতেহার রাজনৈতিক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এটি কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির তালিকা নয়, বরং অনেকটা ভোটারদের সঙ্গে দলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের লিখিত চুক্তি। বাংলাদেশ যখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন প্রধান দুই বিরোধী দল—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী—তাদের ইশতেহারের মাধ্যমে রাজনৈতিক পুনর্গঠনের ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছে। যা বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারসহ বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
উভয় দলই তাদের ইশতেহারে সংস্কার, জবাবদিহিতা, যুবকদের কর্মসংস্থান, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে দুটি দলের মধ্যে নীতিগত গভীরতা, আদর্শিক প্রতিফলন এবং বাস্তবায়নযোগ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শূন্যস্থান ধরা পড়ে। সেই সঙ্গে এমন কিছু দুর্বলতাও সামনে আসে, যা ভোটারদের দৃষ্টিকোণ থেকে মনোযোগ দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
বিএনপির ইশতেহার পরিসর ও কর্মসূচির দিক থেকে বিস্তৃত। এটা অনেকটা সামাজিক-অর্থনৈতিক সনদের মতো, যেখানে কল্যাণ কর্মসূচির সম্প্রসারণ, শাসনব্যবস্থা সংস্কার, প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত করা, সাংবিধানিক পুনর্গঠন এবং প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার পরিকল্পনা একীভূত হয়েছে। পরিবার সহায়তা কার্ড, কৃষক সহায়তা কার্ড, স্বাস্থ্যখাতে জনবল বৃদ্ধি, যুব কর্মসংস্থান উদ্যোগ এবং বড় আকারের পরিবেশ পুনরুদ্ধার কর্মসূচির মতো প্রস্তাবগুলো একটি কল্যাণ ও উন্নয়নমুখী রাষ্ট্র নির্মাণের ইঙ্গিত দেয়।
এছাড়াও, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫% বরাদ্দের লক্ষ্যমাত্রা দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ পুনর্গঠনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি দলটি নির্বাচন ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দমনমূলক আইন বাতিল এবং দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপের ওপরও জোর দিয়েছে।
৪ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় হোটেল শেরাটনে ইশতেহার ঘোষণা করছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সংগৃহীত ছবিপরিসরের এই বিস্তৃতি বিএনপির ইশতেহারের শক্তি, আবার এটিই এর প্রধান দুর্বলতা। প্রতিশ্রুতিতে সমৃদ্ধ হলেও বাস্তবায়নের ক্রমধারা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে এটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। বৃহৎ কল্যাণমূলক কর্মসূচি, উচ্চাভিলাষী জিডিপি লক্ষ্যমাত্রা এবং বিভিন্ন খাতভিত্তিক সংস্কার পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হলেও সেগুলোর অর্থায়ন, রাজস্ব কৌশল বা ধাপভিত্তিক সময়সূচি যথেষ্ট স্পষ্ট নয়। ইশতেহারটি কী করা হবে তা দৃঢ়ভাবে বললেও, কীভাবে এবং কোন ক্রমে করা হবে—সে বিষয়ে পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়। আর্থিকভাবে সীমাবদ্ধ এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চাপে থাকা রাষ্ট্রব্যবস্থায় ‘কী করা হবে’— এর চেয়ে ‘কীভাবে করা হবে’বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর ইশতেহার কাঠামোগত দিক থেকে বেশি মনোযোগী এবং ধারণাগতভাবে ‘নিরাপদ, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র’ গঠনের লক্ষ্যে নির্মিত। এখানে রাজনৈতিক সংস্কার, সংসদীয় ভারসাম্য, আইনের শাসন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, বৈষম্য দূরীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক রূপান্তরের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও সংসদীয় তদারকি জোরদার করা, বিরোধী দলের ভূমিকা বৃদ্ধি এবং শাসনকার্যে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রস্তাবের পাশাপাশি উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও আয় বৃদ্ধির দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রাও এতে তুলে ধরা হয়েছে।
জামায়াতের ইশতেহারের শক্তির জায়গা হলো, এখানে প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ও সংসদীয় কার্যকারিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া, যা নির্বাচনী ইশতেহারে প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। তবে বিএনপির ইশতেহারের মতো এখানেও বাস্তবায়ন রোডম্যাপ পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা খানিকটা উচ্চাভিলাষী এবং তা অর্জনের নীতিগত রোডম্যাপ বা কৌশলও স্পষ্ট নয়। শাসনব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাবগুলো নীতিগতভাবে শক্তিশালী হলেও বিদ্যমান আইনি বা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে থেকে সেগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা সুস্পষ্টভাবে বলা হয়নি। অর্থাৎ ইশতেহারটি যতটা না বাস্তবায়নের রূপরেখা দেয়, তার চেয়ে বেশি সংস্কারের নির্দেশনা দেয়।
মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে জামায়াতের ইশতেহারের প্রতি অনেকের আগ্রহের দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকার কারণে অনেকেই এখনো তাদের সংশয়ের দৃষ্টিতে দেখে। তারা তাদের ইশতেহারের অষ্টম ভাগে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থানকে গুরুত্ব দিয়ে জানিয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের মূল আদর্শ— সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করবে। শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের ‘সঠিক ইতিহাস’ তুলে ধরার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি। তবে তাদের ‘সঠিক’ ইতিহাস ঠিক কতটা নিরপেক্ষ হবে এবং সেখানে তাদের নিজেদের ভূমিকাকে তারা কীভাবে তুলে ধরবে সেটাও ভোটারদের একটা আগ্রহের বিষয় হতে পারে।
বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ করেন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। স্ট্রিম ছবিদল দুটির ইশতেহারের পার্থক্য কেবল যে আদর্শিক, তা নয়; বরং কাঠামোগতও বটে। বিএনপির ইশতেহার নীতিগতভাবে দৃঢ় হলেও অর্থসংস্থান ও বাস্তবায়নের দিক থেকে কম বিবৃত। জামায়াতের ইশতেহার প্রাতিষ্ঠানিক ভাষায় সমৃদ্ধ, কিন্তু বাস্তব নীতিগত উপকরণে তুলনামূলকভাবে দুর্বল। একদিকে কল্যাণমুখী বণ্টন ও শাসনব্যবস্থা সংস্কারের ওপর জোর আরোপ, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও নীতিনিষ্ঠ শাসন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব আরোপ। একটি ইশতেহার ভোটারকে আশ্বস্ত করতে চায় কর্মসূচির পরিমাণ দিয়ে, অন্যটি নীতিনির্ভর শাসনকাঠামো দিয়ে।
তবে উভয়ের মধ্যে মিলও আছে। দুই ইশতেহারেই দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা, নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার এবং নাগরিক কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; দুটি ইশতেহারেই বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর জনগণের অবিশ্বাসের বাস্তবতা স্বীকার করেছে। কিন্তু কোনো ইশতেহারই আধুনিক জবাবদিহি ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ-- যেমন বাধ্যতামূলক সম্পদ প্রকাশ ব্যবস্থা, উন্মুক্ত রাজনৈতিক অর্থায়ন ডাটাবেজ ইত্যাদির ওপর যথাযথ গুরুত্বারোপ করেনি। উভয় ইশতেহারে দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি জোরালোভাবে উচ্চারিত হলেও সেগুলো যথেষ্ট কৌশলসমৃদ্ধ নয়।
আরেকটি যৌথ দুর্বলতা হলো পরিমাপযোগ্যতা। প্রথম ১০০ দিন, প্রথম বছর বা পূর্ণ মেয়াদের জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য ও সূচক দুই ইশতেহারেই সীমিত। পরিমাপযোগ্য মাইলফলক ছাড়া নাগরিকদের পক্ষে অগ্রগতি যাচাই করা কঠিন। আন্তর্জাতিকভাবে আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনে নীতি মূল্যায়নে পরিমাপযোগ্য সূচক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয়।
আরও একটি বিষয় যা দুই দলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য; সেটি হলো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি তখনই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়, যখন সেখানে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকে। অর্থাৎ এমন কিছু প্রতিশ্রুতি থাকা জরুরি, যা ভবিষ্যৎ ক্ষমতাসীন দলকেও নিয়ন্ত্রণ করবে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন তা ভবিষ্যৎ ক্ষমতাসীন দলের ক্ষমতার ওপরও সীমা টেনে দেয়। প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা কেবল সদিচ্ছার ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; এর জন্য দরকার আইনি সুরক্ষা, স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং আন্তঃদলীয় তদারকি কাঠামো। এই দিকগুলো দুই ইশতেহারেই তুলনামূলকভাবে অপরিণত।
জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভোটারদের জন্য এই ইশতেহারগুলো পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার সুযোগ নেই; কেননা এগুলো রাষ্ট্রব্যবস্থার নানান সংকট ও অর্থনৈতিক চাপের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এসেছে। কিন্তু বৈশ্বিক রাজনীতিতে এখন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের কর্মপরিকল্পনাই সবচেয়ে বড় বিষয়। সমকালীন বিশ্বব্যবস্থা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে এই মুহূর্তে এমন ইশতেহার প্রয়োজন যা কেবল প্রতিশ্রুতি দেবে না, বরং বাস্তবায়নের বাস্তবতার সাপেক্ষে দিকনির্দেশনাও দেবে। সত্যিকার অর্থে যে দল ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়ন পরিকল্পনা, আইনি সুরক্ষা এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রাসহ সংস্কারকে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় রূপ দিতে পারবে, তারাই ভবিষ্যতে রাষ্ট্রচালনার বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করবে।
লেখক: অধ্যাপক ও সভাপতি, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়