এক্সপ্লেইনার/অপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য ‘প্যারেন্টিং’ কতটা দায়ী

প্রকাশ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮: ০৭
স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

কুমিল্লার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে। ‘১৩ বছরের একটা ছেলে তার চেয়ে বয়সে বড়দের সঙ্গে কীভাবে ঘুরে বেড়াত?’ ‘তার বাবা-মা কি খেয়াল করেননি?’ আর এসব প্রশ্ন থেকেই শুরু হয়েছে প্যারেন্টিং নিয়ে তুমুল বিতর্ক।

ঘটনার সূত্রপাত গত শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর)। মায়ের আইফোন হাতে নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বাসা থেকে বেরিয়েছিল অপ্রতিম। সে আর ফেরেনি। প্রায় ২১ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তানের এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তুহিন, আনাস ও ফাহিম নামে তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। জানা গেছে, তাদের বয়স ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। তদন্ত চলছে।

এরইমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে নানা প্রশ্ন। অপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? ‘প্যারেন্টিং’ নাকি ‘অপ্রতিম কাদের সঙ্গে মিশেছে’?

সুইডেনে ৭০৩ জন ১৪ বছর বয়সী কিশোর ও তাদের বাবা-মাকে নিয়ে গবেষণা করেন হাকান স্ট্যাটিন ও মার্গারেট কের। ‘প্যারেন্টাল মনিটরিং: আ রিইন্টারপ্রিটেশন’ শীর্ষক গবেষণায তাঁরা দেখেন, সন্তানের খবর বাবা-মা মূলত জানতে পারেন সন্তান নিজে থেকে বললে। নজরদারির মাধ্যমে জানা যায় তুলনায় কম। তাঁদের মতে, শুধু ট্র্যাকিং আর নজরদারিই বাবা-মায়ের জন্য পজিটিভ কোনো পথ নয়।

ওই একই গবেষণায় দেখা যায়, শৈশবে সামাজিক টানের কেন্দ্রে থাকেন মা-বাবা। কৈশোরের শুরুতে সেই টান সরে যায় বন্ধুদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া আর দলে মিশে যাওয়ার দিকে। অর্থাৎ বন্ধুদের প্রতি এই টান তাঁদের বিকাশেরই একটি ধাপ।

এ বিষয়ে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সায়মা আক্তার বলেছেন, ‘যেকোনো স্বাভাবিক শিশুর এই বয়সে যা করা উচিৎ, অপ্রতীম সেটাই করছিল। ১৩-১৪ বছর বয়সটি হলো শিশুর আইডেন্টিটি ডেভেলপমেন্ট বা নিজস্ব পরিচয় তৈরির সময়। এই বয়সে তারা কার সঙ্গে মিশলে একটু পাওয়ারফুল হবে বা বন্ধুদের কাছে গুরুত্ব পাবে, সেই ধরনের কাজ করতে চায়। অপ্রতিম হয়তো এমন একটা শো-অফের লুপে ঢুকে গিয়েছিল, যেখানে সে ভাবতো এসব না করলে সে সোশ্যালি ইনক্লুসিভ হতে পারবে না। সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতে না পেরে বড়দের সঙ্গে মিশে সে হয়তো কিছুটা এক্সট্রা গুরুত্ব বা খাতির পাচ্ছিল, যা তাকে এই পাওয়ারফুল কমিউনিটির দিকে টেনে নিয়েছে।’

প্যারেন্টিং এর ব্যাপারে জানতে চাইলে স্ট্রিমকে সায়মা আক্তার বলেন, ‘১৩-১৪ বছর বয়সের একটা কিশোরকে ঘরে আটকে রাখলে তার সেলফ-ইস্টিম বা আত্মবিশ্বাস কমে যাবে। তাই এই বয়সের কিশোরকে ঘরে আটকে রাখার কিছু নেই। তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এক্টিভিটি বা কাদের সঙ্গে ঘুরছে, সেই জায়গায় কিছু মনিটরিংয়ের দরকার ছিল। প্যারেন্টিংয়ের সবচেয়ে বড় দিক হলো, শিশুদের সঙ্গে এমন একটা সম্পর্ক রাখা, যেন সে কিছু ভুল করলেও মা বাবাকে জানাতে পারে। সন্তান যখন তার ভুল স্বীকার করে, তখন মা বাবা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে সে ভবিষ্যতে মা বাবার কাছে লুকাবে নাকি শেয়ার করবে।’

তবে অপ্রতিমের বড়দের সঙ্গে মেশার ব্যাপারে সায়মা আক্তার বলেছেন, ‘তার বয়সের বা তার ক্লাসের কিশোরদের সঙ্গে সে মিশতে পারত কি না, সে ব্যাপারে প্রশ্নের অবকাশ থেকেই যায়।’

জার্মান-আমেরিকান চাইল্ড স্পেশালিস্ট ও মনোবিজ্ঞানী এরিক এরিকসন তত্ব অনুযায়ী, ১২ থেকে ১৮ বছর বয়স হলো নিজস্ব পরিচয় খোঁজার সময়। এই বয়সে একজন কিশোর নিজেকে চেনার চেষ্টা করে বন্ধুদের মাধ্যমে, কমিউনিটির মাধ্যমে। তাই এই বয়সে বন্ধুদের প্রতি টান স্বাভাবিক। প্রশ্ন হলো, সেই টানের সময় মা বাবা কতটা কাছাকাছি আছেন।’

এ ব্যাপারে আরও একজন মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে স্ট্রিম। তিনি শিক্ষক ও সাংবাদিক নাজিয়া আফরিন। নাজিয়া বলেন, ‘মানুষের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সমাজের, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার। শুধু মা বাবার নয়। মা বাবার দোষ দিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ তার দায় এড়াতে পারে না।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত