মুড়ি যেভাবে হয়ে উঠল বাঙালির চিরচেনা খাবার

এক বাটি মুড়ি, সামান্য সরিষার তেল, সঙ্গে চানাচুর আর কাঁচামরিচ। আয়োজন সামান্য , কিন্তু স্বাদ? অতুলনীয়।
হঠাৎ খিদে পেলে কিংবা আড্ডার মাঝে এক মুঠো মুড়ি মুখে পুরে নেওয়া আমাদের চিরকালের অভ্যাস। কখনো পথের নাস্তা, কখনো কৃষকের খাবার, আবার কখনো উৎসবের আয়োজনে বাঙালির পাতে জায়গা পেয়েছে মুড়ি। এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পড়তে এই সাধারণ খাবার পেয়েছে নানা নাম, নানা স্বাদ, নানা ব্যবহার। আর বাংলায় এসে মুড়ি যেন পেয়েছে তার সবচেয়ে আপন ঠিকানা। কীভাবে সেই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মুড়ি হয়ে উঠল বাঙালির প্রতিদিনের খাবার? সেই গল্পের শুরু আসলে ধান চাষ ও ধানভিত্তিক খাদ্যসংস্কৃতির বিকাশের সঙ্গে।
ধান থেকে মুড়ি, শুরুটা যেভাবে
মুড়ির ইতিহাস খুঁজতে হলে আগে ধানের ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। বাংলায় ধান চাষের ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের। কৃষির বিস্তারের সঙ্গে মানুষ ধানকে শুধু ভাত হিসেবে নয়, নানা উপায়ে সংরক্ষণ ও খাওয়ার কৌশলও তৈরি করেছে। তারই একটি হলো মুড়ি।
মুড়ির উৎপত্তি কোথায়, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বহুদিন ধরে ফোলা চাল বা মুড়িজাতীয় খাবারের প্রচলন ছিল বলে ধারণা করা হয়। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি অনুযায়ী, গরম বালি বা অন্য উত্তপ্ত মাধ্যমে চাল গরম করে ফুলিয়ে নেওয়া হতো। তীব্র তাপে চালের ভেতরের পানি বাষ্পে পরিণত হয়। সেই বাষ্পের চাপে চালের দানা ফুলে ওঠে। শক্ত চাল তখন হয়ে যায় হালকা ও ফাঁপা। আজ মুড়ি তৈরির পদ্ধতিতে অনেক পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু চালকে তাপে ফুলিয়ে তোলার মূল কৌশলটি এখনো একই রয়ে গেছে।
বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ ধান চাষের পুরোনো অঞ্চলগুলোতে এর প্রাচীন রূপ ছিল বলে নানা মত আছে। মুড়ির মতো শস্যজাত খাবার বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতেই দেখা যায়। পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন ধানভিত্তিক সমাজেও ফোলা চালের নানা রূপের প্রচলন দেখা যায়।
ধান থেকে মুড়ি, পথটা কত পুরোনো
ভারতীয় খাদ্য-ইতিহাসের কিছু গবেষণায় প্রাচীন ভারতীয় সাহিত্যে এমন ‘ফোলা’ শস্যজাত খাবারের উল্লেখের কথা বলা হয়েছে। আবার কিছু লেখায় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ থেকে ৩০০ সালের মধ্যে ভারতীয় উপমহাদেশে এমন ধরণের খাবার ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। ‘মিসিতা’ বা ‘ধানিধাকা’ নামের সঙ্গে এর সম্পর্কও টানা হয়েছে। তবে এসব শব্দ আধুনিক ‘মুড়ি’কেই বোঝায় কি না, তা নিশ্চিত নয়।
প্রাচীন ভারতের কোথাও ধান তাপে ফুলিয়ে নেওয়া হতো, কোথাও চাল। কোথাও গরম বালি ব্যবহার করা হতো, কোথাও লবণ। দক্ষিণ এশিয়ায় এই খাবার এখনো নানা নামে পরিচিত। বাংলায় মুড়ি, হিন্দি অঞ্চলে মুরমুরা বা মুরমুরে, ওড়িয়ায় মুড়ি বা মুড়ি/মুড়ি-জাতীয় উচ্চারণে ‘মুড়ি’ ও ‘মুড়ি’র পাশাপাশি ‘মুড়ি’ থেকে আলাদা ‘মুড়ি’ উচ্চারণও আছে। আবার ‘মুধি’, ‘মামরা’, ‘কুরমুরা’, ‘ম্যান্ডাক্কি’, ‘বোরুগুলু’, ‘মারামারালু’ এবং দক্ষিণ ভারতে ‘পোরি’ নামেও ফোলা চাল পরিচিত। নেপালে এর পরিচিত নাম ‘ভুজা’।
এই নামের বৈচিত্র্যই দেখায়, এটি কোনো এক অঞ্চলের খাবার নয়। ভারতীয় উপমহাদেশের নানা সমাজ নিজেদের ভাষা ও স্বাদের সঙ্গে মিলিয়ে এটিকে গ্রহণ করেছে। আর এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় মানুষের চলাচল ও বাণিজ্যিক এই ধরনের খাবার ছড়িয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছে বলে ধরে নেওয়া যায়।
বাংলার পুরোনো পদ্ধতিতে বড় হাঁড়ি বা কড়াইতে বালি গরম করা হতো। তারপর প্রস্তুত চাল সেই বালিতে দিয়ে দ্রুত নেড়ে দেওয়া হতো। কয়েক মুহূর্তেই চাল ফুলে উঠত। পরে চালুনি দিয়ে বালি আলাদা করা হতো। আজ শিল্পকারখানায় যন্ত্রে মুড়ি তৈরি হলেও দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিও টিকে আছে।
মুড়ির জন্য একসময় বিশেষ ধানের জাতও ব্যবহার করা হতো বলে ঐতিহাসিক মত রয়েছে। কিরণলেখা রায়ের জলখাবার গ্রন্থের উল্লেখ ধরে কিছু লেখায় ‘হিদে’, ‘কেকে’, ‘ভোজন-কর্পূর’, ‘মেটে-গড়োল’, ‘ঢেঁকিশালি’, ‘হরিদাজাওন’ ও ‘পানেকি’ এমন কয়েকটি ধানের নাম পাওয়া যায়। এসব ধানের সবগুলোর ব্যবহার আজ আর সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে এই নামগুলো থেকে বোঝা যায়, মুড়ি তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের ধান বেছে নেওয়ার আলাদা ঐতিহ্য ছিল।
সাহিত্যে মুড়ি, গ্রামীণ জীবনে মুড়ি
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুড়ি রান্নাঘর থেকে ধীরে ধীরে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, বাংলার সাহিত্যেও মুড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়।
বাংলার প্রাচীন খাদ্যসংস্কৃতি নিয়ে গবেষণায় দেখা যায়, ভাতের পাশাপাশি মুড়ি, খই ও চিড়া ছিল মানুষের পরিচিত খাবার। একাদশ শতকের চর্যাপদে ধান ও আখের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে বাংলা সাহিত্যে সাধারণ মানুষের খাবার নিয়ে আরও বিস্তৃত বর্ণনা দেখা যায়।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে মুড়ির উপস্থিতি আরও স্পষ্ট। রূপরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল আনুমানিক ১৬৫০ সালের রচনা। তাঁর কাব্যে চিড়া-মুড়ি খাওয়ার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে ‘একদন্ডে দশবার চিড়ামুড়ি খায়’—এর মতো পঙ্ক্তি থেকে বোঝা যায়, মুড়ি তখন সাধারণ মানুষের পরিচিত খাবার ছিল। রূপরামের ধর্মমঙ্গল গ্রন্থেও এ ধরনের খাবার সম্পর্কে উল্লেখ আছে।
এরপর ১৭১১ সালের দিকে ঘনরাম চক্রবর্তীর ধর্মমঙ্গল বা অনাদি মঙ্গল-এও চিড়া-মুড়ির মতো খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায়। ঘনরামের কাব্যে সমকালীন মানুষের জীবন, বাজার ও খাবারের নানা চিত্র এসেছে।
বাংলা লোকসাহিত্যেও মুড়ির উপস্থিতি ছিল। ‘মুড়িবেচুনি’ শব্দের ব্যবহার থেকে বোঝা যায়, মুড়ি বিক্রি করাও ছিল পরিচিত পেশা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে ‘হুড়ুম’ নামে এক ধরনের ফোলা বা ভাজা শস্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত-এ ‘চিড়া হুড়ুম সন্দেশ’ কথাটিও পাওয়া যায়। এসব উল্লেখ থেকে বোঝা যায়, ফোলা চাল ও মুড়ির সঙ্গে লোকজ জীবনের সম্পর্কও বেশ গভীর।
আমাদের গ্রামবাংলায় মুড়ির ব্যবহার ছিল আরও সহজ। ভাত রান্নার প্রয়োজন নেই। শুকনো অবস্থায় অনেকদিন রাখা যায়। বহন করাও সহজ। তাই কৃষক মাঠে যাওয়ার সময়, নৌযাত্রায়, হাটে-বাজারে বা দীর্ঘ পথের যাত্রায় মুড়ি সঙ্গে নিতে পারতেন। দুধ, গুড়, কলা, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ কিংবা সরিষার তেলের সঙ্গে এটি খাওয়া হতো। প্রাক-আধুনিক বাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতেও মুড়ির সঙ্গে ঘি, পেঁয়াজ ও কাঁচামরিচ মেশানোর উল্লেখ পাওয়া যায়।
১৯৩৮ সালে বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায় ‘চিড়া, মুড়ি, খই ও বিস্কুট’ নামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি মুড়ি, চিড়া, খই ও বিস্কুটের পুষ্টিমান তুলনা করেছিলেন। অর্থাৎ তখনও মুড়ি শুধু সস্তা খাবার নয়, পুষ্টির দিক থেকেও আলোচনার বিষয় ছিল।
ব্রিটিশ আমলের রেলব্যবস্থা ‘ঝালমুড়ি’ বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল
সময়ের সঙ্গে মুড়ির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় স্বাদ। এভাবেই সাদামাটা মুড়ি হয়ে উঠেছে ঝালমুড়ি।
মুড়ি থেকে ঝালমুড়ি কবে আমাদের প্রিয় খাবার হয়ে উঠল তার সঠিক দিনতারিখ পাওয়া যায় না। তবে শহর, বাজার ও রেলপথের বিস্তারের সময় এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয় বলে ধারণা করা হয়। ঔপনিবেশিক আমলে রেলস্টেশন ও ব্যস্ত শহুরে এলাকায় এমন খাবারের চাহিদা বাড়ে। মুড়ি ছিল সস্তা, হালকা এবং কোনো থালা-বাসন ছাড়াই খাওয়া যায়। তাই ট্রেনের যাত্রী বা শ্রমজীবী মানুষের জন্য এটি আদর্শ নাস্তাজাতীয় খাবার হয়ে ওঠে। কিছু খাদ্যবিশেষজ্ঞের মতে, ব্রিটিশ আমলের রেলব্যবস্থা ঝালমুড়ির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
শুধু বাংলায় নয়, বাংলা ভূখণ্ডের বাইরেও মুড়ি নানা রূপে জনপ্রিয়। মুম্বাই ও পশ্চিম ভারতে মুরমুরা দিয়ে তৈরি হয় ভেলপুরি। অন্ধ্রপ্রদেশে আছে মুন্তা মসালা। মহারাষ্ট্রের কোলহাপুরে বিখ্যাত ‘ভাদাং মুরমুরা’। ওড়িশায় পাওয়া যায় মুড়ি মসলা। ময়ূরভঞ্জে আবার ‘মুড়ি মাংস’ নামে এক ধরনের খাবার পাওয়া যায়, যেখানে মাংসের ঝোলের সঙ্গে মুড়ি মেশানো হয়।
অবশ্য বাংলায় মুড়ি পেয়েছে সবচেয়ে আপন রূপ। দুধ-মুড়ি, গুড়-মুড়ি, মুড়ির মোয়া থেকে ঝালমুড়ি, সবকিছু মিলিয়ে মুড়ি আমাদের জীবনযাপনের সঙ্গে মিশে গেছে।
.png)






-40e58c.jpeg)

