ড. আইনুন নিশাতের সাক্ষাৎকার

প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, হাওরে ফসলহানির মূল কারণ ব্যবস্থাপনার ত্রুটি

ড. আইনুন নিশাত জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ ও পানিসম্পদ বিষয়ে বাংলাদেশের পথিকৃৎ বিশেষজ্ঞ। তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইমেরিটাস অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের উপদেষ্টা। বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থায় জলবায়ু ও পানিবিষয়ক নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। নদী ব্যবস্থাপনা, মৌসুমি বন্যা, হাওরের ফসলহানি ও নীতিনির্ধারণী সমস্যাসহ নানা বিষয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

প্রকাশ : ১১ মে ২০২৬, ১৮: ৫১
ড. আইনুন নিশাত

স্ট্রিম: প্রায় প্রতিবছরই এপ্রিল-মে মাসের দিকে বন্যায় দেশের উত্তরাঞ্চলে এবং হাওর এলাকায় ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি হয়। এ বছরও সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোণায় হঠাৎ বৃষ্টি এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র মিডিয়ায় এসেছে। প্রতিবছর ঘটা এই দুর্যোগকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন? এর থেকে উত্তরণের কোনো পথ আছে কি?

ড. আইনুন নিশাত: ধন্যবাদ। আসলে এই সমস্যাটাকে আমি প্রায় স্বাভাবিক বলেই মনে করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন বৃষ্টিপাতের সময় কিছুটা বদলে গেছে। মার্চ-এপ্রিলের দিকে এমন পানি আসাটা এখন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর মে মাসে তো হাওর এলাকা পানিতে থইথই করে।

এই ব্যবস্থাপনা বুঝতে হলে আগে হাওর বা বিল অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি বুঝতে হবে। সিলেট বিভাগের জেলাগুলোর পাশাপাশি নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভূ-প্রকৃতি প্রায় একই রকম। চলনবিল এবং ফরিদপুর-মাদারীপুর এলাকার বিলগুলোও হাইড্রোলজিক্যালি (জলতাত্ত্বিকভাবে) একইভাবে কাজ করে।

হাওর আসলে কী, সেটা আগে পরিষ্কার করা দরকার। হাওরের চারপাশটা নদীর পাড়ের কারণে একটু উঁচু হয়, আর মাঝখানটা নিচু গর্ত বা গামলার মতো। বর্ষায় পুরো এলাকা যখন পানিতে তলিয়ে যায়, তখন তাকে আমরা হাওর বলি। কিন্তু শীতকালে এই বিস্তীর্ণ এলাকা শুকিয়ে যায় এবং সেখানে বোরো ধানের চাষ হয়। সমস্যাটা তৈরি হয় নদীর সাথে হাওরের সংযোগকারী খালগুলোর ব্যবস্থাপনা নিয়ে। খরচ কমাতে গিয়ে আমরা খালগুলোতে পর্যাপ্ত স্লুইস গেট নির্মাণ না করে মুখ বন্ধ করে দিয়েছি, অথবা এমন স্লুইস গেট বানিয়েছি যা ঠিকমতো কাজ করে না। ফলে পানি স্বাভাবিকভাবে ওঠা-নামা করতে পারে না।

স্ট্রিম: হাওর এলাকায় ফসল রক্ষার জন্য তো ডুবন্ত বাঁধ বা সাবমার্সিবল ডাইক রয়েছে। সেগুলো কি ঠিকমতো কাজ করছে না?

ড. আইনুন নিশাত: হাওরের এই বাঁধগুলো উপকূলীয় বেড়িবাঁধের মতো নয়। এগুলো হলো ডুবন্ত বাঁধ। এর উদ্দেশ্য হলো, মার্চ-এপ্রিল মাসে হঠাৎ ১০-১৫ ফুট পানি বাড়লে তা যেন ফসলের ক্ষতি করতে না পারে, অর্থাৎ ধান কাটার জন্য কৃষকদের যেন কয়েকটা দিন সময় দেওয়া যায়। বর্ষা পুরোদমে শুরু হলে এই বাঁধ ডুবে যাবে, এটাই স্বাভাবিক।

আগে কৃষকরা নভেম্বরে বোরো ধান লাগাতেন এবং এপ্রিলের শুরুতে কেটে ফেলতেন। কিন্তু কৃষি বিভাগের উৎসাহে কৃষকরা এখন বোরো ধান লাগানোর আগে ওই একই জমিতে সরিষা বা ভুট্টার মতো বাড়তি ফসল চাষ করছেন। ফলে বোরো ধান লাগাতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি হয়ে যাচ্ছে। এতে ধান পাকতে দেরি হচ্ছে এবং ফসল আগাম বন্যার ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

কিন্তু এখানে একটা বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে ফসল বোনার সময় নিয়ে। আগে কৃষকরা নভেম্বরে বোরো ধান লাগাতেন এবং এপ্রিলের শুরুতে কেটে ফেলতেন। কিন্তু কৃষি বিভাগের উৎসাহে কৃষকরা এখন বোরো ধান লাগানোর আগে ওই একই জমিতে সরিষা বা ভুট্টার মতো বাড়তি ফসল চাষ করছেন। ফলে বোরো ধান লাগাতে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি হয়ে যাচ্ছে। এতে ধান পাকতে দেরি হচ্ছে এবং ফসল আগাম বন্যার ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

স্ট্রিম: এ বছর তো বাঁধ উপচে পানি ঢোকার চেয়ে ভেতরের বৃষ্টিতেই বেশি ক্ষতি হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এর কারণ কী?

ড. আইনুন নিশাত: আপনি ঠিকই বলেছেন। এ বছর বাঁধ উপচে বাইরের পানি ততটা ঢোকেনি, কিন্তু হাওরের ভেতরে যে বৃষ্টি হয়েছে, সেই পানি বের হওয়ার পথ ছিল না। ওই যে বললাম, হাওরটা গামলার মতো; বৃষ্টির পানি গামলার তলায় গিয়ে জমেছে এবং সেখানকার ধান তলিয়ে গেছে।

আরেকটা মজার অথচ মর্মান্তিক ব্যাপার হলো—বর্ষা শেষে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যখন পানি নামতে শুরু করে, তখন এই বাঁধের কারণেই বিলের পানি দ্রুত নামতে পারে না। তখন বাধ্য হয়ে স্থানীয় কৃষকরা পানি সরাতে বাঁধ কেটে দেন। পানি দ্রুত নেমে গেলে নভেম্বরের মধ্যে জমি শুকিয়ে যায় এবং তারা চাষাবাদ শুরু করতে পারেন। কৃষকরা নিজেদের প্রয়োজনে সঠিক কাজটাই করেন, কিন্তু সরকার উল্টো তাদের নামে মামলা দেয়!

অথচ নিয়ম হলো, স্থানীয়রাই এই কাটা অংশ মার্চ-এপ্রিলের আগে মেরামত করে ফেলবে। কিন্তু এখন মেরামত করার দায়িত্ব দেওয়া হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। তাদের টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ করে কাজ শুরু করতেই মার্চ-এপ্রিল মাস পার হয়ে যায়। ফলে তারা চরমভাবে ব্যর্থ হয়।

স্ট্রিম: তাহলে এই যে বাঁধ ব্যবস্থাপনা এবং ফসলের ক্ষতি—এর স্থায়ী সমাধান আসলে কী হতে পারে?

ড. আইনুন নিশাত: প্রথমত, আমাদের ‘ডেভেলপমেন্ট’ বা উন্নয়ন ধারণার পরিবর্তন দরকার। পানি খাতে অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে ‘ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট’ বা পানি ব্যবস্থাপনা বেশি জরুরি। কখন পানি ঢুকতে দেওয়া হবে, কখন বের করে দেওয়া হবে—এটা স্থানীয়দের মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের ফসলের জাত নিয়ে ভাবতে হবে। হাওরের জন্য এমন ধান দরকার, যা অল্প সময়ে পাকে। যে ধান পাকতে ১৫০ দিন লাগে, তা কমিয়ে যদি ১২০-১৩০ দিনে আনা যায়, তাহলে এপ্রিলেই কৃষক ধান ঘরে তুলতে পারবেন। পাশাপাশি জলমগ্নতা বা খরা সহ্য করতে পারে, এমন ধানের জাত উদ্ভাবন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে।

স্ট্রিম: হাওরের তো শুধু ফসল নয়, বিস্তীর্ণ মৎস্যসম্পদ এবং প্রাণিসম্পদও রয়েছে। এই অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় তাদের ওপর কেমন প্রভাব পড়ছে?

ড. আইনুন নিশাত: মারাত্মক প্রভাব পড়ছে! হাওর শুধু ধানের জমি নয়, এটি মাছের বিশাল আধার। হাওরের খাড়া পাড় বা গর্তগুলো চিতল বা ঘইন্নার মতো মাছের আবাসস্থল। মাছের জীবনচক্রের একটি বড় অংশ নির্ভর করে বৃষ্টির ওপর। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসের ঝড় ও বৃষ্টির সময় মাছ ডিম ছাড়ে। এখন আমরা যদি বাঁধ দিয়ে বা অপরিকল্পিতভাবে খাল বন্ধ করে মাছের স্বাভাবিক চলাচলের পথ আটকে দিই, তাহলে মাছের চরম ক্ষতি হবে।

একইভাবে হাওরে প্রচুর গবাদিপশু ও হাঁস পালন করা হয়। শুষ্ক মৌসুমে এরা হাওরের মাঝখানে চড়ে বেড়ায়, আবার বর্ষায় হাঁসগুলো পানিতে ঘুরে প্রাকৃতিক খাবার খায়। এই পুরো ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রকে বুঝতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা হতে হবে ইন্টারডিসিপ্লিনারি (বহুমাত্রিক), যেখানে ফসল, মাছ, গবাদিপশু এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার কথা মাথায় রাখা হবে। হাওর উন্নয়ন বোর্ড বা পানি উন্নয়ন বোর্ড বর্তমানে এই কাজগুলো সমন্বিতভাবে করছে না।

স্ট্রিম: হাওরের গ্রামগুলোকে বর্ষার ভয়ংকর ঢেউ বা ‘আফাল’ থেকে রক্ষার জন্য আগে গাছপালার ব্যবহার দেখা যেত। এখনকার পরিস্থিতি কেমন? সরকারের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে এখানে কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে?

ড. আইনুন নিশাত: সিলেটে বর্ষার সময় সৃষ্ট প্রচণ্ড ঢেউকে ‘আফাল’ বলা হয়। বাতাস থেমে গেলেও এই ঢেউয়ের আঘাতে আস্ত গ্রাম ভেঙে যেতে পারে। আগে হাওরের গ্রামগুলোর চারপাশে ৮-১৫ সারি হিজল ও করচ গাছের বাগান ছিল, যা এই ঢেউ আটকে দিত। গাছগুলোর পাতা পানির উপরে থাকত এবং এগুলো মাছের প্রাকৃতিক খাবার জোগাত। এখন জমি দখল বা অন্য কারণে এই গাছগুলো প্রায় নেই বললেই চলে।

বর্ষা শেষে আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে যখন পানি নামতে শুরু করে, তখন এই বাঁধের কারণেই বিলের পানি দ্রুত নামতে পারে না। তখন বাধ্য হয়ে স্থানীয় কৃষকরা পানি সরাতে বাঁধ কেটে দেন। পানি দ্রুত নেমে গেলে নভেম্বরের মধ্যে জমি শুকিয়ে যায় এবং তারা চাষাবাদ শুরু করতে পারেন। কৃষকরা নিজেদের প্রয়োজনে সঠিক কাজটাই করেন, কিন্তু সরকার উল্টো তাদের নামে মামলা দেয়!

সরকারের যে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ রয়েছে, তার অধীনে হাওরের খাস জমিগুলোতে অবিলম্বে হিজল, করচ ও বরুণ গাছ লাগানো উচিত। তবে একেবারে ছোট চারা লাগালে বর্ষায় ডুবে মারা যাবে। ২-৪ বছরের পুরোনো, একটু বড় চারা লাগাতে হবে, যাতে বর্ষায় এর কিছু পাতা পানির ওপরে থাকে।

সবশেষে বলব, হাওরের ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ খুবই জরুরি। আজ থেকে শত বছর আগের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বাঁধ নির্মাণ বা মেরামতের কাজে পুরো গ্রাম এক হয়ে কাজ করত। পুরুষরা যখন মাটি কাটত, নারীরা তখন খাবার বানাত, আর একদল 'ধামাইল' গান বা রাধারমণের গান গেয়ে তাদের উৎসাহ দিত। "তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো..."-এর মতো গানগুলো কিন্তু এভাবেই মানুষের শ্রমে আর জীবনে মিশে ছিল। অর্থাৎ, মানুষকে সম্পৃক্ত না করে কেবল অবকাঠামো বানালে হাওরের প্রকৃত উন্নয়ন কখনো সম্ভব নয়।

স্ট্রিম: আমাদের মোট ধানের ১৮ থেকে ২০ শতাংশই আসে হাওর অঞ্চল থেকে। তাই হাওরে বন্যা বা ফসলহানি হলে তো পুরো দেশের খাদ্য নিরাপত্তাতেই বড় ধরনের ধাক্কা লাগে...

ড. আইনুন নিশাত: অবশ্যই মারাত্মক ক্ষতি হয়। ১৯৯৬ সালে আমার অধীনে হাওর নিয়ে প্রথম বড় ধরনের গবেষণা হয়। তখন থেকে আমি একটাই কথা বলে আসছি—হাওর মানে স্রেফ একটা জলাশয় নয়, এর একটা নিজস্ব ভূ-প্রকৃতি ও ঢাল আছে। হাওরের ভেতরেও অনেক বৈচিত্র্যময় জীবন ও পরিবেশ রয়েছে।

আমি একবার তাহিরপুর যাওয়ার পথে দেখলাম, লোকজন খাল থেকে কালো রঙের পিট মাটি তুলে পোড়াচ্ছে। একসময় হাওরে প্রচুর গাছপালা ছিল, সেগুলো পচেই এই পিট মাটি তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখন হাওরে গাছ নেই বললেই চলে। হয়তো এখানে একটা, অনেক দূরে আরেকটা হিজল গাছ দাঁড়িয়ে আছে। আমি সুনামগঞ্জের দেখার হাওরে গিয়ে দেখলাম, সেখানে লোকজন মাইলের পর মাইল মাচা করে শুঁটকি তৈরি করছে। সেখানে একজন আমাকে ডেকে নিয়ে দেখাল যে তারা হাওরে সেগুন গাছ লাগিয়েছে! সেগুন তো ওই এলাকার জন্য উপযুক্ত গাছ নয়। আবার হিজল বা করচ গাছ লাগালেও এর গোড়ায় পানি জমতে হয়, না হলে গাছ মরে যায়। অর্থাৎ, স্থানভেদে সঠিক কৌশল চিন্তা করতে হবে।

আরেকটা বড় সমস্যা হলো সেডিমেন্টেশন বা পলি জমা। ওপারের ভারতীয় অংশে বনজঙ্গল উধাও হয়ে গেছে, ফলে সেখান থেকে প্রচুর বালু নেমে এসে আমাদের হাওরগুলো ভরাট করে ফেলছে। তাই হাওর খনন করাটাও জরুরি। আমি বারবার বলছি, হাওরের সমস্যা সমাধানে একটি ইন্টারডিসিপ্লিনারি (বহুমাত্রিক) বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে ধীরস্থিরভাবে কাজ করতে হবে। কাজটা পানি উন্নয়ন বোর্ড করবে, নাকি ডিপিএইচই বা বিএডিসি করবে—সেটা আমার মাথাব্যথা নয়, কাজটা সঠিক পরিকল্পনায় হওয়া জরুরি।

স্ট্রিম: এই সমস্যাগুলো তো বহু বছর ধরে চলছে। তাহলে এতদিনেও এর স্থায়ী সমাধান কেন করা হয়নি বা কেন করা হচ্ছে না বলে আপনি মনে করেন?

ড. আইনুন নিশাত: এর মূল কারণ হলো আমাদের সিস্টেমের স্থবিরতা এবং উদ্ভাবনের অভাব। কেউ যদি নতুন করে চিন্তাভাবনা করে কোনো প্রকল্পের ডিজাইন তৈরি করে, পরিকল্পনা কমিশন প্রথমেই তা আটকে দেবে। তারা সন্দেহ করবে—‘হঠাৎ ডিজাইনে পরিবর্তন কেন? নিশ্চয়ই এর মধ্যে কোনো রহস্য বা দুর্নীতির সুযোগ আছে!’

উদাহরণস্বরূপ, বড় নদী যমুনার পাড় ভাঙলে ২৫০ কেজির বালুর বস্তা ফেলা হয়, আবার ছোট টাঙ্গন নদীর পাড় ভাঙলেও ওই ২৫০ কেজির বস্তাই ফেলা হয়! নদীর ক্ষমতা বা ধরন যে আলাদা হতে পারে, সেটা নিয়ে কেউ ভাবে না। গত বছর, তার আগের বছর বা ১০ বছর আগে যা করা হয়েছে, অন্ধের মতো সেটাই বারবার করা হয়। আগের প্রজেক্ট যে ব্যর্থ হয়েছিল, সেটা স্বীকার করেও আবার একই ভুল মডেলে কাজ করা হয়।

স্লুইস গেটগুলোর দিকে তাকালেই অবাক হতে হয়। ড্রেনের মতো ছোট ছোট স্লুইস গেট বানানো হয়। মিরপুর ব্রিজ থেকে কেল্লার মোড় পর্যন্ত গেলে দেখবেন, স্লুইস গেটের মুখগুলো এত ছোট যে নদীর পানি নেমে গেলেও ভেতরের বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে পারে না। পানি নিষ্কাশন বা ড্রেনেজ নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই।

স্ট্রিম: নিষ্কাশনের এই প্রসঙ্গেই একটু ভবদহ বিলের কথায় আসি। ভবদহের যে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা, সেটাও তো স্লুইস গেট বা রেগুলেটরের ত্রুটির কারণেই হচ্ছে বলে শোনা যায়...

ড. আইনুন নিশাত: ভবদহের সমস্যাটা একটু অন্যরকম। ওখানে শুধু স্লুইস গেট নয়, রেগুলেটর আছে। ১৯৬৪ সালে যখন এর ডিজাইন করা হয়, তখন আইডিয়াটা ছিল—অক্টোবর মাসে আমরা গেট আটকে দেব, যাতে বিলের ভেতরের মিঠা পানি বের হতে না পারে এবং কৃষকরা ফসল ফলাতে পারে। এরপর এপ্রিল মাস পর্যন্ত ৬-৭ মাস গেট বন্ধ থাকে। মে মাসে যখন গেট খোলা হয়, তখন আর পানি বের হয় না।

আমাদের ফসলের জাত নিয়ে ভাবতে হবে। হাওরের জন্য এমন ধান দরকার, যা অল্প সময়ে পাকে। যে ধান পাকতে ১৫০ দিন লাগে, তা কমিয়ে যদি ১২০-১৩০ দিনে আনা যায়, তাহলে এপ্রিলেই কৃষক ধান ঘরে তুলতে পারবেন। পাশাপাশি জলমগ্নতা বা খরা সহ্য করতে পারে, এমন ধানের জাত উদ্ভাবন ও ব্যবহার বাড়াতে হবে।

এর কারণ হলো, গেট যখন মাসের পর মাস বন্ধ থাকে, তখন বাইরের নদীতে তো জোয়ার-ভাটা চলতে থাকে। কিন্তু ভেতরের প্রবাহ না থাকায় ওই নদীতে স্রোত থাকে না এবং জোয়ারের সাথে আসা প্রচুর পলি গেটের সামনে এসে জমা হয়। ৬ মাস পর পলি জমে সামনের অংশ উঁচু হয়ে যায়, ফলে গেট আর কাজ করে না।

স্ট্রিম: তাহলে কি বারবার খনন করাই এর একমাত্র সমাধান?

ড. আইনুন নিশাত: একদমই নয়। এই রেগুলেটরের পলির সমস্যা সমাধানের উপায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জানা আছে। আমার এক ছাত্র, যে এখন পানি উন্নয়ন বোর্ডে আছে, সে এর ওপর পিএইচডি করেছে। ফেনীতে ২২ ভেন্টের বিশাল রেগুলেটর আছে। সেখানে নিয়ম হলো, প্রতিদিন অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিটের জন্য গেটগুলো খোলা হয়। এতে ভেতরের পানি বেগে বেরিয়ে এসে গেটের সামনের জমা পলি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই সামান্য কারিগরি বিষয় নিয়ে গত ৬০-৭০ বছর ধরে সমস্যা চলছে, কিন্তু কেউ স্থায়ী সমাধান করে না।

কেন করে না? কারণ, পলি জমে গেট আটকে গেলে খনন বা ড্রেজিংয়ের প্রজেক্ট আসে, আর এতে কর্মকর্তারা খুব খুশি হন। ড্রেজিংয়ের বিশাল বাজেটে সবার লাভ।

ভবদহে প্রথমে ১২ ভেন্টের রেগুলেটর ছিল, কাজ না হওয়ায় আরও ৯টি বানানো হলো। কিন্তু মোট ২১টি ভেন্টও কাজ করছে না। কারণ, ওই যে গেট আটকে রাখার ভুল নীতি। যদি প্রতিদিন নিয়ম করে কিছুক্ষণের জন্য গেট খোলা হতো, তবে এই সমস্যা হতো না। কিন্তু গেট খুলবে কে? আগে এর জন্য লোক নিয়োগ দেওয়া ছিল। কিন্তু একজন সচিব এসে খরচ কমানোর নামে ১৬ হাজার কর্মীর চাকরি বাতিল করলেন। মাঠপর্যায়ে মেইনটেন্যান্স বা রক্ষণাবেক্ষণের লোকই এখন নেই। সরকার চাইলে এই গেট খোলার দায়িত্ব স্থানীয় কৃষকদের দিতে পারত, কিন্তু তাদের সেই ক্ষমতা বা যন্ত্র দেওয়া হয় না।

স্ট্রিম: আরেকটা বিষয়ে আসি। বন্যা আসার ৫-৭ দিন আগে সতর্কতা দেওয়া হলেও কৃষকরা ধান কাটার জন্য শ্রমিকের অভাবের কথা বলেন। এই সমস্যার সমাধান কী?

ড. আইনুন নিশাত: শ্রমিকের অভাবের এই সমস্যাটি এখন অনেকটাই সমাধান হয়ে গেছে ‘কম্বাইন্ড হারভেস্টার’ মেশিনের মাধ্যমে। একটি মেশিন ৪০ জন মানুষের কাজ করে দেয়। এটি ধান কাটে, মাড়াই করে এবং বস্তাবন্দিও করে দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো, এই যন্ত্রের ভর্তুকি নিয়ে মারাত্মক দুর্নীতি হচ্ছে।

ধরুন, একটি মেশিনের দাম ৭০ হাজার টাকা। নিয়ম হলো সরকার ৫০ হাজার টাকা ভর্তুকি দেবে, আর কৃষক দেবেন ২০ হাজার টাকা। কিন্তু এই ৫০ হাজার টাকা সরাসরি কৃষকের হাতে যায় না। কৃষি অফিসারের মাধ্যমে টাকাটা যায় ডিলারের কাছে। ডিলার তখন কৃষককে নিয়ে ব্যাংকে যায় এবং কৃষকের নামে ২০ হাজার টাকার লোন করায়। ফলে ডিলার ঠিকই পুরো ৭০ হাজার টাকা পেয়ে যায় এবং মেশিনটাও ডিলারের কাছেই থাকে। কৃষক শুধু ওই মেশিনটা ভাড়া নিয়ে নিজের জমিতে ব্যবহার করেন এবং ধীরে ধীরে লোন শোধ করেন। মূলত ডিলারের সাথে যোগসাজশ থাকা বড়লোক কৃষকরাই এর সুফল পাচ্ছেন, সাধারণ প্রান্তিক কৃষক নন।

স্ট্রিম: তার মানে আধুনিক প্রযুক্তি এলেও কৃষকের প্রকৃত জ্ঞান বা ব্যবস্থাপনার এখনো অভাব রয়ে গেছে?

ড. আইনুন নিশাত: ঠিক তাই। একবার আমি এক স্কুলশিক্ষকের বাড়িতে গেলাম, যিনি একজন ধনী কৃষক। তার পাওয়ার টিলার আছে, হারভেস্টার কেনার পরিকল্পনা করছেন। কথায় কথায় দেখলাম তার পুকুরে রুই মাছের পোনা ছাড়া হয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “পোনা কবে ছেড়েছেন?” তিনি বললেন, “অক্টোবরের শেষে।” অথচ রুই মাছের পোনা ছাড়ার সঠিক সময় হলো জুলাই-আগস্ট। এটা বোঝার জন্য বিজ্ঞানী হওয়ার দরকার নেই।

এর মানে হলো, আপনার কাছে শুধু টেকনোলজি বা টাকা থাকলেই হবে না, সঠিক জ্ঞান থাকতে হবে। আমি ক্লাসে একটা উদাহরণ দিই—আপনার দাড়ি কাটার জন্য ব্লেড লাগবে, আর জমি চাষ করার জন্য কোদাল লাগবে। দুটোই কাটার প্রযুক্তি, কিন্তু একটার জায়গায় আরেকটা ব্যবহার করলে চলবে না। আমাদের কৃষিতে এবং পানি ব্যবস্থাপনায় ঠিক এই জায়গাতেই গলদ। ব্রিটিশ আমলের সেই পুরোনো ধ্যান-ধারণাতেই আমরা এখনো ঘুরপাক খাচ্ছি।

সর্বাধিক পঠিত
লেটেস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত