পাম্পে আজও দীর্ঘ সারি, জ্বালানির দামে মিশ্র প্রতিক্রিয়া

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ০৯
আজও পাম্প ছিল দীর্ঘ লাইন। স্ট্রিম ছবি

রাজধানীর পাম্পগুলোতে আজও গ্রহকদের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। কেউ দাঁড়িয়ে আছেন তিন ঘণ্টা ধরে, কেউ আবার পাঁচ ঘণ্টা। তেলের বর্ধিত নতুন দাম নিয়ে দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া।

রোববার (১৯ এপ্রিল) রাজধানীর কয়েকটি পাম্প ঘুরে এই চিত্র পাওয়া গেছে। পাম্পগুলোতে দেখা গেছে, দীর্ঘ সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন প্রাইভেটকার ও মোটর বাইকচালকেরা। তীব্র গরমে রোদ থেকে বাঁচতে অনেকে নিয়ে এসেছেন ছাতা।

গাড়ির চালক, যাত্রী ও সাধারণ মানুষ বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে সব কিছুর দাম বাড়ে। সবচে বিরূপ পরিস্থিতি তৈরি হবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।

শনিবার সরকারে নির্ধারিত দাম অনুযায়ী প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫, অকটেন ১২০ থেকে বাড়িয়ে ১৪০, পেট্রল ১১৬ থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ এবং কেরোসিন ১১২ বেড়ে হয়েছে ১৩০ টাকা। নতুন দাম রোববার থেকে কার্যকর হয়েছে। যার ফলে দেশের ইতিহাসে জ্বালানি তেলের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর আগে ২০২২ সালের আগস্টে অকটেনের দাম সর্বোচ্চ ১৩৫ ও পেট্রলের দাম ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।

রাজারবাগের রহমান ট্রেডার্স পাম্পে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করে তেল পেয়েছেন সোহেল রানা। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘সকাল সাতটায় লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখন প্রায় একটা বাজে। পুরোটা সময় রোদ আর তীব্র গরম সহ্য করতে হয়েছে। তবে, শেষমেষ তেল পেয়েছি এটাই আনন্দের বিষয়।’

মৎসভবনের রমনা পেট্রোল পাম্পে তিন ঘণ্টার বেশি দাঁড়িয়ে ছিলেন মোহাম্মদ মাহিম। তিনি বেসরকারী চাকরির পাশাপাশি রাইড শেয়ার করেন। মাহিম বলেন, ‘এখন তেল নিতে এলেই হাতে তিন চার ঘণ্টা সময় নিয়ে আসতে হয়। এরচে কম সময়ে তেল পাওয়া যায় না। এই ভোগান্তি আর কত দিন থাকবে, আল্লাহই জানেন।’

তেলের বাড়তি দামের কারণে সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন তিনি বলেন, ‘জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে অন্য সব কিছুর দাম বাড়ে। এবার তো এক লাফে সর্বোচ্চ ২০ টাকা বাড়ানো হলো। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ সব কিছুর দাম কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা কল্পনাও করতে পারছি না।’

মাহিম আরও বলেন, ‘আমার মতো যারা ছোট চাকরি করেন, এই বাড়তি দামের সবচে বড় প্রভাব পড়বে তাঁদের জীবনে। তেল কিনতে দিনের প্রায় অর্ধেক সময় চলে যাচ্ছে। এখন তেল কিনব কখন, ইনকাম হবে কি আর বাজারই বা কি করবো- এই দিশা পাওয়াই মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।’

বাসচালক ফজলুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘সরকার দাম বাড়ালে তো আমাদের কিছু করার থাকে না। বেশি দামে ডিজেল কিনতে হচ্ছে। এর ফলে তো বাস বাড়াও বাড়বে। তখন দেখা যাবে যাত্রীরা আমাদের সঙ্গে বিবাদ করছেন।’

এ দিকে পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হয়েছি বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। আজ সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি কার্যত যুদ্ধকালীন অবস্থার মতো, যেখানে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। সারা বিশ্ব তাদের তেলের দাম সমন্বয় করেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রও তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে দাম অপরিবর্তিত রেখেছিল।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘যুদ্ধ মানেই বিরূপ প্রভাব। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বই এর প্রভাবে আক্রান্ত। আমাদের দেশেও এর প্রভাব পড়বে—এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, চলতি এপ্রিল মাসে দেশে ডিজেলের চাহিদা প্রায় চার লাখ টন। এর বিপরীতে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার টন ডিজেলের মজুত আছে। এছাড়া চারটি জাহাজে আসা ১ লাখ টনের বেশি ডিজেরের মজুতও দ্রুত যুক্ত হবে। সেইসঙ্গে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য ৮০ হাজার টন ডিজেল মজুত রয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য বলছে, ১৭ এপ্রিল বিক্রির পর অকটেনের মজুত আছে ২৯ হাজার ৪৮৪ টন। বর্তমান সরবরাহ বিবেচনায় যা ২৫ দিনের মজুত। এর আগে ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছ একটি জাহাজ। এছাড়া বর্তমানে পেট্রলের মজুত আছে ১৮ হাজার ৮৩০ টন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের সরবরাহে প্রভাব পড়ে। বিশ্ববাজারে বেড়ে যায় জ্বালানি তেলের দাম। একপর্যায়ে অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। যুদ্ধ শুরুর আগে যা ছিল ৮০ ডলারের আশপাশে।

গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরান। এতে ব্যারেল প্রতি জ্বালানি তেলের দাম ৯০ ডলারের আশপাশে নেমে আসে। তবে আবার হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত