দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। উল্টো ‘মব ভায়োলেন্স’ বা দঙ্গলবাজির নতুন সংস্কৃতি গড়ে উঠছে। বিশিষ্টজনেরা বলছেন, সংস্কারের নামে এমন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, যা সমাজে ‘পপুলার ফ্যাসিজম’ জন্ম দিয়েছে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) রাজধানীর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে এক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘আগামী নির্বাচিত সরকার ও নাগরিক প্রত্যাশা’ শীর্ষক এই আলোচনার আয়োজন করে বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, মব ভায়োলেন্স বা দঙ্গলবাজি এখন অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যা। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম বন্ধ হয়নি। সহিংসতার সংস্কৃতি সমাজ থেকে যায়নি, বরং রূপ বদলেছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে সামিনা লুৎফা বলেন, সাইবার স্পেসেও ভয়াবহ আক্রমণ চলছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তার স্বার্থে ফেসবুকে অনেক পোস্ট ‘অনলি মি’ করে রাখতে হচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া নারীরাও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। তিনি জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নেতৃত্বকে ক্ষমতায় আনার আহ্বান জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফিরোজ আহমেদ বলেন, মব বা দঙ্গলবাজিকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। ভারতে বিজেপি ক্ষমতায় যেতে দঙ্গলবাজি ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশেও কোনো শক্তি এটি ব্যবহার করতে পারে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন মব রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার না হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে ফিরোজ আহমেদ বলেন, শেখ হাসিনা বা এরশাদের আমলের মতোই আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দেশ চলছে। চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা বা সফটওয়্যার কেনাসহ বড় চুক্তিগুলোর স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তিনি চাঁদাবাজি নির্মূলে আগামী সরকারকে স্পষ্ট রূপরেখা দেওয়ার তাগিদ দেন।
অর্থনীতিবিদ জিয়া হাসান বলেন, গত দেড় বছরে সংস্কারের নামে অকর্মণ্য শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে দেশে পপুলার ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছে। হাসিনার আমলে ছিল পুলিশি রাষ্ট্রনির্ভর ‘স্টেট ফ্যাসিজম’। এখন ফ্যাসিবাদ জনসমাজের ভেতরে ঢুকে গেছে, যা আরও বিপজ্জনক।
জিয়া হাসান আরও বলেন, উগ্রতা ও সহিংস ভাষাই যেন এখন দেশপ্রেমের মাপকাঠি। সামাজিক বিভাজন ও ঘৃণার রাজনীতি অর্থনীতিকে স্থায়ী পতনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই সংকট কাটাতে তিনি প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ বা সত্য ও মীমাংসা প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেন।
আলোচনায় শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি ভাঙা রাষ্ট্রব্যবস্থা মেরামত করা। রাষ্ট্র কার্যকর করতে শক্তিশালী সরকার প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্র যেন নিয়ন্ত্রণহীন না হয়, সে জন্য সিভিল সোসাইটির ভূমিকা থাকতে হবে। কিন্তু গত এক দশকে সিভিল সোসাইটিকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
ভারতবিরোধী মনোভাব প্রসঙ্গে ড. জাহেদ বলেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে বাংলাদেশ চাপে পড়বে। প্রতিবেশী দেশের আগ্রাসী আচরণ ও নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। ধর্মের নামে উগ্রতা ঠেকাতে সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
বৈঠকে বক্তারা পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিতে স্বাধীন কমিশন গঠনের দাবি জানান। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।