leadT1ad

চানখাঁরপুল হত্যার রায়

কনস্টেবলদের ৩ বছর দণ্ডের আইনি ব্যাখ্যায় যা বলেছে আদালত

প্রকাশ : ২৬ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩: ১২
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। স্ট্রিম ছবি

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শেষ দিকে আন্দোলন দমনে কনস্টেবল সুজনের নামে একটি ঢাল আর লাঠি ইস্যু হয়। তাঁর হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল না। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপ-কমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম। তিনি আরেক কনস্টেবল অজয় ঘোষের কাছ থেকে জোর করে চাইনিজ রাইফেল নিয়ে সুজনের হাতে দিয়ে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন। সেই গুলিতে আন্দোলনকারী লুটিয়ে পড়ার পর সুজন উল্লাস করেন। জব্দকৃত ভিডিওতে এই উল্লাসর পরও কেন সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়নি তার আইনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন আদালত। আদালতের ভাষ্য—সুজন পরিস্থিতির শিকার। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জোর করে হাতে অস্ত্র তুলে না দিলে তিনি খুনি হতেন না।

সোমবার (২৬ জানুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চানখাঁরপুল হত্যা মামলার রায় দেন। রায়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায় এবং অধস্তনদের ওবিডিয়েন্স টু সুপিরিয়র অর্ডারস বা বাধ্যগত আনুগত্যের আইনি সীমারেখা এভাবেই টেনে দেওয়া হয়েছে।

রায়ে বলা হয়েছে, অধস্তন পুলিশ সদস্যরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে এবং পরিস্থিতির শিকার হয়ে গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাই মূল হুকুমদাতা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, একজনকে ছয় বছরের কারাদণ্ড এবং নির্দেশ পালনকারী তিন কনস্টেবলকে লঘু দণ্ড হিসেবে ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

হুকুমদাতার ফাঁসি, পলাতকদের দণ্ড

মৃত্যুদণ্ড দেওয়া তিন শীর্ষ কর্মকর্তা হলেন—হাবিবুর রহমান, ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং এডিসি আখতারুল। আদালত তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দিয়েছেন।

এছাড়া পলাতক সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মো. ইমরুলকে ৬ বছরের কারাদণ্ড, কারাগারে থাকা শাহবাগে থানার ইন্সপেক্টর মো. আরশাদ হোসেনকে ৪ বছর এবং কনস্টেবল সুজন হোসেন, ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলামকে ৩ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

‘কম সাজার’ আইনি ভিত্তি

রায়ে কনস্টেবলদের লঘু দণ্ড দেওয়ার আইনি ভিত্তি হিসেবে লঘুকারী পরিস্থিতি বা এক্সটেনুয়েটিং সারকামস্ট্যান্সেস-এর উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেন, কনস্টেবল সুজন মাত্র কয়েক মাস আগে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। ৫ আগস্টের উত্তাল পরিস্থিতিতে এডিসি আখতারুল অস্ত্র ধরিয়ে গুলির নির্দেশ দেন। ঊর্ধ্বতনের মুখের ওপর না বলা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে একে লঘুকারী পরিস্থিতি বলা হয়।

একইভাবে কনস্টেবল ইমাজ হোসেন ও নাসিরুল ইসলামও ঊর্ধ্বতনদের আদেশে গুলি চালাতে বাধ্য হয়েছিলেন বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়। এজন্য তাদেরও ৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ ও ঊর্ধ্বতনদের দায়

রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তিন কর্মকর্তার অপরাধের মাত্রা বা গ্র্যাভিটি অব অফেন্স সম্পর্কে কঠোর পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন আদালত। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে সকল ইউনিটকে বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্রসহ ম্যাক্সিমাম ফোর্স বা সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

মাঠ পর্যায়ে সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন করেছেন এডিসি আখতারুল ইসলাম।

বিচারকরা বলেন, এই তিন কর্মকর্তার সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি বা ঊর্ধ্বতন কমান্ড দায়িত্ব ছিল হত্যা বন্ধ করার, কিন্তু তারা তা না করে উলটো হত্যায় প্ররোচনা দিয়েছেন। তাই তাদের সর্বোচ্চ সাজাই প্রাপ্য।

আদালত স্পষ্ট করে বলেন, অভিযুক্ত হাবিবুর রহমান, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, শাহ আলম মো. আখতারুল উক্ত ছয়জন ভিকটিম বিক্ষোভকারীকে হত্যায় দায়ী।

এপ্রসঙ্গে আদালত বলেন, মৃত বিক্ষোভকারীদের কে কার গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল। অথবা ছয়জন ভিকটিমের কাকে কার গুলি আঘাত করেছিল। এটি প্রমাণিত হয়নি।

শহীদের চিঠি ও উপদেষ্টার জবানবন্দি

রায়ে দালিলিক প্রমাণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। প্রসিকিউশন পক্ষ ২৬ জন সাক্ষীকে জেরা করেছে এবং ডিফেন্স পক্ষ ৩ জন সাক্ষী হাজির করেছে। এর মধ্যে আবেগঘন দলিল হিসেবে উঠে এসেছে নিহত শিক্ষার্থী শাহরিয়ার খান আনাসের একটি চিঠি। মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচিতে যোগ দিতে বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তিনি মায়ের উদ্দেশে এই চিঠি লিখে গিয়েছিলেন।

উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার (১৯ নম্বর সাক্ষী) জবানবন্দি এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে এটি স্পষ্ট যে, নিরস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের নির্মূল করতেই রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

অস্ত্রের হিসাব ও পলাতকদের গিলটি মাইন্ড

রায়ে অস্ত্র ও গুলির হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ করেন, চানখাঁরপুল অভিযানে অন্তত ৪০ জন পুলিশ সদস্য অংশ নেন এবং তাদের মধ্যে ৮ জনকে চায়না রাইফেল, ১৫ জনকে শটগান এবং ২ জনকে এসএমজি ইস্যু করা হয়েছিল।

সাক্ষীগণের বরাত দিয়ে আদালত বলেন, সেদিন “বৃষ্টির মতো গুলি” বর্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু মাত্র ৪-৫ জন ছাড়া বাকিরা অস্ত্র বা গুলির কোনো হিসাব দেননি।

আদালত পর্যবেক্ষণে আরও বলেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর হাবিবুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পালিয়ে যাওয়াই প্রমাণ করে, তাঁর অপরাধ সংঘটন করেছিলেন এবং তাঁদের মধ্যে অপরাধবোধ বা গিল্টি মাইন্ড কাজ করছিল।

রায় কার্যকর ও আপিল প্রক্রিয়া

আদালত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারের পর বা আত্মসমর্পণের পর থেকে তাদের দণ্ড কার্যকর হবে বলে নির্দেশনা দেন। পলাতকদের মেয়াদ আত্মসমর্পণ বা গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে (যেটি প্রযোজ্য) গণনা হবে।

কারাগারে থাকা আসামিদের অবিলম্বে সাজা পরোয়ানাসহ কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দণ্ডপ্রাপ্তরা রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবেন।

মামলার ইতিবৃত্ত

এ মামলায় ৯০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনের কাছে দাখিল করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয় গত বছরের ২১ এপ্রিল। ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল হয় ওই বছরের ২৫ মে। অভিযোগ গঠন হয় ১৪ জুলাই। সাক্ষ্য গ্রহণ ও সূচনা বক্তব্য শুরু হয় ১১ আগস্ট। প্রথম সাক্ষী ছিলেন শহীদ আনাসের বাবা। ২৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ শেষ হয় ১০ ডিসেম্বর। যুক্তিতর্ক শুরু হয় ১৫ ডিসেম্বর এবং শেষ হয় ২৪ ডিসেম্বর। রায়ের নির্ধারিত তারিখ ছিল চলতি ২০ জানুয়ারি। পরে পিছিয়ে ২৬ জানুয়ারি ধার্য করা হয়। এ মামলায় সাফাই সাক্ষী ছিলেন ২ জন।

জব্দ তালিকায় ১৯টি ভিডিও, ১১টি নিউজ প্রতিবেদন, ৬টি মৃত্যুসনদ, ২টি অডিও, বই ও ১১টি রিপোর্ট ছিল।

মামলায় গ্রেপ্তার চার আসামি—ওসি (অপারেশন) মো. আরশাদ, কনস্টেবল সুজন, ইমন এবং নাসিরুল। চার পলাতক আসামি হলেন—হাবিবুর, সুদীপ, আখতারুল এবং ইমরুল।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখাঁরপুলে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালায়। এতে শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক নিহত হন। ওই ঘটনায় একাধিক ব্যক্তি আহত হন।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত