হোলি আর্টিজানে হামলার ১০ বছর

বাবাকে দেখেনি রায়না, গল্পেই খুঁজে ফেরা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০২৬, ১৫: ৪৮
হোলি আর্টিজান হামলায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল করিমের দুই সন্তান। ছবি: পরিবার

রাজধানীর গুলশানে হোলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন সহকারী কমিশনার (এসি) রবিউল করিম। তাঁর মৃত্যুর এক মাস পর জন্ম হয় মেয়ে কামরুন্নাহার রায়নার।

সেই শিশুর বয়স এখন প্রায় ১০ বছর। পড়ছে পঞ্চম শ্রেণিতে। রায়নার কাছে বাবা বলতে পরিবারের সদস্যদের মুখে শোনা গল্পই ভরসা। মা উম্মে সালমা, বড় ভাই সাজিদুল করিম সামি ও অন্যদের কাছে শুনে কল্পনাতেই খুঁজে ফেরে সে বাবাকে।

রবিউলের ছেলে সাজিদুল করিম সামি এখন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবার সঙ্গে কাটানো সময়গুলো তার ভালোই মনে আছে। তবে বাবার মতো শান্ত ও চাপা স্বভাবের সামি কষ্টের কথা সহজে প্রকাশ করে না বলেই জানিয়েছে পরিবার।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজানে ভয়াবহ সেই হামলার এক দশক পূর্তিতে পুলিশ কর্মকর্তা রবিউলের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন স্ট্রিম। সেখানে স্ত্রী উম্মে সালমা ও ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামসের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে রবিউলের দুই সন্তানের কথা, পরিবারের বর্তমান বাস্তবতা, স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা এবং স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে প্রত্যাশার কথা।

রবিউলের স্ত্রী উম্মে সালমা বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধক কার্যালয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। রবিউলের মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক বিষয় বিবেচনায় তাঁকে ওই চাকরি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি এখন স্বামীর বাড়ি ধামরাইয়ের দেপাশা গ্রামেই বসবাস করছেন।

উম্মে সালমা বলেন, সন্তানরা বাবার সাহসিকতা নিয়ে যেমন গর্ব করে, তেমনি বাবাকে না পাওয়ার কষ্টও তাদের ভেতরে সবসময় কাজ করে।

স্বামীকে নিয়ে তিনি বলেন, রবিউল ছিলেন এমন একজন মানুষ, যাকে শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই ভালোবাসতেন। মানুষের উপকার করাই ছিল তার স্বভাব। নিজের কষ্টের কথা কখনও প্রকাশ করতেন না, বরং অন্যের পাশে দাঁড়াতেন সবসময়।

সরকারের কাছে তাদের কখনই ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া ছিল না জানিয়ে সালমা বলেন, তবে দেশের জন্য আত্মত্যাগ করা একজন মানুষের স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় থাকুক—এটাই তাদের প্রত্যাশা।

রবিউলের স্বপ্নের দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

পুলিশের দায়িত্ব সামলানোর পাশাপাশি সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্নও দেখতেন রবিউল করিম। সেখান থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান— ‘নজরুল বিদ্যাসিঁড়ি’ এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য ‘ব্লুমস’।

রবিউলের ছোট ভাই শামসুজ্জামান শামস জানান, গ্রামের দরিদ্র কৃষক ও শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে ‘নজরুল বিদ্যাসিঁড়ি’র যাত্রা শুরু হয়। আর ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ব্লুমস’-এর লক্ষ্য ছিল প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষা, থেরাপি ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা।

মাত্র ১১ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা ব্লুমসে এখন ৪৩ জন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু পড়াশোনা করছে। এখানে বাক, শ্রবণ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষা, থেরাপি, মিড-ডে মিল এবং নিজস্ব পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে।

ভাইয়ের মৃত্যুর পর ব্লুমস পরিচালনায় সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে জানিয়ে শামসুজ্জামান বলেন, স্কুলটিতে বর্তমানে মাসে ৮০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হলেও স্থায়ী অর্থায়নের কোনো ব্যবস্থা হয়নি। ভাইয়ের বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং স্থানীয়দের ছোট ছোট অনুদানেই স্কুলটি টিকে আছে।

স্মৃতিফলক অপসারণে ক্ষোভ

নিজেদের কোনো দাবি-দাওয়া না থাকলেও রবিউলের স্মৃতিচিহ্নগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে আক্ষেপ করেছে তার পরিবার।

উম্মে সালমা জানান, মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয়ের প্রধান ফটকে ‘রবিউল গেইট’ নামে যে নামফলক ছিল, সেটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। একইভাবে গুলশান থানার পাশে রবিউল করিম ও সালাউদ্দিন খানের স্মরণে নির্মিত ম্যুরালটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে। কে বা কারা এসব সরিয়েছে, সে বিষয়ে পুলিশও স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেনি।

তিনি বলেন, ‘একদিকে সম্মান দেখানো, অন্যদিকে সেই স্মৃতিকে আবার মুছে ফেলা—এটা আমাদের কাছে প্রহসনের মতো মনে হয়। আমরা চাই রবিউলের সম্মানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক। সে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। তাকে সম্মান দেওয়া না হলে সেটি আমাদের জন্য হতাশাজনক।’

রবিউলের স্ত্রী ও ছোট ভাই দুজনেরই কথা, হোলি আর্টিজান হামলা শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো দেশের ইতিহাসের অংশ। তারা প্রত্যাশা করেন, ওই হামলার স্মৃতি সংরক্ষণে স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ, ডিবি কার্যালয়ের ‘রবিউল গেইট’-এর নামফলক পুনঃস্থাপন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তাদের ভাষায়, এসব স্মৃতিচিহ্ন ব্যক্তির নয়, বরং সাহস, দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম এবং সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সংগ্রামের প্রতীক।

২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলায় দেশি-বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জন নিহত হন। তাদেরই একজন পুলিশ কর্মকর্তা রবিউল। ওই ঘটনায় ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নব্য জেএমবির সাত সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত