বঙ্গোপসাগর থেকে একটি পরাশক্তিকে পর্যবেক্ষণ
আমেরিকার আড়াইশত বছর পূর্তি শুধু একটি মাইলফলক নয়—এটি বাংলাদেশসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি কৌশলগত মুহূর্ত। পাঁচ পর্বের এই ধারাবাহিক স্ট্র্যাটেজিক নিবন্ধে America at 250: At Home and Beyond গ্রন্থে উত্থাপিত কৌশলগত শিক্ষাগুলো বিশ্লেষণ করা হবে এবং সেসব শিক্ষার বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য তাৎপর্য অন্বেষণ করা হবে। এক অনিশ্চিত শতাব্দীর প্রেক্ষাপটে ধারাবাহিকটির বিভিন্ন পর্বে আলোচিত হবে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বিভাজন, পরিবর্তনশীল ইন্দো-প্যাসিফিক শক্তির ভারসাম্য, ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত সংকট, এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সামুদ্রিক সিদ্ধান্তের গুরুত্ব। ধারাবাহিকটির প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো।
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

রাষ্ট্রসমূহ সাধারণত তাদের বার্ষিকী উদযাপন অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়েই করে। পতাকা উত্তোলিত হয়, ভাষণ দেওয়া হয়, এবং ইতিহাসকে দূরত্বের স্বস্তি থেকে পুনর্বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কিছু বার্ষিকী কেবল অতীতের স্মারক নয়; সেগুলো ভবিষ্যতের দিকও উন্মোচন করে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমনই একটি মুহূর্ত। এটি শুধু আমেরিকানদেরই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়—যুক্তরাষ্ট্র কী ছিল, কী হয়ে উঠেছে, এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে কী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, যা সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল নামে পরিচিত, ২০২৬ সালের ৪ জুলাই উদযাপিত হবে। ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সারা দেশে তাই নানা আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা যায়।
ঠিক এই বৌদ্ধিক ক্ষেত্রটিই অনুসন্ধান করা হয়েছে ফরাসি কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইরিস (আইআরইএস) এবং অ্যাকাডেমি অব পলিটিক্যাল সায়েন্স এর যৌথভাবে প্রকাশিত সময়োপযোগী গ্রন্থ America at 250: At Home and Beyond বইটিতে।
রোমুয়াল স্কিওরা এবং রবার্ট ওয়াই শ্যাপিরো সম্পাদিত এই বইটি ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রকে উদযাপনের দৃষ্টিতে নয়, বরং গভীর অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে থাকা একটি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে।
বাংলাদেশে আমাদের অনেকের কাছে প্যারিসে রচিত আমেরিকা বিষয়ক একটি বই হয়তো তাৎক্ষণিক উৎসাহ বা উদ্বেগ থেকে দূরের কিছু বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এমন ধারণা হবে ভুল। বিশ্বায়নের এমন এক যুগে, যখন সামুদ্রিক বাণিজ্য, ডিজিটাল সংযোগ, পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তাকে সংজ্ঞায়িত করছে, তখন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য আমেরিকাকে বোঝা আর কেবল অ্যাকাডেমিক কৌতূহলের বিষয় নয়; এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
সম্ভাব্য পতনের বহু পূর্বাভাস সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রভাবশালী বহিরাগত শক্তি। তার নৌ-সামর্থ্য বিশ্বের প্রতিটি প্রধান মহাসাগরে বিস্তৃত। তার মুদ্রা বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। তার জোটগুলো বহু অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ করে। এমনকি তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতাও প্রায়ই বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য আমেরিকার শক্তির ভবিষ্যৎ কোনো বিমূর্ত বিতর্ক নয়; আমাদের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে।
গ্রন্থটির মূল শক্তি তার দ্বিমাত্রিক বিশ্লেষণে। এটি আমেরিকাকে দেখেছে “দেশের অভ্যন্তরে” এবং “বিশ্বের বাইরে”—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে। কারণ কোনো পরাশক্তিকে কেবল তার পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বোঝা যায় না। একটি রাষ্ট্রের বহির্মুখী আচরণ প্রায়ই তার অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। যে রাষ্ট্র নিজেই নিজের ভেতরে অনিশ্চিত, সে বাইরেও অনির্ণেয় হয়ে উঠতে পারে।
গ্রন্থের লেখকেরা যুক্তি দিয়েছেন যে, আমেরিকা তার ২৫০তম বছরে প্রবেশ করছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটি রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্লান্তি, সামাজিক বিভাজন এবং জাতীয় পরিচয়ের নতুন বিতর্কে নিমজ্জিত। এসব অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন কেবল দেশীয় বাস্তবতা নয়; ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে জোট, বাণিজ্য, সামরিক প্রতিশ্রুতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের মতো অঞ্চলের কৌশলগত ভূগোলকে নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশের জন্য এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই বিদেশি শক্তিকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোকে মূল্যায়ন করেন। বিদেশি শক্তিকে তাদের প্রদেয় সহায়তা, বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা কিংবা কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু আজকের বিশ্বে বড় শক্তিগুলো ক্রমেই তাদের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহন করে আনছে।
ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিষেধাজ্ঞা, শুল্কনীতি, উন্নয়ন সহায়তা এবং আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিভক্ত একটি আমেরিকা শক্তিশালী হয়তো থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পার্টনারদেরকে আরও পরখ করা, আরও লেনদেননির্ভর করা এবং কখনও কখনও সে বাছাই প্রক্রিয়া কম পূর্বানুমানযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে এই বাস্তবতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বহু দশক ধরে বাংলাদেশ সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে প্রধানত উপকূলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছে। কিন্তু ভূগোল এখন নতুন কৌশলগত অর্থ ধারণ করছে।
বঙ্গোপসাগর আর কেবল দক্ষিণ এশিয়ার সংলগ্ন জলরাশি নয়। বরং ধীরে ধীরে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হচ্ছে। আমাদের সামুদ্রিক প্রতিবেশ দিয়ে অতিক্রমকারী সমুদ্রপথগুলো মধ্যপ্রাচ্যকে পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে এবং ইউরোপকে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করছে। জ্বালানি পরিবহন, কনটেইনার চলাচল, সাবমেরিন কেবল এবং নৌবাহিনীর উপস্থিতি ক্রমশ একত্রিত হচ্ছে সেই জলসীমায়, যাকে একসময় প্রান্তিক বলে মনে করা হতো।
চীনের উত্থানের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যখন তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল পুনর্গঠন করছে, তখন কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চাওয়া দেশগুলিও অন্যের সিদ্ধান্তের প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না। কিন্তু ভূগোল অনেক সময় একটি রাষ্ট্রকে এমন গুরুত্ব দেয়, জড়িয়ে ফেলে, চাই সে রাষ্ট্র তা গ্রহণে ইচ্ছা করুক বা না করুক। তাই America at 250 এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর কাজ পক্ষ বেছে নেওয়া নয়; বরং বৃহৎ শক্তির পরিবর্তিত মনস্তত্ত্বকে বোঝা।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ধারণাগুলোর একটি হলো, আমেরিকার প্রভাব সরলভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে না; বরং রূপান্তরিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ের অনেক বিশ্লেষণ দুটি সরল মেরুতে আবদ্ধ থাকে—হয় আমেরিকা এখনও একচ্ছত্র প্রভাবশালী, নয়তো সে অপরিবর্তনীয় পতনের পথে। গ্রন্থকারেরা এই দ্বৈততা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে উপস্থাপন করেছেন এমন এক শক্তি হিসেবে, যা স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী একক আধিপত্যের নিশ্চয়তা থেকে সরে এসে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে নতুন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভূমিকায় প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুরোনো ধারণার ওপর নির্মিত নিজেদের জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা অপরিপক্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হতে পারে।
ক্ষুদ্র সামুদ্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো কোনো পরাশক্তির পতন অনুমান করা নয়; বরং তার রূপান্তর বোঝা। বাংলাদেশের কৌশলগত পরিমণ্ডল প্রায়ই আঞ্চলিক শক্তি নিয়ে আলোচনা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ভারত ও চীন স্বাভাবিকভাবেই তাৎক্ষণিক গুরুত্ব পায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতি আরও বিস্তৃত দৃষ্টিসীমা দাবি করে। ভারত মহাসাগরে আমেরিকার নৌ উপস্থিতি, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবস্থায় তার প্রভাব, এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রভাব—সবই সেই কৌশলগত পরিবেশকে প্রভাবিত করে যার মধ্যে বাংলাদেশকে পরিচালিত হতে হয়।
আর তাই, প্রশ্নটি এই নয় যে আমেরিকার ভবিষ্যতের প্রতি বাংলাদেশের মনোযোগ দেওয়া উচিত কি না। বরং প্রশ্ন হলো: আমরা কি তা উপেক্ষা করার সামর্থ্য রাখি? এখানেই America at 250-এর তাৎপর্য । বইটি পাঠককে আমেরিকাকে কেবল একটি ঐতিহাসিক জন্মবার্ষিকী উদযাপনকারী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক পরাশক্তি হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশের নিজের জন্যও এটি বিরল এক আত্মসমালোচনার সুযোগ।
যদি ওয়াশিংটন বিশ্বে নিজের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করে, তবে ঢাকাকেও পরিবর্তিত বিশ্ব তথা সামুদ্রিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা সমীচীন হবে। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বার্ষিকী শুধু সময়ের হিসাব নয়; কখনও কখনও তা ইতিহাসের গতিপথও নির্দেশ করে।
কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

রাষ্ট্রসমূহ সাধারণত তাদের বার্ষিকী উদযাপন অতীতের দিকে ফিরে তাকিয়েই করে। পতাকা উত্তোলিত হয়, ভাষণ দেওয়া হয়, এবং ইতিহাসকে দূরত্বের স্বস্তি থেকে পুনর্বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কিছু বার্ষিকী কেবল অতীতের স্মারক নয়; সেগুলো ভবিষ্যতের দিকও উন্মোচন করে। ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমনই একটি মুহূর্ত। এটি শুধু আমেরিকানদেরই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বকে পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়—যুক্তরাষ্ট্র কী ছিল, কী হয়ে উঠেছে, এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ভবিষ্যতে কী হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী, যা সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল নামে পরিচিত, ২০২৬ সালের ৪ জুলাই উদযাপিত হবে। ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে সারা দেশে তাই নানা আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে বলে জানা যায়।
ঠিক এই বৌদ্ধিক ক্ষেত্রটিই অনুসন্ধান করা হয়েছে ফরাসি কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইরিস (আইআরইএস) এবং অ্যাকাডেমি অব পলিটিক্যাল সায়েন্স এর যৌথভাবে প্রকাশিত সময়োপযোগী গ্রন্থ America at 250: At Home and Beyond বইটিতে।
রোমুয়াল স্কিওরা এবং রবার্ট ওয়াই শ্যাপিরো সম্পাদিত এই বইটি ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রকে উদযাপনের দৃষ্টিতে নয়, বরং গভীর অভ্যন্তরীণ চাপের মুখে থাকা একটি রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্লেষণ করেছে। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূমিকাকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে।
বাংলাদেশে আমাদের অনেকের কাছে প্যারিসে রচিত আমেরিকা বিষয়ক একটি বই হয়তো তাৎক্ষণিক উৎসাহ বা উদ্বেগ থেকে দূরের কিছু বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এমন ধারণা হবে ভুল। বিশ্বায়নের এমন এক যুগে, যখন সামুদ্রিক বাণিজ্য, ডিজিটাল সংযোগ, পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অর্থনৈতিক আন্তঃনির্ভরতা ক্রমেই জাতীয় নিরাপত্তাকে সংজ্ঞায়িত করছে, তখন ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য আমেরিকাকে বোঝা আর কেবল অ্যাকাডেমিক কৌতূহলের বিষয় নয়; এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
সম্ভাব্য পতনের বহু পূর্বাভাস সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র এখনও সমসাময়িক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে প্রভাবশালী বহিরাগত শক্তি। তার নৌ-সামর্থ্য বিশ্বের প্রতিটি প্রধান মহাসাগরে বিস্তৃত। তার মুদ্রা বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু। তার প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো যোগাযোগ, বাণিজ্য এবং তথ্যপ্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে। তার জোটগুলো বহু অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামো নির্ধারণ করে। এমনকি তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতাও প্রায়ই বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত এবং ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য আমেরিকার শক্তির ভবিষ্যৎ কোনো বিমূর্ত বিতর্ক নয়; আমাদের অর্থনীতি, কূটনীতি এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার ওপর এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে।
গ্রন্থটির মূল শক্তি তার দ্বিমাত্রিক বিশ্লেষণে। এটি আমেরিকাকে দেখেছে “দেশের অভ্যন্তরে” এবং “বিশ্বের বাইরে”—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে। কারণ কোনো পরাশক্তিকে কেবল তার পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বোঝা যায় না। একটি রাষ্ট্রের বহির্মুখী আচরণ প্রায়ই তার অভ্যন্তরীণ আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন। যে রাষ্ট্র নিজেই নিজের ভেতরে অনিশ্চিত, সে বাইরেও অনির্ণেয় হয়ে উঠতে পারে।
গ্রন্থের লেখকেরা যুক্তি দিয়েছেন যে, আমেরিকা তার ২৫০তম বছরে প্রবেশ করছে এমন এক সময়ে, যখন দেশটি রাজনৈতিক মেরুকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক ক্লান্তি, সামাজিক বিভাজন এবং জাতীয় পরিচয়ের নতুন বিতর্কে নিমজ্জিত। এসব অভ্যন্তরীণ প্রশ্ন কেবল দেশীয় বাস্তবতা নয়; ওয়াশিংটনের দৃষ্টিতে জোট, বাণিজ্য, সামরিক প্রতিশ্রুতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিকের মতো অঞ্চলের কৌশলগত ভূগোলকে নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশের জন্য এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নীতিনির্ধারকেরা প্রায়ই বিদেশি শক্তিকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোকে মূল্যায়ন করেন। বিদেশি শক্তিকে তাদের প্রদেয় সহায়তা, বাণিজ্য, সামরিক সহযোগিতা কিংবা কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে বুঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু আজকের বিশ্বে বড় শক্তিগুলো ক্রমেই তাদের অভ্যন্তরীণ সংকটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহন করে আনছে।
ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিষেধাজ্ঞা, শুল্কনীতি, উন্নয়ন সহায়তা এবং আঞ্চলিক সম্পৃক্ততার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিভক্ত একটি আমেরিকা শক্তিশালী হয়তো থাকবে, কিন্তু একই সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে পার্টনারদেরকে আরও পরখ করা, আরও লেনদেননির্ভর করা এবং কখনও কখনও সে বাছাই প্রক্রিয়া কম পূর্বানুমানযোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে এই বাস্তবতা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বহু দশক ধরে বাংলাদেশ সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে প্রধানত উপকূলকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেছে। কিন্তু ভূগোল এখন নতুন কৌশলগত অর্থ ধারণ করছে।
বঙ্গোপসাগর আর কেবল দক্ষিণ এশিয়ার সংলগ্ন জলরাশি নয়। বরং ধীরে ধীরে বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত পরিসরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হচ্ছে। আমাদের সামুদ্রিক প্রতিবেশ দিয়ে অতিক্রমকারী সমুদ্রপথগুলো মধ্যপ্রাচ্যকে পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে এবং ইউরোপকে প্রশান্ত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করছে। জ্বালানি পরিবহন, কনটেইনার চলাচল, সাবমেরিন কেবল এবং নৌবাহিনীর উপস্থিতি ক্রমশ একত্রিত হচ্ছে সেই জলসীমায়, যাকে একসময় প্রান্তিক বলে মনে করা হতো।
চীনের উত্থানের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র যখন তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল পুনর্গঠন করছে, তখন কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চাওয়া দেশগুলিও অন্যের সিদ্ধান্তের প্রভাবে আক্রান্ত হতে পারে। বাংলাদেশ কোনো পরাশক্তির সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে চায় না। কিন্তু ভূগোল অনেক সময় একটি রাষ্ট্রকে এমন গুরুত্ব দেয়, জড়িয়ে ফেলে, চাই সে রাষ্ট্র তা গ্রহণে ইচ্ছা করুক বা না করুক। তাই America at 250 এর একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর কাজ পক্ষ বেছে নেওয়া নয়; বরং বৃহৎ শক্তির পরিবর্তিত মনস্তত্ত্বকে বোঝা।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ধারণাগুলোর একটি হলো, আমেরিকার প্রভাব সরলভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে না; বরং রূপান্তরিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ের অনেক বিশ্লেষণ দুটি সরল মেরুতে আবদ্ধ থাকে—হয় আমেরিকা এখনও একচ্ছত্র প্রভাবশালী, নয়তো সে অপরিবর্তনীয় পতনের পথে। গ্রন্থকারেরা এই দ্বৈততা প্রত্যাখ্যান করেছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্রকে উপস্থাপন করেছেন এমন এক শক্তি হিসেবে, যা স্নায়ুযুদ্ধ পরবর্তী একক আধিপত্যের নিশ্চয়তা থেকে সরে এসে বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে নতুন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভূমিকায় প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশের জন্য এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুরোনো ধারণার ওপর নির্মিত নিজেদের জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা অপরিপক্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হতে পারে।
ক্ষুদ্র সামুদ্রিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ হলো কোনো পরাশক্তির পতন অনুমান করা নয়; বরং তার রূপান্তর বোঝা। বাংলাদেশের কৌশলগত পরিমণ্ডল প্রায়ই আঞ্চলিক শক্তি নিয়ে আলোচনা করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। ভারত ও চীন স্বাভাবিকভাবেই তাৎক্ষণিক গুরুত্ব পায়। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতি আরও বিস্তৃত দৃষ্টিসীমা দাবি করে। ভারত মহাসাগরে আমেরিকার নৌ উপস্থিতি, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবস্থায় তার প্রভাব, এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রভাব—সবই সেই কৌশলগত পরিবেশকে প্রভাবিত করে যার মধ্যে বাংলাদেশকে পরিচালিত হতে হয়।
আর তাই, প্রশ্নটি এই নয় যে আমেরিকার ভবিষ্যতের প্রতি বাংলাদেশের মনোযোগ দেওয়া উচিত কি না। বরং প্রশ্ন হলো: আমরা কি তা উপেক্ষা করার সামর্থ্য রাখি? এখানেই America at 250-এর তাৎপর্য । বইটি পাঠককে আমেরিকাকে কেবল একটি ঐতিহাসিক জন্মবার্ষিকী উদযাপনকারী রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যাওয়া এক পরাশক্তি হিসেবে দেখতে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশের নিজের জন্যও এটি বিরল এক আত্মসমালোচনার সুযোগ।
যদি ওয়াশিংটন বিশ্বে নিজের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করে, তবে ঢাকাকেও পরিবর্তিত বিশ্ব তথা সামুদ্রিক ব্যবস্থায় নিজের অবস্থান পুনর্বিবেচনা করা সমীচীন হবে। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বার্ষিকী শুধু সময়ের হিসাব নয়; কখনও কখনও তা ইতিহাসের গতিপথও নির্দেশ করে।
কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

বিংশ শতাব্দীর যুদ্ধক্ষেত্রে শক্তির প্রধান মাপকাঠি ছিল ভারী ট্যাঙ্ক, শক্তিশালী বিমানবাহিনী এবং বিশাল পদাতিক বাহিনী। কিন্তু ২০২৬ সালের যুদ্ধক্ষেত্র আমাদের দেখাচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতা, যেখানে প্রথাগত শক্তির দাপট ম্লান হয়ে আসছে। সিগন্যাল জ্যামিং এবং ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ারের দাপটে যখন প্রচলিত রেডিও-নিয়ন্ত
২১ ঘণ্টা আগে
জুলাই বর্ষা বিপ্লবের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল জনতার প্রত্যাশা। মানুষ ভেবেছিল, শুধু সরকার বদলাবে না; বদলাবে রাষ্ট্রের চরিত্রও। বদলাবে প্রশাসনের সংস্কৃতি। বদলাবে ক্ষমতার ব্যবহার। বিশেষ করে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে মানুষের যে ক্ষোভ ছিল, সেটির একটি জবাব আসবে।
২১ ঘণ্টা আগে
গতকাল এক সহকর্মীর সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলাম। কথা হচ্ছিল আজকের মা দিবসে পত্রিকায় কী কাজ হবে, নিজেরা কী করব— এসব নিয়েই। হঠাৎ তিনি বলে বসলেন, ‘মায়েরা আসলে মাকড়সা’।
১ দিন আগে
দক্ষিণ এশিয়ায় আজ পরিচয়কে সরলীকরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ তার হিন্দু অতীতকে আড়াল করছে। ভারত তার মুসলিম ইতিহাসকে মুছে ফেলছে। এর মাধ্যমে ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয় না—বিকৃতি করা হয়।
১ দিন আগে