ইসলামি বইমেলায় আল-কায়েদা নেতাদের বই, পেছনে কারা

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইসলামি বইমেলায় দেদার বিক্রি হচ্ছে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতাদের বই। হাত বাড়ালেই মিলছে বিতর্কিত ও দণ্ডিত ধর্মীয় বক্তাদের অনূদিত বয়ান। ঘুরেফিরে এসব বইয়ের অনুবাদক ও প্রকাশক হাতেগোনা কয়েকজন। বাংলাবাজারের নিজস্ব দোকান, অনলাইন বই বিপণন প্রতিষ্ঠান এবং ই-বুক স্টোরেও বিক্রি হচ্ছে। অনলাইন বাজারজাতে এমন সব ধর্মীয় বক্তার ‘রেকমেন্ডেশন’ ব্যবহার করা হচ্ছে, যাঁরা বিতর্কিত।

গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের পূর্ব চত্বরে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাসব্যাপী এই বইমেলা উদ্বোধন করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ। সরেজমিন মেলায় ডজনখানেক প্রকাশনীতে আল-কায়েদার আধ্যাত্মিক গুরু প্রয়াত আবদুল্লাহ আযযাম, প্রধান ওসামা বিন লাদেন, আয়মান আল-জাওয়াহিরি ও আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টের (একিউআইএস) সাবেক-বর্তমান নেতাদের বই বিক্রি হতে দেখা যায়।

যেসব বইয়ের কথা বলা হচ্ছে, তার লেখকেরা বৈশ্বিক সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত। তাঁরা যে উগ্রবাদ ছড়িয়েছেন, তা প্রমাণিত। ফলে মেলায় এই ধরনের বই বিপণনে সঠিক যাচাই-বাছাই পদ্ধতি মানা উচিত।
ঢাবি অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফা

যদিও এবার মেলা শুরুর আগেই বিতর্ক দেখা দেয়। ৯ সেপ্টেম্বর কওমিধারার ছোট কাগজের লেখক-সম্পাদকদের সংগঠন ‘লিটলম্যাগ আন্দোলন’ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, মেলা আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রকাশকদের একটি অংশ ‘ধর্মীয় অসহিষ্ণু’। নাম প্রকাশ না করে লিটলম্যাগ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এক সম্পাদক স্ট্রিমকে বলেন, গত বছর ইসলামি বইমেলায় অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম গেলে প্রকাশকদের এই অংশ তিনবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। পরে মাহফুজ আলমও ঘটনার সত্যতা স্ট্রিমকে জানান।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আল-কায়েদা সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ। সংগঠনের ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা ‘আনসার আল-ইসলাম’ ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, আল-কায়েদা নেতাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে উগ্রবাদ ছড়ানোর অভিযোগ প্রমাণিত। তাদের বিভিন্ন লেখা ও বয়ানের বাংলা অনুবাদ দেশেও গোষ্ঠীটির মতামর্শ বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। এই ধরনের বই সঠিক যাচাই-বাছাই পদ্ধতির মাধ্যমে বাজারে আসা উচিত।

দীর্ঘদিন উগ্রবাদ নিয়ে গবেষণা করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব ধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফা স্ট্রিমকে বলেন, ‘যেসব বইয়ের কথা বলা হচ্ছে, তার লেখকেরা বৈশ্বিক সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত। তাঁরা যে উগ্রবাদ ছড়িয়েছেন, তা প্রমাণিত। ফলে ঝুঁকি থেকেই যায়। মেলায় এই ধরনের বই বিপণনে সঠিক যাচাই-বাছাই পদ্ধতি মানা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘উগ্রবাদ বৈশ্বিক সমস্যা– মেনে নিয়ে তা মোকাবিলায় সরকারের সুনির্দিষ্ট পথরেখা ও কাঠামো থাকা দরকার। তবে বর্তমান সরকারের মধ্যে উগ্রবাদ ডিল করার ক্ষেত্রে এই ধরনের পলিসি দেখা যাচ্ছে না।’

রাজধানীতে ইসলামি বইমেলায় পাঠকের ভিড়। ছবি: ফোকাস বাংলা
রাজধানীতে ইসলামি বইমেলায় পাঠকের ভিড়। ছবি: ফোকাস বাংলা

এ বিষয়ে আয়োজক ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক মুফতি মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী নদভী স্ট্রিমকে বলেন, ‘এই ধরনের তথ্য আগে থেকে আমাদের কাছে ছিল না। আমরা ওপেন টেন্ডার দিয়ে থাকি। আলেম-উলামারা যদি বলেন, এগুলো আল-কায়েদার বই, আমরা ব্যবস্থা নেব। কারণ দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হয়, সেরকম কোনো কাজ কেউই পছন্দ করবে না।’

শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বই

গাড়িবোমায় নিহত হন জর্ডানের ধর্মতাত্ত্বিক আবদুল্লাহ আযযাম। বলা হয়, তাঁর মতাদর্শ ও প্রতিষ্ঠিত নেটওয়ার্কের ভিত্তিতেই আল-কায়েদার জন্ম। আবদুল্লাহ আযযামের শিষ্য ওসামা বিন লাদেন আল-কায়েদার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান। বিশ্বজুড়ে সশস্ত্র সংগঠনটি ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে ওসামার বড় ভূমিকা রয়েছে। জীবদ্দশায় তাঁর ডানহাত ছিলেন আয়মান আল-জাওয়াহিরি, যিনি পরে আল-কায়েদার শীর্ষ নেতৃত্বে আসেন এবং নিহত হন। তাদেরসহ আল-কায়েদার ডজনখানেক আধ্যাত্মিক, সামরিক ও রাজনৈতিক নেতার বই-বক্তৃতা বাংলায় অনুবাদ, প্রকাশ ও বিপণনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইসলামি বইমেলা ঘুরে হাতেগোনা কয়েকজনকে এসব বইয়ের অনুবাদক ও প্রকাশক হিসেবে দেখা যায়।

অনলাইন প্রচারের মাধ্যমে অনুসারীদের এসব বই কিনতে উৎসাহ দিচ্ছেন আল-কায়েদার প্রকাশ্য সমর্থক, সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় জামিনে মুক্ত এবং দাওয়াহ সার্কেলের সঙ্গে যুক্তরা। সংশ্লিষ্ট প্রকাশকেরা বইয়ের বিপণনে এসব ব্যক্তির ‘রেকমেন্ডেশন’ ব্যবহার করছেন।

সালাফি ঘরানার প্রকাশনী সিয়ান, সন্দীপন, সমকালীন ও রুহামাই মূলত বেছে বেছে উগ্রপন্থী নেতাদের বই বাজারে আনছে বলে জানান রাজধানীর বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারের এক প্রকাশক। এর বাইরে আর-রিহাব, শব্দতরু, চেতনা, ইলমওয়েব, ইলমহাউজ, খান প্রকাশনীসহ নতুন-পুরোনো ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান উগ্রবাদী ধারার বই প্রকাশ ও বাজারজাত করছে।

গত ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জামিনে মুক্ত উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন দাওয়াহ সার্কেলের কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি রাখা হচ্ছে জানান। এই বক্তব্যের সমালোচনা করে ১১ সেপ্টেম্বর সিয়ান পাবলিকেশনের মালিক আহমদ রফিক ভেরিফায়েড ফেসবুকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছবিযুক্ত খবরের একটি ফটোকার্ড শেয়ার করে লেখেন, ‘হাসিনাও নজরদারি করেছিল। এরপর জনগণও তাঁকে নজরদারিতে এনেছিল। আপনারা নজরদারি শুরু করলে জনগণ আপনাদেরও নজরদারিতে আনবে ইনশাআল্লাহ। সমস্যা হইল, আওয়ামী লীগের পালানোর জন্য ভারত ছিল। আপনারা কোথায় যাবেন? বঙ্গোপসাগর ছাড়া কোনো গতি থাকবে না। সো, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না।’

বেছে বেছে একই ধারার বই

নাম প্রকাশ না করে রাজধানীর বাংলাবাজারের ইসলামী টাওয়ারের এক প্রকাশক বলেন, সিয়ান, সন্দীপন, সমকালীন ও রুহামা– চারটি প্রকাশনী সালাফি ঘরানার। তারাই বেছে বেছে উগ্রপন্থী নেতাদের বই বাজারে আনছে। এদের কারও কারও সঙ্গে সাবেক সামরিক কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এজন্য সাধারণ প্রকাশকেরা তাদের ঘাঁটান না।

খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত আল-কায়েদার শীর্ষস্থানীয় নেতা খালিদ আল হুসাইনান ওরফে আবু জায়েদ আল-কুয়েতির হাফডজন বই প্রকাশ করেছে রুহামা পাবলিকেশন্স। ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত মার্কিন বক্তা আহমাদ মুসা জিবরিলের ডজনখানেক বই এনেছে সন্দীপন ও সমকালীন প্রকাশন। মুসা জিবরিল নিজের উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে শাস্তি পেয়েছেন।

সিয়ান পাবলিকেশন প্রকাশ করেছে ‘ফাদার অব তালেবান’খ্যাত সামিউল হক হাক্কানির বই। সামিউল পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখুয়ার দারুল উলুম হাক্কানিয়া মাদ্রাসার প্রধান ছিলেন। ২০১৮ সালে রাওয়ালপিন্ডির নিজবাসায় তিনি নিহত হন। সামিউলের উত্তরসূরি ছেলে হামিদুল হক হাক্কানিও গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি আত্মঘাতী হামলায় মারা যান।

দুই শতাধিক স্টল নিয়ে বইমেলার মূল উদ্যোগ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের। তবে সিয়ান, সন্দীপন, সমকালীন, রুহামাসহ কয়েকটি প্রকাশনী মূল ভূমিকায় রয়েছে।

রুহামা পাবলিকেশনের মালিক রফিকুল ইসলাম এই মেলার আয়োজন কমিটিরও সদস্য। আল-কায়েদা নেতা খালিদ আল হুসাইনানের বই প্রকাশনার বিষয়ে স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘এই বইগুলো অনেক আগের। আর অনূদিত বই। এগুলো বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে করেছি। মৌলিক কোনো বই না। উনাদের বিষয় যখন সামনে আসছে এরপর তো আর করা হচ্ছে না।’

বইগুলো মেলায় বিক্রি করছেন কি না জানতে চাইলে বলেন, ‘হ্যাঁ, আছে। এগুলা তো শুধু আমরাই করিনি, আরও অনেকেই করেছে।’

অনুসন্ধানে দেখা যায়, চারটির বাইরে আর-রিহাব, শব্দতরু, চেতনা, ইলমওয়েব, ইলমহাউজ, খান প্রকাশনীসহ নতুন-পুরোনো ডজনের বেশি প্রতিষ্ঠান উগ্রবাদী ধারার বই প্রকাশ ও বাজারজাত করছে। এর মধ্যে আর-রিহাব উসামা বিন লাদেন, আইমান আল জাওয়াহিরি, আসেম ওমর, মোল্লা দাদুল্লাহ, শাইখ ইউসুফ আল-উয়াইরি, আবু উসামা, আসিম আল বারকাওয়ি ওরফে আবু মুহাম্মাদ মাকদিসি, আহমাদ ফারুকের মতো আল-কায়েদার প্রথম সারির নেতাদের একাধিক বই প্রকাশ করেছে।

২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাবাজার থেকে আর-রিহাবের প্রকাশক ও মালিক হাবিবুর রহমান ওরফে শামীমকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পুলিশ জানায়, তিনি আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উগ্রবাদ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বই প্রকাশ ও বিক্রি করেন।

শব্দতরু প্রকাশ করেছে শাইখ খালিদের একাধিক বই। শাইখ আবু হামজাহ নামে দণ্ডপাওয়া আরেক আল-কায়েদা নেতার বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছে তারা। ইলমওয়েব বাজারে এনেছে শাইখ আহমাদ মুসা জিবরিল ও শাইখ আসিম আল বারকাওয়ীর বই।

২০১৫ সালে পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন একিউআইএস সেকেন্ড ইন কমান্ড পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক আহমাদ ফারুক। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই নেতার সশস্ত্র সংগ্রামের সঙ্গী ও তাঁর স্ত্রীর লেখা একটি স্মৃতিমূলক বই প্রকাশ করে আর-রিহাব। আহমাদ ফারুকের স্ত্রীর বয়ানে রণাঙ্গনের স্মৃতিমূলক ‘প্রিয়তমের সঙ্গে আমার রণাঙ্গনের স্মৃতিকথা’ অনুবাদ করেছেন মুফতি আরিফ মাহমুদ। বইটি তিনি মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীকে উৎসর্গ করেছেন।

উৎসর্গপত্রে আরিফ মাহমুদ লিখেছেন, শাইখ মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানি হাফিজাহুল্লাহ, যিনি আল্লাহর দীনের জন্য ত্যাগ ও কুরবানির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন; দীর্ঘ প্রায় এক যুগ কারাবন্দি থেকে এ পথের কঠিনতম পরীক্ষা অতিক্রম করেছেন। দীনের বিজয় ও শাহাদাতের মহিমান্বিত পথকে তিনি জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

আর-রিহাব ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে লেখা মোল্লা দাদুল্লাহর ‘সত্যের সন্ধানে সেই যুবক’, আয়মান আল-জাওয়াহিরির ‘আমার দেখা শাইখ ওসামা’, আনওয়ার আল-আওলাকির ‘নবিদের জীবন কাহিনি’, আসেম ওমরের ‘দাজ্জাল: কালো পতাকার চূড়ান্ত শত্রু’ ও ‘দুটি জীবন ব্যবস্থার লড়াই: ইসলাম ও গণতন্ত্র’, ইউসুফ আল-উয়াইরি ও আনওয়ার আল-আওলাকির যৌথভাবে লেখা ‘আল্লাহর পথে যা কিছু অপরিবর্তনীয়’ প্রকাশ করেছে। এসব বইয়ের অধিকাংশের অনুবাদক, সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন আরিফ মাহমুদ।

বইগুলোর লেখকদের মধ্যে আনোয়ার আল-আওলাকিকে ২০১১ সালে ইয়েমেনে ড্রোন হামলায় হত্যা করে ওবামা প্রশাসন। আসেম ওমর আফগানিস্তানে নিহত হন ২০১৯ সালে। আসেম ওমরের বইটির প্রচ্ছদ গত ৫ জুলাই আর-রিহাব পাবলিকেশন্সের ফেসবুক পেজে পোস্ট করে লেখা হয়, ‘রহমানি সাহেব যে বইটি হাইলি রেকমেন্ড করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ। দ্রুতই সংগ্রহ করুন।’

গত ৩ জুলাই আরেকটি বইয়ের প্রচ্ছদ যুক্ত করে একইভাবে বলা হয়, বইটি আসিফ আদনান ‘হাইলি রেকমেন্ড’ করেছেন। গত ১৫ মে এসব বইয়ের সঙ্গে কয়েকটি যুক্ত করে লেখা, ‘শাইখ মুফতি হারুন ইজহার হাফিজাহুল্লাহর প্রিয় বইগুলো। দ্রুতই সংগ্রহ করুন।’

বই রিকমেন্ড করে আসিফ আদনানের পোস্ট। ছবি: সংগৃহীত
বই রিকমেন্ড করে আসিফ আদনানের পোস্ট। ছবি: সংগৃহীত

২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাবাজার থেকে আর-রিহাবের প্রকাশক ও মালিক হাবিবুর রহমান ওরফে শামীমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের এন্টি টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ)। পরে পুলিশ জানায়, হাবিবুর রহমান আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। তিনি মুফতি জসিমউদ্দিন রাহমানীর মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে উগ্রবাদ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বই প্রকাশ ও বিক্রি করেন। হাবিবের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের মোহনপুর। ২০১৬ সালে প্রকাশনা সংস্থাটি চালু করেন তিনি।

নির্দিষ্ট বই ও লেখকের নাম ধরে জানতে চাইলে আর-রিহাবের প্রকাশক হাবিবুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘এগুলো আর রিহাব প্রকাশ করেনি। বিক্রিও করছে না।’ আর-রিহাবের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে বইগুলোর প্রচারণামূলক পোস্ট দেখানে তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘এগুলো কি এখন প্রচার করা হচ্ছে? গত মেলার আগে করা হয়েছিল। এখন আর বইগুলোর প্রচারও হয় না, রাখাও হয় না। প্রশাসনিক ঝামেলা হচ্ছে, এজন্য যে বইগুলো বিক্রি করতাম সেগুলো বাদ দিয়া দিছি।’

ছদ্মনামে লেখা কয়েকটি বইয়ের লেখক-অনুবাদক সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘উনাদের আসল নাম জানি না। উনাদের ফোন নম্বরও নাই। উনারা ফেসবুকে বই দিয়েছেন, আমি প্রকাশ করেছি। তারাই টাকা দিয়েছেন।’

সেলিব্রিটি লিডাররা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করেন। উঠতি তরুণেরা এসব নেতাদের বক্তব্যকে ধর্মের ‘অকাট্য বাণী’ হিসেবে গ্রহণ করেন। এই মানসিকতার কারণে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
লেখক সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর

২০১৯ সালে শুরু শব্দতরু প্রকাশনী। এখন পর্যন্ত তাদের ২৫টি বই রকমারি ডটকমে নিবন্ধিত। শব্দতরু শাইখ খালিদের চারটি বই প্রকাশ করেছে। যদিও রকমারিতে খালিদের ১৩টি অনূদিত এবং চারটি প্যাকেজ (একাধিক বইয়ের বান্ডেল) মিলছে। সৌদি নাগরিক খালিদের অপরাধতত্ত্বে পড়াশোনা যুক্তরাষ্ট্রে। ২০০৫ সালে ধর্মীয় উসকানির অভিযোগে সৌদি সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এরপর সন্ত্রাসী অর্থায়নের অভিযোগে খালিদকে ৪০ বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত, যেটি তিনি এখনো ভোগ করছেন।

মিসরের নাগরিক আল কায়েদা নেতা শাইখ আবু হামজাহর বই প্রকাশ করেছে শব্দতরু। সালিম আব্দুল্লাহর অনুবাদে বইটিতে ধর্মীয় ব্যাখ্যার ফাঁকে ফাঁকে নিজের আফগান যুদ্ধের স্মৃতি ও মতাদর্শ প্রচার করেছেন আবু হামজা। বইটির অনলাইন পরিবেশক রুহামাশপ, ওয়াফিলাইফ ও রকমারি।

আবু হামজাহ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পড়াশোনা করে ১৯৭৯ সালে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তাঁকে ২০১৫ সালে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে নিউইয়র্কের আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর আগে ২০০৪ সালে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ২০০৬ সালে প্রথম যুক্তরাজ্যের আদালতে সাত বছরের কারাদণ্ড পান। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে ২০১২ সালে আবু হামজাহকে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয় ব্রিটেন। ওসামা বিন লাদেনের গুরু আবদুল্লাহ আযযামের সঙ্গে ১৯৮৭ সালে আবু হামজাহর দেখা হয়। এরপর তিনি জিহাদের উদ্দেশ্যে আফগানিস্তান যান।

খালিদ ও আবু হামজাহর মতো দণ্ডিত নেতাদের বই অনুবাদ, প্রকাশ ও বিপণনের বিষয়ে শব্দতরুর মালিক হাসান জামিলকে একাধিক দিন কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

শাইখ আহমাদ মুসা জিবরিল ও শাইখ আসিম আল বারকাওয়ীর বই বাজারে এনেছে ইলমওয়েব। এর মধ্যে ফিলিস্তিনের নাবলুসে জন্ম আসিমের। তাঁকে আল-কায়েদা ইন ইরাকের (একিউআই) প্রতিষ্ঠাতা আবু মুসাব আল-জারকাভির আধ্যাত্মিক গুরু বলা হয়। আল-কায়েদার এই শাখা থেকেই ২০১৩ সালে ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড সিরিয়ার (আইসিস) যাত্রা। ২০০৫ সালে আম্মানের হোটেলে বোমা বিস্ফোরণে ৫৭ বেসামরিক নিহতের ঘটনায় আল-জারকাভিকে ত্যাগ করে আসিম আইসিসকে ‘বিপথগামী সংগঠন’ আখ্যা দেন। আসিমের আলোচিত দুই গ্রন্থ– ‘মিল্লাতে ইব্রাহিম’ ও ‘আমাদের আকিদাহ’। বাংলায় অনূদিত প্রথম বইটি আত্-তিবয়ান এবং দ্বিতীয়টি প্রকাশ করেছে ইলমওয়েব।

রকমারিতে আহমদ মুসা জিবরিলের ২৭টি বই ও প্যাকেজ পাওয়া যাচ্ছে, যে সংখ্যা ওয়াফিলাইফে ৩৪। এসব বইয়ের অধিকাংশের প্রকাশক সন্দীপন ও সমকালীন। ইলমওয়েব প্রকাশ করেছে চারটি। জিবরিলের অন্যান্য বই এনেছে ইলহাম, সীরাত, পেনফিল্ড, ইলমহাউস, সত্যায়ন, হাসানাহ, পথিক, ইহসান, চেতনা, সাবিল ও উদ্দীপন প্রকাশন।

যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা হলেও জিবরিল দেশটিকে ইসলামের অস্তিত্বের প্রধান শত্রু জ্ঞান করেন। যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়েছে, প্রাচীন ধারার সালাফি শিক্ষা, আইন বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ এবং নিজের অনলাইন সক্রিয়তার মাধ্যমে জিবরিল বর্তমান সময়ের ‘অন্যতম প্রভাবশালী উগ্রপন্থী সালাফি বক্তা’ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জিবরিল সশস্ত্র জিহাদকে ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবে স্বাভাবিকিকরণ করছেন। ‘আধুনিক উগ্রপন্থাকেও ন্যায়সঙ্গত’ করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়; মানুষের স্বাধীন জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত করে; সমাজে নৈরাজ্য তৈরি হয়– এমন যেকোনো বইয়ের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। তারা সেটি না করলে সক্রিয় নাগরিকদের উচিত সামাজিকভাবে এসব তুলে ধরা।
মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন

মেলায় খান প্রকাশনীর স্টলে পাওয়া যায় প্রকৌশলী আনোয়ার আল-আওলাকির ‘পরকালের পথে যাত্রা’, ‘আল্লাহ আমাদের বিজয়ের জন্য প্রস্তুত করছেন’, ‘মনস্তাত্বিক লড়াই’সহ কয়েকটি বই। ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত মার্কিন এই নাগরিককে আল-কায়েদা ইন অ্যারাবিয়ান পেনিনসুলার (একিউএপি) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নেতা বলা হতো। ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার কিছুদিন পরে ইয়েমেনে মার্কিন ড্রোন হামলায় আনোয়ার আল-আওলাকি মারা যান।

খান প্রকাশনীর মালিক মাওলানা ইসহাক খানের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের জানুয়ারি ও জুলাইয়ে নারায়ণগঞ্জ এবং মানিকগঞ্জের সিংগাইরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে পৃথক মামলা হয়। পরে ১০ জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৩। ২০২১ সালে মুক্তি পান ইসহাক।

গ্রেপ্তারের পরে র‍্যাব জানিয়েছিল, আনসার আল ইসলামের ‘আধ্যাত্মিক নেতা’ মুহাম্মদ জসীমুদ্দীন রাহমানীর ছাত্র ইসহাক। তাঁর ভাই আশরাফ খানও আনসার আল ইসলামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। আরেক ভাই কারাবন্দি রাকিব হিযবুত তাহরীরের সদস্য। ‘খান প্রকাশনী’ ও ‘মাকবুল প্রকাশনী’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান থেকে এই ধারার বিভিন্ন বই প্রকাশ করে মাদ্রাসায় সরবরাহ করতেন ইসহাক।

আল-কায়েদা নেতা আওলাকির বই নিজে অনুবাদ, প্রকাশ ও বিপণনের বিষয়ে খান প্রকাশনীর মালিক ইসহাক খান লিখিত উত্তরে জানান, আনওয়ার আওলাকি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় কোনো গ্রুপের প্রকাশ্য সদস্য ছিলেন না। সেই সময়ে তাঁর আলোচনার অনুবাদ কোনো সংগঠনের নামে ট্যাগিং করা অপবাদ।

তিনি আল-কায়েদার কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন কিনা জানতে চাইলে লিখেন, ‘বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে আমি ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক দাওয়াহকেই নিজের জন্য বেছে নিয়েছি। কোনো সশস্ত্র কাজে জড়িত নই। আপনার উল্লেখিত নামের কোনো সংগঠন সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। তাই তাদেরকে সমর্থন বা অসমর্থনের প্রশ্নই অবান্তর।’

অনলাইন ও ই-বুকে বিপণন

মেলা ছাড়াও আল-কায়েদার শীর্ষ নেতাদের বই বাতিঘর, রকমারি ডটকম, ওয়াফিলাইফ ডটকম, কিতাবঘর ডটকম, রুহামাশপ ডটকম, হালালপণ্য ডটকম, নাফিউন ডটকম, খিদমাহশপ, মামুন বুকস এবং ই-বুক স্টোরে পাওয়া যাচ্ছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের ফেসবুক পেজে বিজ্ঞাপন দিয়ে বিক্রিতে এগিয়ে ওয়াফিলাইফ ও রকমারি। এর মধ্যে রকমারি তাদের ওয়েবসাইটে আল-কায়েদা নেতাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসার পরিচিতি তুলে ধরেছে।

২০১২ সালে পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন আল-কায়েদার দ্বিতীয় প্রজন্মের শীর্ষস্থানীয় নেতা খালিদ আল হুসাইনান ওরফে আবু জায়েদ আল-কুয়েতি। ৪৬ বছরের এই নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরির স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথা ছিল। রকমারি তাঁর বাংলা ও ইংরিজে মিলে আটটি বই এবং একটি প্যাকেজ বিক্রি করছে।

রকমারিতে খালিদ আল হুসাইনানের বইয়ের তালিকা
রকমারিতে খালিদ আল হুসাইনানের বইয়ের তালিকা

আল-কায়েদার এই নেতার পরিচয় তুলে ধরে রকমারি লিখেছে, খালিদ আল হুসাইনান ‘জীবনের সোনালি সময়গুলো ব্যয় করেন কুয়েতের ‘সাআদ আব্দুল্লাহ সামরিক একাডেমির’ সরকারি মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে। দাওয়াত ও জিহাদের হৃদয়ছোঁয়া বয়ানে রীতিমতো ঝড় তুলতেন কুয়েতের ইসলামপ্রিয় নিরাপত্তা বাহিনীর দেহমনে।

আল-কায়েদার নিজস্ব মিডিয়ার মতোই দাওয়াতি এবং জিহাদি জীবন তুলে ধরে রকমারি তাঁর বিষয়ে আরও লিখেছে, খালিদ খোরাসানে হিজরত করেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আল্লাহর পথে জীবনবাজি রেখে দাওয়াত ও জিহাদের কাজ করে যান। ২০১২ সালে তিনি জীবনের অন্তিম অভিলাষ– শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেন।... মহান আল্লাহ লেখকের দ্বীনি সব খেদমতকে কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের উঁচু মর্যাদা দান করুন। আমীন।

আল-কায়েদার এই নেতার ছয়টি বই প্রকাশ করেছে রুহামা। অন্য আরেক বইয়ের প্রকাশক সবুজপত্র। রুহামা প্রকাশিত এই আল-কায়েদা নেতার পাঁচটি বই বিক্রি করছে বাতিরঘর। গত ১৫ সেপ্টেম্বর বাংলামোটরে বাতিঘরে খালিদের বইগুলো পাওয়া যায়। বইগুলো অনলাইনেও বিক্রি করছে তারা।

জানতে চাইলে বাতিঘরের মালিক দীপঙ্কর দাস স্ট্রিমকে বলেন, ‘বাতিঘর জেনারেল স্টোর। এখানে সব ধরনের বই পাওয়া যায়। ক্রেতারা যে ধরনের বইয়ের ব্যাপারে আগ্রহ দেখান, আমরা সেগুলো এখানে রাখি। বইয়ের কন্টেন্ট দেখে বিক্রি করাটা আমাদের জন্য কঠিন। কিন্তু কোনো বইয়ের কন্টেন্ট কাউকে আহত করছে– এমন জানতে পারলে আমরা বিক্রি করি না।’

আল-কায়েদার নিহত শীর্ষ নেতার লেখা বই সম্পর্কে জানা ছিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই কোনো দেশবিরোধী বা উগ্রপন্থার পক্ষে যায়– এমন কিছু প্রমোট করতে চাই না। তবে এই ধরনের বইয়ের ব্যাপারে সরকারের সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।’

উগ্রবাদ সমস্যাকে এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো সরকারই ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। সবার আগে এটিকে সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতে হবে। উগ্রবাদ মোকাবিলায় সরকারের একটি স্থায়ী কাঠামো থাকাও দরকার।
ঢাবি অধ্যাপক শাফী মো. মোস্তফা

রকমারি ডটকমের হেড অব ব্র্যান্ড (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) মাহমুদুল হাসান সাদি স্ট্রিমকে বলেন, ‘ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান হিসেবে রকমারির কাজ হচ্ছে বই বিপণন করা। কোন বই বিক্রি করব, কোনটি নয়, তার কোনো স্পষ্ট সরকারি নীতিমালা আমাদের কাছে নেই। ফলে এই বিষয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। নীতিমালা না থাকায় বিভিন্ন সময় বই নিয়ে আমাদের বিতর্কের মুখে পড়তে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আল-কায়েদা নেতাদের বই প্রকাশ করেছেন কোনো না কোনো প্রকাশক। রকমারির ওয়েবসাইটে বই নিবন্ধনের অথরিটি প্রকাশকদের দেওয়া আছে। প্যানেল থেকে তারা বই নিবন্ধন করেন। বই ও লেখকের পরিচিতি এবং বর্ণনাও তারাই দেন। প্রতি বছর ১০ হাজারের বেশি বই প্রকাশ হচ্ছে। আমাদের পক্ষে ম্যানুয়ালি এসব বইয়ের কন্টেন্ট যাচাই করা অসম্ভব। তবে কোনো বই নিয়ে অভিযোগ এলে আমরা ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।’

রকমারির এই কর্মকর্তার মতে, কোন বই প্রকাশ হবে না হবে তা প্রকাশকদেরই ঠিক করে দেওয়া উচিৎ। তাঁর দাবি, আল-কায়েদা নেতাদের বই বিপণনে রকমারির কোনো দায় নেই।

ওয়াফিলাইফের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রুবায়েত আসিরুল বারী স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা রকমারির মতো বইয়ের বিজনেস করি। পাবলিশারদের প্যানেল থেকে বইগুলোর বিবরণ উঠানো হয়। এই প্রকাশকদের বাংলাবাজারে দোকান আছে, অফিস আছে।’

বইয়ের বাজারে ক্ষতি

বাংলাবাজারের ইসলামি ধারার কয়েকটি প্রকাশনী থেকে প্রায় অর্ধশত বই প্রকাশ হয়েছে লেখক সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীরের। তিনি জানান, ইসলামি ধারার বইয়ের প্রধান পাঠক তরুণেরা। এই বয়স আবেগ ও ফ্যান্টাসির। এই কারণে খুব সহজে তারা উগ্রবাদী বইয়ের সঙ্গে পরিচিত হয় এবং তাদের ভেতরে ‘স্ট্রিক্ট আইডিয়োলজি’ তৈরি হয়। তাঁরা নিজেদের মতাদর্শের ছাড়া অন্য কারও বই গ্রাহ্য করে না। বিশেষ করে সাহিত্যধর্মী ইসলামি কন্টেন্টকে এসব তরুণেরা ‘ইসলামের’ জন্য ক্ষতি জ্ঞান করে।

সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীরের মতে, সেলিব্রিটি লিডাররা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করেন। উঠতি তরুণেরা এসব নেতাদের বক্তব্যকে ধর্মের ‘অকাট্য বাণী’ হিসেবে গ্রহণ করেন। এই মানসিকতার কারণে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সৃজনশীল সাহিত্য ছাড়া বৃহৎ বইয়ের বাজার টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একই বই ভিন্ন প্রচ্ছদ ও প্রকাশনী থেকে বের করে বাজার টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। উগ্রবাদী নেতারা আগেই সৃজনশীল লেখা এবং লেখকদের ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দিয়েছেন। সৃজনশীল লেখকেরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় বাংলাবাজারের বইয়ের বাজারও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।

উগ্রবাদ মোকাবিলায় স্থায়ী কাঠামোর তাগিদ

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন স্ট্রিমকে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়; মানুষের স্বাধীন জীবনযাপন বাধাগ্রস্ত করে; সমাজে নৈরাজ্য তৈরি হয়– এমন যেকোনো বইয়ের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু তারা সেটি না করলে সক্রিয় নাগরিকদের উচিত সামাজিকভাবে এসব তুলে ধরা।

উগ্রপন্থা নিয়ে শাফী মো. মোস্তফা বলেন, ‘আমি সবার আগে দায় দেব সরকারের।’ তাঁর মতে, উগ্রবাদ ‘ডিল’ করার জন্য সরকারের একটি নীতি থাকা উচিত, যা এখনো দেখা যাচ্ছে না।

শাফী মোস্তফা বলেন, উগ্রবাদ সমস্যাকে এখন পর্যন্ত আমাদের কোনো সরকারই ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। সবার আগে এটিকে সমস্যা হিসেবে স্বীকার করতে হবে। খেয়াল করলে দেখি, সরকারের একপক্ষ এখনো অস্বীকারের মধ্যে আছে; আরেকপক্ষ আবার স্বীকার করছে। তবে উগ্রবাদ মোকাবিলায় সরকারের একটি স্থায়ী কাঠামো থাকা দরকার।

তিনি আরও বলেন, উগ্রবাদকে সঠিকভাবে ডিল করতে শুধু ‘দরবারি’ আলেমদের যুক্ত না করে, সর্বজন শ্রদ্ধেয় বা বিভিন্ন ঘরানার মানুষের সমন্বয়ে একটি বোর্ড গঠন করা যেতে পারে। বোর্ডের অধীনে একটি কমিটি থাকবে, যারা এই কর্মসূচির অগ্রদূত হবে।

জাতীয়তাবাদী ওলামা দলের সাবেক সদস্যসচিব ও বর্তমান নির্বাহী কমিটির ১ নম্বর সদস্য প্রিন্সিপাল নজরুল ইসলাম তালুকদার বলেন, এই ধরনের বই প্রকাশ্যে বিক্রি হওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। এসব বই সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতির ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাও নষ্ট করতে পারে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত