২ বছরেও অধরা অনিকের হত্যাকারীরা, অর্থকষ্টে দিশাহারা পরিবার

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
রাঙামাটি

আদরসেন চাকমা ও তারাসুন্দরী চাকমার ছোট ছেলে অনিক কুমার চাকমা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া
আদরসেন চাকমা ও তারাসুন্দরী চাকমার ছোট ছেলে অনিক কুমার চাকমা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

রাঙামাটির মগবান নোয়াদাম গ্রামে থাকেন আদরসেন চাকমা ও তারাসুন্দরী চাকমা। অর্থের অভাবে বাড়ির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ করতে পারেননি। ৯ বছর আগে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ছেলে কিশোর কুমার চাকমাকে নিয়ে টানাটানির সংসার।

অনিক কুমার চাকমা নামে তাদের আরেক ছেলে ছিল। ছিল, কারণ রাঙামাটিতে দুই বছর আগে এক সহিংসতায় তাদের এই ছোট ছেলে প্রাণ হারায়। কাপ্তাইয়ে কর্ণফুলী সরকারি ডিগ্রি কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ত সে। ছেলের হত্যাকারী কারা, কী তার অপরাধ ছিল—তা জানতে আজও অপেক্ষা করছেন এই দম্পতি।

পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ২০২৪ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর মোটরসাইকেল চুরিকে কেন্দ্র করে মো. মামুন নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এর জেরে পরদিন দীঘিনালায় মিছিল বের করে স্থানীয় বাঙালিরা। একপর্যায়ে লারমা স্কোয়ার এলাকায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। সেদিন সন্ধ্যায় খাগড়াছড়ির স্বনির্ভরে পাহাড়িদের ওপর গুলি চলে। এতে নিহত হয় দুজন।

ওই ঘটনার প্রতিবাদে ২০ সেপ্টেম্বর রাঙামাটিতে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। একপর্যায়ে বনরায় আক্রান্ত হয় বনরূপা মসজিদ। এই তথ্য মসজিদের মাইকে ঘোষণার পরপরই পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেয়। শুরু হয় সহিংসতা। পাহাড়িদের দোকানপাট, বৌদ্ধ মন্দির ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ভবনে আগুন লাগানো হয়। সহিংসতার একপর্যায়ে দক্ষিণ কালিন্দীপুরের রাস্তার মুখে নিহত হয় অনিক।

এ ঘটনায় আদালতে আসামিদের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন তারাসুন্দরী। আদরসেন কোতোয়ালি থানায় কয়েকজনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন। মামলা দুটি আমলে নিয়ে পুলিশকে তদন্তের আদেশ দেন আদালত।

তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি পুলিশ।

মামলার অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে অনিকের মা-বাবা বলেন, আইনের কী বুঝি আমরা? মামলার এখন কী অবস্থা, ভবিষ্যতে কী হবে—কিছুই জানি না। শুরুতে সন্দেহভাজন হিসেবে পুলিশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। এখন তারা সবাই জামিনে।

শুরুতে অনেক মানুষ খোঁজ নিলেও এখন কেউ একটাবারের জন্যও এসে জিজ্ঞেস করে না, আমরা কেমন আছি, আক্ষেপ এই দম্পতির।

মামলা দুটির কোনো অগ্রগতি নেই জানিয়ে বাদীর আইনজীবী রাজীব চাকমা বলেন, আদরসেন চাকমার মামলার এজাহারে সুনির্দিষ্ট করে আসামিদের নাম উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তাদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

জানতে চাইলে রাঙামাটি কোতোয়ালি থানার ওসি জসিম উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সংঘাতের ঘটনায় হওয়া মামলাগুলোর কোনোটির চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হয়নি। এসব মামলায় যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, আদালত তাদের জামিন দিয়েছেন। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) অনিকের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে মগবান নোয়াদাম গ্রামে সেই বেড়াহীন টিনের ছাউনি দেওয়া বাড়িতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তাঁর মা-বাবা ও বড় ভাই।

অনিকের মৃত্যুর পর জেলা পরিষদের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা এবং তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে এক লাখ টাকা সহায়তা পেয়েছিল পরিবার।

আদরসেন ও তারাসুন্দরী বলেন, প্রথম দিকে যে সহায়তা পেয়েছিলাম, তার বড় অংশ শেষ হয় অনিকের মৃত্যুর পর ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সারতে। আদালত আর থানায় মামলার জন্য আরও প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়।

তারা বলেন, অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে থাকার জন্য একটা ছোট্ট জায়গা কিনেছিলাম। কিন্তু ঘর তোলার কাজ শেষ করার মতো টাকা আর অবশিষ্ট নেই। বেড়া ছাড়া এই ঘরেই রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে থাকতে হচ্ছে।

অনিকের পরিবারের অবস্থা শোচনীয় উল্লেখ করে গ্রামপ্রধান কিনাধন চাকমা বলেন, চরম আর্থিক অনটনে দিন কাটছে তাদের। ঘরের কাজটাও শেষ করতে পারেনি। বৃদ্ধ বয়সে বাঁশ আর লাকড়ি বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালাচ্ছেন অনিকের বাবা।

তিনি বলেন, প্রথম দিকে অনেকে খোঁজখবর নিলেও এখন আর কেউ তাদের খোঁজ নেয় না। ভবিষ্যৎ পুরো অন্ধকার। আমাদের গ্রামের অধিকাংশ মানুষই গরিব জেলে আর বনজীবী। নিজেদের সংসার চালাতেই যেখানে হিমশিম খেতে হয়, সেখানে এই পরিবারকে সহায়তা করার মতো সামর্থ্য কারও নেই।

বিষয়:

রাঙামাটি
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত