ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা ও যত্নে যা জানা জরুরি
ডা. কাকলী হালদার
-3f0d26.jpeg)
বর্তমানে ডেঙ্গু ভাইরাসকে সরাসরি নির্মূল করার জন্য সাধারণভাবে ব্যবহৃত কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই ডেঙ্গুর চিকিৎসার মূল ভিত্তি হলো সময়মতো রোগ শনাক্ত করা, রোগের তীব্রতা বোঝা, পর্যাপ্ত তরল দেওয়া, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া।
বাড়িতে ডেঙ্গু রোগীর কীভাবে যত্ন নেবেন?
যেসব রোগীর বিপদসংকেত নেই এবং চিকিৎসকের পরামর্শে বাড়িতে রাখা নিরাপদ, তাদের বাড়িতে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
১. রোগীকে যথেষ্ট বিশ্রাম দিতে হবে।
২. পর্যাপ্ত তরল যেমন স্যালাইন, ডাবের পানি, স্যুপ, ফলের রস, ডালের পানি এবং অন্যান্য তরল খাবার দেওয়া যেতে পারে।
৩. শুধু পানি না খাইয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ইলেকট্রোলাইটযুক্ত তরল দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। তবে অতিরিক্ত পানি বা তরল জোর করে খাওয়ানোও ঠিক নয়। হৃদরোগ, কিডনি রোগ, বয়স্ক ব্যক্তি, শিশু বা গর্ভবতী রোগীর ক্ষেত্রে তরলের পরিমাণ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হওয়া উচিত।
৪. প্রস্রাবের দিকে নজর রাখুন। রোগীর প্রস্রাব স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে কি না খেয়াল করুন। প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৫. রোগীর ক্ষুধা থাকলে হালকা ও পুষ্টিকর খাবার দিন। ক্ষুধা কম থাকলে জোর করে খাবার খাওয়ানোর প্রয়োজন নেই; পর্যাপ্ত তরল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বর কমাতে কী ওষুধ খাবেন?
ডেঙ্গুতে জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশের জাতীয় ডেঙ্গু গাইডলাইন অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দৈনিক সর্বোচ্চ ৩ গ্রাম প্যারাসিটামল-এর বেশি না নেওয়াই নির্দেশিত। শিশুদের ক্ষেত্রে ওজন অনুযায়ী মাত্রা নির্ধারণ করতে হয়। অতিরিক্ত প্যারাসিটামল গ্রহণ করলে লিভারের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। জ্বর বেশি হলে প্রয়োজন গা মুছে দেওয়া বা স্পঞ্জিং করা যেতে পারে।
কোন ওষুধগুলো এড়িয়ে চলবেন?
ডেঙ্গু সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিচের ওষুধগুলো ব্যবহার করা উচিত নয়—অ্যাসপিরিন, আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন, মেফেনামিক অ্যাসিড বা অন্যান্য এনএসএআইডি এবং অপ্রয়োজনীয় স্টেরয়েড। এসব ওষুধের মধ্যে বিশেষ করে এনএসএআইডি রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করাও উচিত নয়, কারণ ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ।
প্লাটিলেট কমলেই কি প্লাটিলেট দিতে হবে?
না, সবসময় নয়। শুধু প্লাটিলেট কমে গেছে বলে প্লাটিলেট সঞ্চালন দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্লাটিলেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত রোগীর রক্তপাত, শারীরিক অবস্থা, প্লাটিলেটের মাত্রা এবং অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসক নেন। তাই বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ‘প্লাটিলেট বাড়ানোর’ ওষুধ, ভেষজ উপাদান বা ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন?
নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে হাসপাতালে বা উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে হবে—জ্বর কমে যাওয়ার পর হঠাৎ রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়া, তীব্র বা ক্রমাগত পেটব্যথা, বারবার বমি বা খাবার ধরে রাখতে না পারা, নাক-মাড়ি, বমি, পায়খানা বা প্রস্রাবে রক্ত, কালো পায়খানা, প্রস্রাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা অস্থিরতা, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। এসব লক্ষণ গুরুতর ডেঙ্গু বা শকের দিকে যাওয়ার সংকেত হতে পারে।
ডেঙ্গুতে মৃত্যু কেন হয়?
ডেঙ্গুতে মৃত্যু শুধু ভাইরাসের সরাসরি আক্রমণের কারণে হয় না। গুরুতর ডেঙ্গুতে শরীরের রোগপ্রতিরোধী প্রতিক্রিয়া ও রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে। এর ফলে রক্তনালি থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যেতে পারে। এতে রক্তনালির ভেতরে রক্তের কার্যকর পরিমাণ কমে যায় এবং রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে নেমে যেতে পারে। এ অবস্থাকে শক বলা হয়। শক দীর্ঘস্থায়ী হলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে কিডনি, লিভার, মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্রসহ বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে।
এ ছাড়া গুরুতর রক্তপাত, লিভারের তীব্র সমস্যা, মস্তিষ্কের জটিলতা এবং অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতিও গুরুতর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
ডেঙ্গুতে স্যালাইন দেয়া কতটা জরুরি?
অনেকেই মনে করেন ডেঙ্গু হলেই বেশি বেশি স্যালাইন দিতে হবে। এটি ভুল এবং কখনো কখনো বিপজ্জনক। যে রোগী মুখে পর্যাপ্ত তরল খেতে পারছেন এবং যার শরীরে পানিশূন্যতা বা শক নেই, তাকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিরাপথে তরল দেওয়ার দরকার নেই। আবার রোগীর শরীরে প্লাজমা লিকেজ বা শক হলে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে উপযুক্ত পরিমাণে শিরাপথে তরল প্রয়োজন হতে পারে।
কিন্তু রোগী যখন সুস্থ হওয়ার পর্যায়ে চলে যান, তখন শরীরে অতিরিক্ত তরল জমে ফ্লুইড ওভারলোড হতে পারে। তাই ডেঙ্গুতে স্যালাইন দেওয়ার বিষয়টি রোগীর ওজন, রক্তচাপ, হেমাটোক্রিট, প্রস্রাবের পরিমাণ, প্লাজমা লিকেজ এবং সামগ্রিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসককে সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন আছে কি?
হ্যাঁ, বিশ্বের কিছু দেশে ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া এবং কিউডেঙ্গা (টিএকে-০০৩) উল্লেখযোগ্য। তবে দুটি ভ্যাকসিনের ব্যবহারবিধি এক নয়। বিশেষ করে ডেঙ্গভ্যাক্সিয়া-এর ক্ষেত্রে আগে ডেঙ্গু সংক্রমণ হয়েছিল কি না—অর্থাৎ Serostatus একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অন্যদিকে কিউডেঙ্গা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্দিষ্ট উচ্চ-সংক্রমণ পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট বয়সী শিশুদের টিকাদানের সুপারিশ করেছে এবং এক্ষেত্রে আগে ডেঙ্গু হওয়া বা না হওয়া নিয়ে কোনো স্ট্যাটাস দেখা হয়না। তবে ভ্যাকসিন নেওয়া মানেই ডেঙ্গু থেকে শতভাগ সুরক্ষা নয় তবে এটা হাসপাতালে ভর্তি ৮০-৯০ শতাংশ কমায় এবং রোগের তীব্রতা রোধ করে। কিন্ত ভ্যাকসিন কখনোই মশা নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নয়। বাংলাদেশে এখনো ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের অনুমোদন দেয়নি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এখনো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ।
১. মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করুন। বাসা ও আশপাশে নিয়মিত খুঁজে দেখুন কোথাও পানি জমে আছে কি না। বিশেষ করে—ফুলের টব ও টবের নিচের ট্রে, পুরোনো টায়ার, প্লাস্টিকের বোতল, পরিত্যক্ত কাপ ও পাত্র, ছাদে জমে থাকা পানি, এসি-র পানির ট্রে, ফ্রিজের ট্রে, নির্মাণাধীন ভবনের পাত্র, পানির ট্যাংক, যেকোনো ছোট বা বড় পানি জমার জায়গা। জমে থাকা পানি নিয়মিত ফেলে দিন, পাত্র পরিষ্কার করুন এবং প্রয়োজনীয় পাত্র ঢেকে রাখুন। শুধু ‘তিন দিন পরপর পানি ফেলে দিলেই হবে’—এমন একটি নির্দিষ্ট নিয়মের ওপর নির্ভর না করে লক্ষ্য হওয়া উচিত, মশার প্রজননের সুযোগই না রাখা।
২. দিনের বেলাতেও মশা থেকে নিজেকে রক্ষা করুন। এডিস মশা দিনের বেলায় সক্রিয় থাকে। তাই—ফুলহাতা পোশাক পরুন, প্রয়োজন অনুযায়ী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন, জানালা-দরজায় নেট ব্যবহার করুন, ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করুন, ঘরের ভেতরে মশার উপস্থিতি কমানোর ব্যবস্থা করুন। বিশেষ করে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আক্রান্ত রোগীকে কামড়ানো মশা পরে অন্য মানুষকে আক্রান্ত করতে পারে।
৩. ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। একটি বাড়ি পরিষ্কার রাখলেও পাশের নির্মাণাধীন ভবন, রাস্তার পাশের পরিত্যক্ত পাত্র কিংবা আবর্জনার স্তূপে যদি এডিস মশা বংশবিস্তার করে, তাহলে পুরো এলাকার মানুষ ঝুঁকিতে থাকবে। তাই প্রয়োজন পরিবার, স্থানীয় সরকার, সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণ প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ।
রাষ্ট্র ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব
১. বিজ্ঞানভিত্তিক মশক নিয়ন্ত্রণ: কোন এলাকায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি, তা নিয়মিত এন্টোমোলজিক্যাল সার্ভেইলেন্সের মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে মশা ব্যবহৃত কীটনাশকের বিরুদ্ধে ইনসেক্টিসাইড রেজিস্ট্যান্স তৈরি করেছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
২. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: প্লাস্টিকের পাত্র, পুরোনো টায়ার, ডাবের খোসা ও পানি ধরে রাখতে পারে এমন আবর্জনা দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
৩. হাসপাতালের প্রস্তুতি: ডেঙ্গু মৌসুমের আগেই হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ও প্রশিক্ষিত চিকিৎসক-নার্স, ল্যাবরেটরি সুবিধা, অক্সিজেন, প্রয়োজনীয় ওষুধ, রক্ত ও রক্তের উপাদান, এইচডিইউ ও আইসিইউ সুবিধা প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন।
৪. কোন এলাকায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। রোগের বিস্তার অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।
ডেঙ্গু কোনো অজেয় রোগ নয়। সঠিক সময়ে রোগ শনাক্ত করা, রোগীর অবস্থার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা, বিপদসংকেতগুলো চিনতে পারা, প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক পরিমাণে তরল দেওয়া এবং সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি ব্যাপকভাবে কমানো সম্ভব।
মনে রাখতে হবে, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র শুধু হাসপাতাল নয়—আমাদের প্রতিটি বাড়ি, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান এবং পুরো সমাজ। নিজের বাড়ির পানি জমার জায়গা পরিষ্কার করুন, প্রতিবেশীকেও সচেতন করুন এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করুন।
ডা. কাকলী হালদার: সহকারী অধ্যাপক, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
.png)






-620e44.jpeg)
-d7c325.jpg)
-620e44.jpeg)
-8b2e31-256x144.webp)

