জাপানিরা যেভাবে অপচয় কমিয়ে সঞ্চয় করে
সঞ্চয় মানেই শুধু ব্যাংকে টাকা জমা রাখা নয়। অপ্রয়োজনীয় কিছু না কেনা, পুরোনো জিনিস ফেলে না দিয়ে ব্যবহার করা, খাবারের অপচয় কমানো কিংবা ভাঙা জিনিস মেরামত করাও সঞ্চয়ের অংশ হতে পারে। জাপানি সংস্কৃতির ‘মোত্তাইনাই’ ভাবনায় আছে এমনই এক জীবনদর্শন। যেখানে কোনো কিছুর মূল্য বুঝে তাকে যতটা সম্ভব কাজে লাগানো হয়, আর ছোট ছোট সাশ্রয় থেকে তৈরি হয় বড় সঞ্চয়ের অভ্যাস।
স্ট্রিম ডেস্ক

সঞ্চয়ের কথা উঠলেই আমাদের মনে আসে ব্যাংকে টাকা রাখা, মাস শেষে কিছু টাকা আলাদা করে রাখা কিংবা ভবিষ্যতের জন্য টাকা জমানোর কথা। কিন্তু সঞ্চয়ের শুরুটা সব সময় টাকা জমিয়ে হয় না। অনেক সময় শুরু হয় টাকা খরচ না করার মধ্য দিয়ে।
অপ্রয়োজনীয় কিছু না কেনা, হাতের কাছে থাকা জিনিস আরও কিছুদিন ব্যবহার করা, খাবার নষ্ট না করার মতো অভ্যাসও ধীরে ধীরে খরচ কমায়। জাপানি সংস্কৃতিতে এমন একটি শব্দ আছে, যার সঙ্গে এই ভাবনার বেশ মিল। এই জীবনদর্শনের নাম ‘মোত্তাইনাই’।
বাংলায় মোত্তাইনাইয়ের সরাসরি কোনো প্রতিশব্দ নেই। সহজ করে বললে, কোনো জিনিসের মূল্য বা ব্যবহারযোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সেটি নষ্ট বা ফেলে দেওয়া নিয়ে যে আফসোস বা আক্ষেপ তৈরি হয়, মোত্তাইনাই মূলত সেই অনুভূতিকে বোঝায়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোনো জিনিসের মূল্য, তার পেছনের শ্রম এবং সেটিকে আরও কাজে লাগানোর সুযোগকে গুরুত্ব দেওয়ার ভাবনাও।
-2376d5.jpeg)
মোত্তাইনাইকে শুধু ‘অপচয় করবেন না’ বলা যায় না। এটি কোনো জিনিসের মূল্য বুঝে তাকে যতটা সম্ভব কাজে লাগানোর মানসিকতা। অপচয় কমানোর এই মানসিকতা মিতব্যয়িতা ও সঞ্চয়ের অভ্যাস তৈরি করতে পারে।
সংকট থেকে অভ্যাস, অভ্যাস থেকে সংস্কৃতি
জাপানি সমাজে এই মানসিকতা একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। এর শিকড় দেশটির সংস্কৃতিতে আগে থেকে থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের সংকট এই অভ্যাসকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপান ভয়াবহ সংকটের মধ্য দিয়ে যায়। খাবার, পোশাক, কাঁচামাল ও অর্থ—সবকিছুরই অভাব ছিল। ফলে হাতে থাকা জিনিস যতদিন সম্ভব ব্যবহার করা ছিল প্রয়োজন।
-c2d862.jpeg)
পুরোনো কাপড় ফেলে না দিয়ে সেলাই করে আবার পরা হতো। ভাঙা জিনিস মেরামত করা হতো। খাবারের অপচয় এড়িয়ে চলা ছিল স্বাভাবিক অভ্যাস। সময়ের সঙ্গে প্রয়োজনের এই অভ্যাস অনেকটাই সাংস্কৃতিক মূল্যবোধে পরিণত হয়।
জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘কিনৎসুগি’ শিল্পে এই ভাবনার সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কোনো মাটির পাত্র ভেঙে গেলে সেটি ফেলে দেওয়া হয় না। বিশেষ পদ্ধতিতে ভাঙা অংশ জোড়া লাগানো হয়। অনেক সময় সেই জোড়া লাগার দাগও লুকানো হয় না। বরং সেটিকেই পাত্রটির ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখা হয়। ভাবনাটা সহজ, ভেঙে গেছে মানেই শেষ হয়ে গেছে, এমন নয়।
-9d787f.jpeg)
আজ জাপান বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ। তারপরও অপচয় না করার এই অভ্যাস পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। পুরোনো জিনিসও মেরামত করে ব্যবহার করার চলও দেখা যায়। এই মানসিকতার আন্তর্জাতিক পরিচিতিও তৈরি হয়েছে। কেনিয়ার নোবেলজয়ী পরিবেশকর্মী ওয়াঙ্গারি মাথাই ‘মোত্তাইনাই’ শব্দটি পরিবেশ আন্দোলনের আলোচনায় নিয়ে আসেন। তাঁর কাছে মোত্তাইনাইয়ের গুরুত্ব ছিল সম্পদের প্রতি শ্রদ্ধা ও অপচয় কমানোর মানসিকতায়।
‘ফুরোশিকি’র জাদু
মোত্তাইনাইয়ের ভাবনাটি বোঝার ভালো উদাহরণ হলো জাপানের ‘ফুরোশিকি’। এটি একটি চারকোনা কাপড়। দেখতে সাধারণ হলেও এর ব্যবহার অনেক। এডো যুগে গণগোসলখানায় যাওয়ার সময় মানুষ কাপড়ে নিজেদের পোশাক বেঁধে নিয়ে যেত। পরে একই কাপড় দিয়ে জিনিসপত্র বহনের চল শুরু হয়। ধীরে ধীরে ফুরোশিকি হয়ে ওঠে জাপানি জীবনের পরিচিত অংশ।
ফুরোশিকি দিয়ে বই মোড়ানো যায়, বোতল বহন করা যায়, উপহার প্যাক করা যায়। তরমুজের মতো গোল ও ভারী জিনিসও এতে বহন করা সম্ভব। কাপড়টি কীভাবে ভাঁজ করা হচ্ছে আর কোথায় গিঁট দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর বদলে যায় এর ব্যবহার।

একবার ব্যবহার করে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের ব্যাগের বদলে একই কাপড় বারবার ব্যবহার করা যায়। ফলে নতুন ব্যাগ কেনার প্রয়োজন কমে। একটি জিনিসকে একাধিক কাজে ব্যবহার করার এই অভ্যাসই মোত্তাইনাইয়ের ভাবনার সঙ্গে মেলে।
প্লাস্টিকের ব্যাগ সহজলভ্য হওয়ার পর ফুরোশিকির ব্যবহার কমে গিয়েছিল। কিন্তু প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে সচেতনতা বাড়ার পর জাপানে আবার এর ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। ২০০৬ সালে জাপানের তৎকালীন পরিবেশমন্ত্রী নিজেও ফুরোশিকি ব্যবহার করে এর প্রচার করেন।
মিনিমালিজম’-এর সম্পর্ক
মোত্তাইনাইয়ের আরেকটি দিক হলো অপ্রয়োজনীয় জিনিস না কেনা। জাপানি জীবনযাপনের সঙ্গে ‘মিনিমালিজম’-এর যে সম্পর্কের কথা বলা হয়, তার সঙ্গেও এই ভাবনার মিল রয়েছে।
জাপানি ঘরে অনেক সময় প্রয়োজনের অতিরিক্ত আসবাব দেখা যায় না। একই জিনিস একাধিক কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন ‘ফুতন’ বিছানা রাতে পেতে ঘুমানো হয়, আবার সকালে সেটি গুটিয়ে আলমারিতে তুলে রাখা যায়। ফলে একই জায়গা দিনের বেলা অন্য কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। এতে জায়গা যেমন বাঁচে, তেমনি অতিরিক্ত আসবাব কেনার প্রয়োজনও কমে।
-edb0fc.jpeg)
খরচের হিসাব রাখার ক্ষেত্রে জাপানের ‘কাকেইবো’ পদ্ধতিও পরিচিত। এতে শুধু মাসে কত টাকা খরচ হলো, সেটি লেখা হয় না। খরচের কারণ ও প্রয়োজনীয়তা নিয়েও ভাবা হয়। কোনো জিনিস সত্যিই দরকার কি না, এখনই কিনতে হবে কি না, কিংবা ঘরে থাকা কোনো জিনিস দিয়েই কাজ চালানো যায় কি না—এসব প্রশ্ন করা হয়। শুনতে সাধারণ। কিন্তু নিয়মিত এই প্রশ্নগুলো করার অভ্যাস কেনাকাটার ধরন বদলে দিতে পারে।
তবে জাপানের গল্পে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপচয় কমানো ও প্রয়োজন বুঝে খরচ করার এই ধরনের অভ্যাস শুধু সংকটের সময়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সময়ের সঙ্গে এর কিছু অংশ দৈনন্দিন জীবন ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হওয়ার পরও জিনিসের মূল্য বোঝা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত না কেনা এবং যা আছে তা যতটা সম্ভব কাজে লাগানোর প্রবণতা জাপানি সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায়।
শেষ পর্যন্ত সঞ্চয়ও অনেক সময় এমন ছোট ছোট সিদ্ধান্তের ফল। নতুন কিছু কেনার আগে একবার ভাবা, পুরোনো জিনিসটি আরেকটু ব্যবহার করা কিংবা অপ্রয়োজনীয় খরচ এড়িয়ে চলা—প্রতিটি সিদ্ধান্তে সামান্য করে টাকা বাঁচতে পারে। আর সেই ছোট ছোট সাশ্রয়ই একসময় বড় হয়ে উঠতে পারে।
.png)








-7be686-256x144.webp)

