জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের বিশেষ অভিযান

রাতে বেরিয়ে আটক শতাধিক, ‘হাজার টাকা নিয়ে’ যেতে বলা হয় থানায়

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১: ২১
পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ কমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ের সামনে রাতভর আটকদের স্বজনের ভিড়। স্ট্রিম ছবি

পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের ৬ থানা এলাকায় বিশেষ অভিযানে ‘বিনা কারণে’ শতাধিক ব্যক্তিকে আটকের অভিযোগ উঠেছে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ১০টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত তাদের আটক করা হয়। তবে এর মধ্যে মাত্র ১০ জন নিয়মিত মামলার আসামি বলে জানা গেছে। বাকিরা আসামি না হলেও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হয়েছে।

অধিকাংশের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাদের স্বজনরা রাতে বেরিয়ে আটক হয়েছে। এরপর সকাল পর্যন্ত রাখা হয় থানা হাজতে। তবে কেন আটক করা হয়েছে তা জানানো হয়নি। শুধু স্বজনকে আটকের তথ্য দিয়ে এক হাজার টাকা নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানায় অথবা ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আল ফয়সালের ভ্রাম্যমাণ আদালতে যেতে বলা হয়।

তেজগাঁও বিভাগের অধীনে থাকা ৬টি থানা হলো–তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, মোহাম্মদপুর, আদাবর, শেরেবাংলা নগর ও হাতিরঝিল থানা। এর মধ্যে মোহাম্মদপুর থেকে ৫৪ জন, আদাবর থেকে ৪১ জন ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে দু’জনকে আটক করা হয়েছে। বাকি তিন থানায় আটক হলেও কতজন তা জানা যায়নি।

মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ জানায়, আটকদের মধ্যে হত্যা মামলায় একজন, ডাকাতির প্রস্তুতি মামলায় একজন, মুক্তিপণ আদায়ে জড়িত চারজন ও জিআরসি মামলায় ওয়ারেন্ট থাকা চারজনকে আজ ঢাকা মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতে পাঠানো হয়। থানার এসআই উক্য মং স্ট্রিমকে জানান, বাকি ৪৪ জনকে পর্যায়ক্রমে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ কমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়ে স্থাপিত ভ্রাম্যমাণ আদালতে পাঠানো হয়।

অনেক স্বজনের চোখে-মুখে ছিল অনিশ্চয়তা। স্ট্রিম ছবি
অনেক স্বজনের চোখে-মুখে ছিল অনিশ্চয়তা। স্ট্রিম ছবি

অন্য থানাগুলো থেকেও আটকদের এই ভ্রাম্যমাণ আদালতে পাঠানো হয়। আজ দুপুরের দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের সামনে গিয়ে দেখা যায়, ফটকের বাইরে অপেক্ষা করছেন অনেকের স্বজন। তাদের কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

সেখানে মা ও স্বজনদের নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন আরাফাত। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, তার দুই ভাই সাইমুম ও সুনান রাতে বাসার বাইরে যাওয়ার পর আটক করে শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ। তবে কী কারণে ধরা হয়েছে জানেন না। সারারাত দুই ভাই থানা হাজতে ছিল। সকালে তেজগাঁও বিভাগের ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আনা হয়েছে।

তাদের মা বলেন, কখনোই থানা পুলিশের কাছে যাননি। যাওয়ার মতো কোনো অপরাধই করেননি। অথচ তার দুই সন্তানকে থানায় নেওয়া হয়েছে। ছেলেদের আটকের পর থানা পুলিশ খবর পাঠিয়েছে, আটক প্রত্যেকের জন্য এক হাজার টাকা করে নিয়ে নিয়ে আসতে।

একই কথা জানান মোহাম্মদপুর থেকে আটক আল ইসলামের নানী। তিনি বলেন, ‘আমার নাতিরে কেন ধরছে জানি না। তবে থানা পুলিশ থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে যেতে বলেছে। পুলিশকে দিয়েছি। কিন্তু এখনও ছাড়া পায়নি।’

আটক মাসুদের স্ত্রী স্ট্রিমকে বলেন, তার স্বামীকে কেন আটক করা হয়েছে জানেন না। ছোট সন্তান নিয়ে সকাল থেকে থানা ও ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ে ঘুরছেন। কিন্তু স্বামীর দেখা পাননি।

ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয়ের সামনে হাতকড়া পরে থাকা শাহিন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাকে রাত ১০টার পর মোহাম্মদপুর টাউন হল এলাকা থেকে ধরেছে। আমি লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্সের চালক। আমি রিকশায় করে আমার গাড়ির দিকে যাচ্ছিলাম। পথে রিকশা থামিয়ে তল্লাশি করে কিছু না পেলেও আটক করে নিয়ে যায়।’

সার্বিক বিষয়ে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে কর্মরত এএসআই স্বপন স্ট্রিমকে বলেন, তেজগাঁও বিভাগের বিভিন্ন থানা পুলিশের কাছে আটকদের বিচার চলেছে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। তাদের অনেককে অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড বা উভয়দণ্ড দেওয়া হয়েছে। কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের কেরানীগঞ্জে অথবা কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, আটকের সময় তার মোবাইল ফোন নিয়ে নেয় পুলিশ। পকেটে ২২শ টাকা ছিল। সেখান থেকে ২০০ টাকা ফেরত দিয়ে বাকিটা নিয়ে গেছে। পরিবারের কাউকে ফোন দিতেও দেয়নি। তারা জানেও না তিনি আটক হয়েছেন।

তবে শাহিনকে আটক করা মোহাম্মদপুর থানা পুলিশের এক এসআই নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আসামি কখনও সত্য কথা বলে? ওর পরিবারের সবাই জানে। কোনো না কোনোভাবে সে জানিয়েছে। এখন বিচার হবে ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে। সেখানেই ওর কথা জানাবে।’

সেখানে আসামি নিয়ে আসা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার এসআই হারুন অর রশিদ বলেন, কেউ যদি রাতে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করেন। পুলিশের জেরার মুখে ঠিকমতো জবাব দিতে না পারেন। কথাবার্তা অসংলগ্ন মনে হয়, তখনই তাকে আটক করা হয়।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্সের ১০০ ধারায় এসব ব্যক্তিদের আটক করা হয়েছে। তাদের ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সামনে নেওয়া হচ্ছে। সেখানে বিচার হবে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) বাদল গোমস্তা স্ট্রিমকে জানান, বিশেষ অভিযানে তারা দুজনকে আটক করে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে পাঠিয়েছেন। তবে পরবর্তীতে কী হয়েছে জানেন না।

আদাবর থানার ওসি জিয়াউর রহমান স্ট্রিমকে জানান, তারা ৪১ জনকে ডিএমপি অধ্যাদেশের বিভিন্ন ধারায় আটক দেখিয়ে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠিয়েছেন। তবে আদালত কতজনকে সাজা অথবা খালাস দিয়েছেন তা জানেন না।

আর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় হাতিরঝিল থানার ওসি গোলাম মর্তুজা স্ট্রিমকে বলেন, বিশেষ অভিযান এখনও চলছে। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে কতজনকে পাঠানো হয়েছে তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।

সার্বিক বিষয়ে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে কর্মরত এএসআই স্বপন স্ট্রিমকে বলেন, তেজগাঁও বিভাগের বিভিন্ন থানা পুলিশের কাছে আটকদের বিচার চলেছে বিকেল ৩টা পর্যন্ত। তাদের অনেককে অর্থদণ্ড, কারাদণ্ড বা উভয়দণ্ড দেওয়া হয়েছে। কারাদণ্ডপ্রাপ্তদের কেরানীগঞ্জে অথবা কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অনেককে খালাস দেওয়া হয়েছে। তবে দণ্ড ও খালাস পাওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট সংখ্যা জানাতে পারেনি তিনি।

তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার জুয়েল রানা স্ট্রিমকে বলেন, গতকাল রাত ১০টা থেকে ২টা পর্যন্ত অন্তত ৯৪ জনকে আটক করা হয়। আজ সকালেও বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তেজগাঁও বিভাগের ঊধ্র্বতন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ টিম এই অভিযান পরিচালনা করছে। এটি চলবে।

সম্পর্কিত