ড. খালিদুর রহমান

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণবিক্ষোভ, বিপ্লব, সামরিক অভ্যুত্থান, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিদ্রোহের মুখে বহু শাসক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। কেউ বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন, কেউ আবার রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থান ঘটিয়েছেন। কিন্তু একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে গণআন্দোলনে পতন, দেশত্যাগ, বিদেশে অবস্থান, দেশে প্রত্যাবর্তন এবং পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ—এই পাঁচটি ধাপ পরপর সংঘটিত হওয়ার নজির খুবই সীমিত।
ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ঘটনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালের ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে তিনি ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে ইরান ত্যাগ করেন। ইসলামী বিপ্লব তার শাসনের অবসান ঘটায় এবং তিনি আর দেশে ফিরে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুতি ও বিদেশে চলে যাওয়ার সঙ্গে তার ঘটনা মেলে, কিন্তু প্রত্যাবর্তন ও পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের অধ্যায় নেই।
ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোসের ক্ষেত্রেও একই সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। ১৯৮৬ সালের পিপল পাওয়ার আন্দোলনের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে হাওয়াইয়ে চলে যান। পরে মার্কোস পরিবার ফিলিপাইনের রাজনীতিতে ফিরে এলেও মার্কোস নিজে আর ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি। তার পুত্র ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অর্থাৎ পারিবারিক রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, ব্যক্তিগত ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন নয়।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতা পুনর্দখলের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি। ১৮১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এলবা দ্বীপে নির্বাসিত হওয়ার পর ১৮১৫ সালে তিনি ফ্রান্সে ফিরে ‘হান্ড্রেড ডেজ’-এর জন্য আবার ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তার পতনের কারণ গণআন্দোলন ছিল না; ছিল সামরিক পরাজয় ও ইউরোপীয় রাজনৈতিক সংঘাত। ফলে তার ঘটনাকে গণআন্দোলনে পতিত শাসকের বিদেশ থেকে ফিরে পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের সরাসরি নজির বলা যায় না।
ঘানার কওয়ামে নক্রুমাহ সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বিদেশে চলে যান এবং আর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে পারেননি। উগান্ডার ইদি আমিন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সৌদি আরবে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই জীবন শেষ করেন। ইথিওপিয়ার হাইলে সেলাসি বিদেশি সামরিক দখলের কারণে দেশত্যাগ করে পরে দেশে ফিরেছিলেন এবং আবার সম্রাটের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু তার ঘটনাও গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তুলনীয় নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এই ঐতিহাসিক প্রশ্নকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন এবং ভারতে চলে যান। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয় এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে দেওয়া সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ও সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি অবশ্য প্রশ্নটিকে নিছক ঐতিহাসিক কৌতূহলের পর্যায়ে রাখছে না। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে এক মিডিয়া অনুষ্ঠানে অডিও বক্তব্য দিয়ে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং আবারও বলেন, তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান। তিনি গ্রেপ্তার কিংবা আরও গুরুতর পরিণতির ঝুঁকির কথাও স্বীকার করেছেন। বাংলাদেশে তার বক্তব্য প্রচার নিয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
তার এই বক্তব্যের তাৎপর্য আরও বেড়েছে কারণ এটি কেবল দেশে ফেরার ঘোষণা নয়; একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার ইঙ্গিত। এর আগে জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেছিলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি আরও জানান, নির্বাসন থেকেই তিনি দলকে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, দেশে ফেরা আর ক্ষমতায় ফেরা এক বিষয় নয়। বর্তমান বাস্তবতায় দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার সামনে রাজনৈতিক সমাবেশের মঞ্চের চেয়ে আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্নই আগে আসবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, তিনি দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার হবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও বলেছেন, তার ফেরার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, তার প্রত্যাবর্তনের বাস্তব সম্ভাবনা অনেকাংশে ভারতের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ সরকার তাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে। ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য “অনুকূল পরিবেশ” তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সময়ে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে রয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে।
ফলে সাম্প্রতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে তিনটি পৃথক স্তরে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, তিনি আদৌ ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন কি না। দ্বিতীয়ত, ফিরলে তার বিরুদ্ধে চলমান ও নিষ্পত্তি হওয়া আইনি প্রক্রিয়ার কী পরিণতি হবে। তৃতীয়ত, আইনি বাধা অতিক্রম করে কখনো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেলে জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে।
ইতিহাস দেখায়, গণআন্দোলনের পর পুরোনো শাসকের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন সাধারণত তখনই সম্ভব হয়, যখন নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, নতুন নেতৃত্ব জনসমর্থন হারায়, পুরোনো সংগঠন টিকে থাকে এবং সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ আগের নেতৃত্বকে পুনরায় গ্রহণে প্রস্তুত হয়। কিন্তু প্রত্যাবর্তন আর রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এক নয়। দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন নির্বাচনী বৈধতা, সংগঠন, জনসমর্থন, প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা।
এই জায়গাতেই শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অন্য ঐতিহাসিক নজির থেকে আলাদা। নেপোলিয়ন নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু তিনি গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হননি। মার্কোস গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়েছিলেন, কিন্তু আর ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি। শাহ পাহলভি দেশত্যাগের পর আর ফিরতে পারেননি। অন্যদিকে শেখ হাসিনা এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে তার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রকাশ্যে এসেছে, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আগে রয়েছে গুরুতর আইনি ও কূটনৈতিক বাধা।
অতএব, সাম্প্রতিক খবর ইতিহাসের পুরোনো সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি বদলে দেয়নি; বরং প্রশ্নটিকে আরও বাস্তব করেছে। শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন সফল হবে কি না, সেটিই এখন প্রথম প্রশ্ন। তার পরের প্রশ্ন হবে, তিনি দেশে ফিরলে কী ধরনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারবেন।
ইতিহাসের বিচারে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে আবার রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ অত্যন্ত বিরল। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই পথ আরও কঠিন। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখিয়ে দিয়েছে, “অসম্ভব” বলে কোনো সম্ভাবনাকে আগেভাগে ইতিহাসের বাইরে ঠেলে দেওয়ার চেয়ে আইনি কাঠামো, ভারতের অবস্থান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনমত এবং বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব—এই পাঁচটি উপাদানের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করাই হবে বেশি যুক্তিসংগত।
লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণবিক্ষোভ, বিপ্লব, সামরিক অভ্যুত্থান, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক বিদ্রোহের মুখে বহু শাসক ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন। কেউ বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, কেউ দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন, কেউ আবার রাজনৈতিকভাবে পুনরুত্থান ঘটিয়েছেন। কিন্তু একই ব্যক্তির ক্ষেত্রে গণআন্দোলনে পতন, দেশত্যাগ, বিদেশে অবস্থান, দেশে প্রত্যাবর্তন এবং পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ—এই পাঁচটি ধাপ পরপর সংঘটিত হওয়ার নজির খুবই সীমিত।
ইরানের শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ঘটনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালের ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে তিনি ১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে ইরান ত্যাগ করেন। ইসলামী বিপ্লব তার শাসনের অবসান ঘটায় এবং তিনি আর দেশে ফিরে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুতি ও বিদেশে চলে যাওয়ার সঙ্গে তার ঘটনা মেলে, কিন্তু প্রত্যাবর্তন ও পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের অধ্যায় নেই।
ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোসের ক্ষেত্রেও একই সীমাবদ্ধতা দেখা যায়। ১৯৮৬ সালের পিপল পাওয়ার আন্দোলনের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে হাওয়াইয়ে চলে যান। পরে মার্কোস পরিবার ফিলিপাইনের রাজনীতিতে ফিরে এলেও মার্কোস নিজে আর ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি। তার পুত্র ফার্দিনান্দ মার্কোস জুনিয়র ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। অর্থাৎ পারিবারিক রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, ব্যক্তিগত ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন নয়।
নেপোলিয়ন বোনাপার্ট নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতা পুনর্দখলের সবচেয়ে বিখ্যাত উদাহরণগুলোর একটি। ১৮১৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে এলবা দ্বীপে নির্বাসিত হওয়ার পর ১৮১৫ সালে তিনি ফ্রান্সে ফিরে ‘হান্ড্রেড ডেজ’-এর জন্য আবার ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু তার পতনের কারণ গণআন্দোলন ছিল না; ছিল সামরিক পরাজয় ও ইউরোপীয় রাজনৈতিক সংঘাত। ফলে তার ঘটনাকে গণআন্দোলনে পতিত শাসকের বিদেশ থেকে ফিরে পুনরায় ক্ষমতা গ্রহণের সরাসরি নজির বলা যায় না।
ঘানার কওয়ামে নক্রুমাহ সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বিদেশে চলে যান এবং আর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরতে পারেননি। উগান্ডার ইদি আমিন ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর সৌদি আরবে আশ্রয় নেন এবং সেখানেই জীবন শেষ করেন। ইথিওপিয়ার হাইলে সেলাসি বিদেশি সামরিক দখলের কারণে দেশত্যাগ করে পরে দেশে ফিরেছিলেন এবং আবার সম্রাটের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু তার ঘটনাও গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারিয়ে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তুলনীয় নয়।
বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এই ঐতিহাসিক প্রশ্নকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়েন এবং ভারতে চলে যান। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা হয় এবং ২০২৫ সালের নভেম্বরে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে দেওয়া সেই রায়ের পূর্ণাঙ্গ লিখিত রায়ও সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাবলি অবশ্য প্রশ্নটিকে নিছক ঐতিহাসিক কৌতূহলের পর্যায়ে রাখছে না। গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে এক মিডিয়া অনুষ্ঠানে অডিও বক্তব্য দিয়ে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান এবং আবারও বলেন, তিনি ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফিরতে চান। তিনি গ্রেপ্তার কিংবা আরও গুরুতর পরিণতির ঝুঁকির কথাও স্বীকার করেছেন। বাংলাদেশে তার বক্তব্য প্রচার নিয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকায় বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
তার এই বক্তব্যের তাৎপর্য আরও বেড়েছে কারণ এটি কেবল দেশে ফেরার ঘোষণা নয়; একই সঙ্গে আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় করার ইঙ্গিত। এর আগে জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা বলেছিলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি আরও জানান, নির্বাসন থেকেই তিনি দলকে সাংগঠনিকভাবে পুনর্গঠনের চেষ্টা করছেন।
কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, দেশে ফেরা আর ক্ষমতায় ফেরা এক বিষয় নয়। বর্তমান বাস্তবতায় দেশে ফিরলে শেখ হাসিনার সামনে রাজনৈতিক সমাবেশের মঞ্চের চেয়ে আদালত ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রশ্নই আগে আসবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেছেন, তিনি দেশে ফিরলে গ্রেপ্তার হবেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও বলেছেন, তার ফেরার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, তার প্রত্যাবর্তনের বাস্তব সম্ভাবনা অনেকাংশে ভারতের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ সরকার তাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করেছে। ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য “অনুকূল পরিবেশ” তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। একই সময়ে হাসিনাকে প্রত্যর্পণের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু হয়ে রয়েছে। ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করছে।
ফলে সাম্প্রতিক বাস্তবতায় শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে তিনটি পৃথক স্তরে দেখা প্রয়োজন। প্রথমত, তিনি আদৌ ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরতে পারবেন কি না। দ্বিতীয়ত, ফিরলে তার বিরুদ্ধে চলমান ও নিষ্পত্তি হওয়া আইনি প্রক্রিয়ার কী পরিণতি হবে। তৃতীয়ত, আইনি বাধা অতিক্রম করে কখনো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার সুযোগ পেলে জনগণ ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তাকে কীভাবে গ্রহণ করবে।
ইতিহাস দেখায়, গণআন্দোলনের পর পুরোনো শাসকের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন সাধারণত তখনই সম্ভব হয়, যখন নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, নতুন নেতৃত্ব জনসমর্থন হারায়, পুরোনো সংগঠন টিকে থাকে এবং সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ আগের নেতৃত্বকে পুনরায় গ্রহণে প্রস্তুত হয়। কিন্তু প্রত্যাবর্তন আর রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন এক নয়। দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজন নির্বাচনী বৈধতা, সংগঠন, জনসমর্থন, প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা।
এই জায়গাতেই শেখ হাসিনার সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ অন্য ঐতিহাসিক নজির থেকে আলাদা। নেপোলিয়ন নির্বাসন থেকে ফিরে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু তিনি গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হননি। মার্কোস গণআন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়েছিলেন, কিন্তু আর ক্ষমতায় ফিরতে পারেননি। শাহ পাহলভি দেশত্যাগের পর আর ফিরতে পারেননি। অন্যদিকে শেখ হাসিনা এখন এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি, যেখানে তার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রকাশ্যে এসেছে, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আগে রয়েছে গুরুতর আইনি ও কূটনৈতিক বাধা।
অতএব, সাম্প্রতিক খবর ইতিহাসের পুরোনো সিদ্ধান্তকে পুরোপুরি বদলে দেয়নি; বরং প্রশ্নটিকে আরও বাস্তব করেছে। শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন সফল হবে কি না, সেটিই এখন প্রথম প্রশ্ন। তার পরের প্রশ্ন হবে, তিনি দেশে ফিরলে কী ধরনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ তৈরি করতে পারবেন।
ইতিহাসের বিচারে গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বিদেশে অবস্থানের পর দেশে ফিরে আবার রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে আরোহণ অত্যন্ত বিরল। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেই পথ আরও কঠিন। তবে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন দেখিয়ে দিয়েছে, “অসম্ভব” বলে কোনো সম্ভাবনাকে আগেভাগে ইতিহাসের বাইরে ঠেলে দেওয়ার চেয়ে আইনি কাঠামো, ভারতের অবস্থান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সক্ষমতা, জনমত এবং বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব—এই পাঁচটি উপাদানের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করাই হবে বেশি যুক্তিসংগত।
লেখক: শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক
.png)

একজন নেতার মৃত্যু একটি দলের জন্য শোকের ঘটনা। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক পরীক্ষাও। নেতা চলে যাওয়ার পর দলটি কী করে, সেটিই প্রমাণ করে সেই নেতার উত্তরাধিকার কতটা গভীর ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপিও এমন এক পরীক্ষার সামনে। জন্মদিনে দলটি তাঁকে স্মরণ করবে। শ্রদ্ধা জানাবে।
৩ ঘণ্টা আগেবিবিএস বলছে, বিগত জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশে, যা গত আট মাসে সর্বনিম্ন। জুনে এটা ছিল ৯ দশমিক ১৬; মে’তে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত—উভয় মূল্যস্ফীতিই নিম্নমুখী বলে জানাচ্ছে সংস্থাটি।
১৯ ঘণ্টা আগে
দেশে গত দুই মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাব বলছে, এ সময়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে। বাজার বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এই ব্যবধান বিবিএসের তথ্যের মান, স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উসকে দিয়েছে।
১৯ ঘণ্টা আগে
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর প্রায় তিন কোটি দশ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমান কর্মঘণ্টা শুধু গরমের কারণে নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে এই অঞ্চলের অর্থনীতি প্রায় সাত শতাংশ ছোট হয়ে যেতে পারে।
১৪ আগস্ট ২০২৬