হান্টাভাইরাস নিয়ে কি দুশ্চিন্তার কারণ আছে? যা বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

প্রকাশ : ১২ মে ২০২৬, ২০: ০৮
হান্টাভাইরাস । স্ট্রিম গ্রাফিক

আটলান্টিক মহাসাগরে ঘুরতে বেরিয়েছিল প্রমোদতরী ‘এমভি হন্ডিয়াস’। আর্জেন্টিনা থেকে যাত্রা শুরু করা এই জাহাজে ছড়িয়ে পড়েছে হান্টাভাইরাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, ভাইরাসের সংক্রমণে ইতিমধ্যে তিন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।

গত এপ্রিলে ১ তারিখে ২৮টি দেশের প্রায় ১৫০ জন যাত্রী ও ক্রু নিয়ে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। আটলান্টিকের দুর্গম অঞ্চল ঘুরে দেখার কথা ছিল যাত্রীদের। কিন্তু এর মধ্যেই ভাইরাসের আক্রমণ জাহাজের গতিপথ বদলে দিয়েছে। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আতঙ্ক তৈরি করেছে। কারণ, কোভিডের দুঃসহ স্মৃতি মানুষের মনে এখনও জীবন্ত। জাহাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বিষয়টিকে খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। হান্টাভাইরাস কি কোভিডের মতই মহামারির রূপ নিতে পারে কি-না, এ বিষয়ে কথা বলেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যা বলছে

সাধারণত ইঁদুর থেকে এই ভাইরাস ছড়ায়। ইঁদুরের শুকনো মল থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কণা শ্বাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করে এই ভাইরাস সংক্রমিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন সিডিসি)-এর মতে, সাধারণত ইঁদুরের প্রস্রাব, মল বা লালা থেকে ভাইরাসটি বাতাসে ছড়িয়ে পড়লে সংক্রমণ ঘটে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার চিকিৎসক ডা. মারিয়া ভ্যান কেরখোভ বলেন, ‘এটা কোনো মহামারির সূচনা নয়। এই ভাইরাস কোভিড বা ইনফ্লুয়েঞ্জা্র মতো নয়। এটা ভিন্নভাবে ছড়ায়। হামের মতো রোগগুলো যেমন খুব ছোঁয়াচে আর সহজেই ছড়িয়ে পড়ে, হান্টাভাইরাসের আন্দিজ স্ট্রেইন ততটা সংক্রামক নয়।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, মানুষ থেকে মানুষে ছড়ানো সম্ভব হলেও বিশ্বব্যাপী এর সংক্রমণের ঝুঁকি কম।

‘এমভি হন্ডিয়াস’ থেকে হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত স্প্যানিশ যাত্রীদের স্প্যানিশ বিমানবাহিনীর একটি ফ্লাইটে ওঠানো হচ্ছে। সংগৃহীত ছবি
‘এমভি হন্ডিয়াস’ থেকে হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত স্প্যানিশ যাত্রীদের স্প্যানিশ বিমানবাহিনীর একটি ফ্লাইটে ওঠানো হচ্ছে। সংগৃহীত ছবি

যুক্তরাজ্যের হেলথ সিকিউরিটি এজেন্সি জানিয়েছে, সাধারণত সামাজিক মেলামেশা যেমন পাবলিক প্লেস, দোকানপাটে যাওয়া বা হাঁটাচলার মাধ্যমে হান্টাভাইরাস ছড়ায় না। এই ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার দুই থেকে চার সপ্তাহ পর সাধারণত লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়।

কী ঘটেছিল জাহাজে

জাহাজের যাত্রীদের ব্যাপারে সর্বশেষ আপডেটে বলা হয়েছে, নয়জন আক্রান্ত হয়েছেন বলে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে সাতজনের সংক্রমণ পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া গেছে।

গত ১১ এপ্রিল জাহাজে একজন ডাচ নাগরিক মারা যান। শুরুতে তাঁর মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি। প্রায় দুই সপ্তাহ পর ২৪ এপ্রিল সেন্ট হেলেনায় ডাচ নাগরিকের মরদেহ নামানো হয়। তাঁর স্ত্রীও সঙ্গে ছিলেন। ওই নারীকে পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গের একটি হাসপাতালে নিলে তিনিও মারা যান।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ৬৯ বছর বয়সী এই নারী হান্টাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন। এরপর ২ মে জাহাজের আরেক জার্মান যাত্রী মারা যান। ফলে মোট মৃতের সংখ্যা তিনে দাঁড়ায়।

গত বুধবার দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, দেশে ফিরিয়ে আনা দুজন যাত্রীর শরীরে ভাইরাসটির ‘অ্যান্ডিস স্ট্রেইন’ পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ভাইরাসের এই বিশেষ ধরনটি খুব ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শ থেকে ছড়াতে পারে। এমভি হন্ডিয়াস জাহাজে এমনটাই ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডব্লিউএইচও-এর মহাপরিচালক ডা. টেড্রোস ঘেব্রেইয়েসুস জানান, শনাক্ত হওয়া দুই ব্যক্তি আর্জেন্টিনা, চিলি এবং উরুগুয়ে সফর করেছিলেন। তাঁরা সেখানে পাখি দেখতে গিয়েছিলেন। ধারণা করা হচ্ছে, ভ্রমণের কোনো এক পর্যায়ে তাঁরা ভাইরাসের সংস্পর্শে আসেন।

সংক্রমণ এড়াতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জাহাজের ক্রু ও যাত্রীদের এক মাসের বেশি সময় আইসোলেশনে থাকতে হবে।

সেন্ট হেলেনায় জাহাজ থেকে ৩০ জন যাত্রী আগেই নেমে গিয়েছিলেন। তাদেরকেও খুঁজে বের করে আইসোলেশনে রাখা হচ্ছে। স্পেন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তাদের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে কোয়ারেন্টাইনে রাখছে। যুক্তরাষ্ট্রও নাগরিকদের দেশে ফেরাচ্ছে। সতর্কতা হিসেবে বিমানের ‘বায়ো কন্টেইনমেন্ট ইউনিট’ ব্যবহার করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে হান্টাভাইরাস নজরদারি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৮৯০টি কেস শনাক্ত হয়েছে।

এই ভাইরাস দুই ধরনের রোগ সৃষ্টি করে। প্রথমটি হলো হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (এইচপিএস)। এটা হলে শুরুতে জ্বর, ক্লান্তি ও পেশিতে ব্যথা হয়। পরে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। সিডিসির মতে, এই লক্ষণ দেখা দিলে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৮ শতাংশ।

দ্বিতীয়টি হলো হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম। এটা তুলনামূলক গুরুতর এবং সাধারণত কিডনিকে আক্রান্ত করে। ফলে কিডনির সমস্যা দেখা দিতে পারে। পরে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, কাঁপুনি এবং পেটের সমস্যা দেখা দিতে পারে। সিডিসির মতে, শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত উপসর্গ দেখা দিলে মৃত্যুর হার প্রায় ৩৮ শতাংশ।

হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। উপসর্গ অনুযায়ী রোগীদের অক্সিজেন, ভেন্টিলেশন, অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ বা ডায়ালাইসিস দেওয়া হয়।

নতুন সংক্রমণ নয়

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের প্রতিবেদন বলছে, বিশ্বজুড়ে প্রতি বছর আনুমানিক এক লাখ ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে হান্টাভাইরাসের গুরুতর সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। এর বড় অংশই ইউরোপ ও এশিয়ায়। এসব সংক্রমণের অর্ধেকেরও বেশি সাধারণত চীনে ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে হান্টাভাইরাস নজরদারি শুরু হওয়ার পর থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৮৯০টি কেস শনাক্ত হয়েছে।

তবে হান্টাভাইরাসের একটি প্রধান ধরন সিউল ভাইরাস বহন করে নরওয়ে ইঁদুর, যা ব্রাউন র‍্যাট নামেও পরিচিত। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক জায়গায় এই ইঁদুর দেখা যায়।

সম্পর্কিত