জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি

গলাকাটা ভাড়ায় নাকাল রাঙ্গাবালীর মানুষ

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে চলাচলের প্রধান মাধ্যম স্পিডবোট ও ট্রলার। স্ট্রিম ছবি

পটুয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালীবাসীর চলাচলের প্রধান মাধ্যম লঞ্চ, স্পিডবোট ও মোটরসাইকেল। তবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও সংকটের অজুহাতে নৌ-স্থল দুই পথেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে গুণতে হচ্ছে দ্বিগুণ ভাড়া। এতে চলাচলে ত্রাহি অবস্থা স্থানীয়দের।

রাঙ্গাবালীর ছয় ইউনিয়নের চারটিই বিচ্ছিন্ন। চরমোন্তাজ, চালিতাবুনিয়া, মৌডুবি ও বড়বাইশদিয়া ইউনিয়ন থেকে বের হতে পাড়ি দিতে হয় নদী। অন্য উপজেলা বা জেলা সদরে যেতেও নদী পার হতে হয়। এতে যোগাযোগে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয় ট্রলার ও স্পিডবোট। আর স্থলপথে চলাচল মূলত মোটরসাইকেলনির্ভর।

স্থানীয়রা জানান, জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরে যেতে প্রথমে রাঙ্গাবালী সদর থেকে কোড়ালিয়া স্পিডবোট ঘাটে যেতে হয়। আগে এই পথে মোটরসাইকেলে ভাড়া ছিল ১০০ টাকা। এখন নেওয়া হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা। আর কোড়ালিয়া থেকে স্পিডবোটে পাশের গলাচিপা উপজেলার বোয়ালিয়া ঘাটে যেতে ১৪০ টাকার জায়গায় গুণতে হচ্ছে ১৭০ টাকা।

পটুয়াখালী থেকে ফেরার পথে কোড়ালিয়া স্পিডবোট ঘাটে শিক্ষার্থী রায়হান মাহমুদ বলেন, সকালে জেলা শহরে পরীক্ষা দিতে স্পিডবোটে গেছি ১৭০ টাকা দিয়ে। তবে সন্ধ্যা পর একই টিকিট কাটতে হয়েছে ২০০ টাকায়। তেলের সংকট দেখিয়ে আমাদের সঙ্গে জুলুম করছে স্পিডবোট কর্তৃপক্ষ।

মোটরসাইকেলে ভাড়া বেড়ে দ্বিগুণ

উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ভাড়া বাড়িয়েছেন মোটরসাইকেলচালকরা। সড়ক পথে চলাচলের প্রধান বাহন হওয়ায় বাধ্য হয়েই যাত্রীরা বেশি ভাড়া গুণছেন।

স্থানীয় হাসান মাহমুদ জানান, উপজেলা সদর ইউনিয়নের খালগোড়া থেকে বাহেরচর যেতে আগে ভাড়া ছিল ৪০ টাকা, এখন তা বেড়ে ১০০ হয়েছে। আমিলীবাড়িয়া থেকে বাহেরচরের ৩০ টাকা ভাড়ার জায়গায় আদায় করা হচ্ছে ৮০ টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া নেতা বাজার থেকে কোড়ালিয়া ঘাটে ১২০ টাকার ভাড়া বেড়ে হয়েছে ২০০ টাকা।

সংকট ছিল আগে থেকেই

রাঙ্গাবালীতে কোনো ফিলিং স্টেশন না থাকায় জ্বালানি তেলের সংকট বেশ পুরোনো। পাশের গলাচিপা উপজেলায়ও কোনো ফিলিং স্টেশন। এতে তেল আনতে হয় জেলা সদর পটুয়াখালী অথবা ঝালকাঠির ডিপো থেকে। এরপর খুচরায় সেই তেল বিক্রি হয়। এতে আগে থেকেই এখানে তেলের দাম লিটার ২০-৩০ টাকা বেশি রাখা হতো।

তবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর দেশব্যাপী জ্বালানি সংকটে রাঙ্গাবালীতে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। সরকার জ্বালানির দাম বাড়ালেও সংকট কাটেনি। এখন এই দুই বিষয় দেখিয়েই বাড়তি ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

মোটরসাইকেল ও স্পিডবোট চালকদের দাবি, গত দুই মাস ধরেই পেট্রোল-অকটেন পাওয়া যাচ্ছে না। কিছু ব্যবসায়ী তেল আনলেও বেশি দামে বিক্রি করছেন। এ কারণে তারা বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন।

কোড়ালিয়া ঘাট এলাকার মোটরসাইকেলচালক রাউফুন মাতুব্বর বলেন, ‘আমরা বাড়তি ভাড়া নেই, এটা ঠিক। কিন্তু আমাদেরও বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। এক লিটার পেট্রোল কিনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ২২০ টাকায়। আমরা যদি আগের রেটে ভাড়া নিই, তাহলে তো বাড়ি থেকে টাকা এনে গাড়ি চালাতে হবে। বেশি ভাড়া নিতে আমাদেরও বিবেকে বাধা দেয়, কিন্তু কিছু করার নেই।’

স্পিডবোট মালিক পক্ষের কামরুল মৃধার বলেন, ‘আমাদের বাড়তি দামে তেল কিনতে হচ্ছে। এ কারণে ভাড়া একটু বেশি নেওয়া হচ্ছে। সরকারি দামে তেল পাচ্ছি না। পেলে ভাড়া কমানো হবে।’

তবে কোড়ালিয়া স্পিডবোট ঘাটের যাত্রী সিয়াম হোসেনের অভিযোগ, ‘রাঙ্গাবালীতে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। আর স্পিডবোট কর্তৃপক্ষ তো রাঙ্গাবালী থেকে জ্বালানি নেয় না, তারা তো সরকারি দামেই কিনতে পারছে, তারা কেন এত বেশি ভাড়া নিচ্ছে?’

বেশি দামে তেল বিক্রি নিয়ে উপজেলা সদরের বাহেরচর বাজারের ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন বয়াতি বলেন, ঝালকাঠি থেকে তেল আনতে হয়, কিন্তু চাহিদামতো পাই না। ১০০ ব্যারেল লাগলে দেয় ৫ ব্যারেল। সেখানেও বেশি দাম নেওয়া হয়। সরকারি দামে তেল কিনতে পারলে সেই দামেই বিক্রি করব।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খায়রুল হাসান বলেন, রাঙ্গাবালী উপজেলায় পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ রয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য ইউনিয়নভিত্তিক কমিটি করা হয়েছে। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

বেশি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে ইউএনও বলেন, আমাদের মনিটরিং কার্যক্রম চলমান রয়েছে। কেউ যদি ভাড়া বেশি নেয়, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত