জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

Fahh: স্ল্যাং নাকি ডিজিটাল ব্রিদিং স্পেস

মার্যিউর রহমান চৌধুরী
মার্যিউর রহমান চৌধুরী

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাস্তব দুনিয়া লজিকে চললেও ইন্টারনেটের দুনিয়া তেমন লজিক গুনে না। কিন্তু রেগুলার লাইফে আমরা যে পরিমাণ প্রেশারে থাকি, যত স্ট্রেস আমাদের ওপর দিয়া যায়, তাতে অনেক সময় নেট দুনিয়ার ইলজিক্যাল আর মিনিংলেস ব্যাপারস্যাপার আমাদের স্ট্রেস রিলিফের সুযোগ কইরা দেয়। আমরা একটু ব্রিদিং স্পেস পাই। আপনি আমি সারাদিন অফিসের বস কিংবা ভার্সিটির ফ্যাকাল্টির কাছে এতো পরিমাণে প্যারা খাই যে সুযোগ পাইলে হয়তো বালিশে মুখ লুকাইয়া কানতাম। কিন্তু কানতে তো আর পারি না। এই সময়ে কান্দার অল্টারনেটিভ হইয়া আমাদের সামনে আসে ডুমস্ক্রলিং।

এই ফেইজে প্রতিটা স্ক্রলিংয়ে মিনিংলেস মিম আর নানাবিধ স্ল্যাং, অনেক বলতে না পারা জিনিসের মিনিং দিয়া দেয়। রিসেন্ট টাইমে এমন একটা ভাইরাল ইন্টারনেট স্ল্যাং হইলো ‘Fahh!’। আমরা যারা ডুমস্ক্রলিংয়ের নেশায় আসক্ত, আমাদের জীবনের অংশ হইয়া উঠছে যেন এই Fahh!

ইন্টারনেটে কয়দিন পরপর মৌসুমি ফলের মতো নতুন নতুন স্ল্যাং আসে। এই অনলাইন স্ল্যাংগুলারে ডিফাইন করা খুবই প্যারার। যেমন অর্থটা পেটে আসতেছে, কিন্তু মুখে আসতেছে না। যেমন, আপনি একটা মিম দেখলেন যেখানে পাঞ্চ লাইনের পরে Fahh! সাউন্ড ইফেক্ট বেজে উঠছে। খেয়াল করলে দেখবেন, আপনি পুরা মিমের অর্থ বুঝে গেছেন কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারতেছেন না। এটাই ইন্টারনেটের স্ল্যাঙের সবচেয়ে বড় ম্যাজিক।

ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট

Fahh! শুধু বাংলা ভাষাভাষী নেট স্ফিয়ারে না সারা দুনিয়ার মানুষের কানের পর্দা ফাটাইতেছে। কিন্তু এর মানে কী?

কী এই Fahh?

ইউফেমিজম নামের একটা জিনিস আছে। ইউফেমিজম হইলো এমন একধরনের ভাষাগত কৌশল, যেখানে কোনো অপ্রীতিকর বা অশোভন শব্দের বদলে অপেক্ষাকৃত নরম, মার্জিত এবং কম আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করা হয়। বাংলায় ‘চ’ বর্গীয় একটা শব্দ আছে। তথাকথিত ভদ্র সমাজে এই শব্দ বলা যায় না। তেমনি সেটার মতো ইংরেজিতেও একটা ‘F’ অক্ষর দিয়ে শুরু হওয়া একটা শব্দ আছে। সামাজিক যে চাপ তাতে এই শব্দটাও সবার সামনে বলা যায় না। আর ‘F’ অদ্যাক্ষরের শব্দটার থিকাই Fahh! শব্দটা আসছে। সেই ‘F’ অদ্যাক্ষরের শব্দ না বলে, সামাজিকতা অক্ষুণ্ন রাইখা তার জায়গায় Fahh! বলে আপনি যেমন আপনার প্রেশার রিলিফ করতে পারবেন, তার পাশাপাশি নানাবিধ চিপায় পড়া থেকেও বেঁচে যাবেন।

যেভাবে এল Fahh!

সোশ্যাল মিডিয়ার মিনিংলেস কন্টেন্ট কনজাম্পশনের যে অ্যাডিকশন, এর নাম ব্রেইনরট। কিন্তু কেন আমাদের ব্রেইন এমন কিছু চায় যার কোনো মিনিং নাই? আলবেয়ার কামুর ‘অ্যাবসার্ডিজম’ থিওরি অনুযায়ী, অর্থহীন এই দুনিয়ায় মানুষ যখন জোর কইরা মিনিং খুঁজতে যায়, তখনই ক্রাইসিস তৈরি হয়। ইন্টারনেট কালচার এই ক্রাইসিসরে উইন করছে হাসি-তামাশার মাধ্যমে।

Fahh! একটা ব্রেইনরট স্ল্যাং! মূলত এবসার্ডিটি, ক্যাচাল, হাস্যকর, ঝামেলা, ধরা খাওয়া, কাম সাড়ছে আর চিপায় পড়ছে বুঝাইতে Fahh! সাউন্ড ইফেক্ট ব্যবহার করা হয়।

সম্প্রতি দেশে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসছে। মন্ত্রীদের শপথ নেয়ার দিয়ের ভিডিও নিয়া একটা মিম চোখে পড়ল। সেখানে দেখা যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দলবল নিয়ে হেঁটে শপথ নিতে যাচ্ছেন সংসদ ভবনে। ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে চলেছে সিগমা স্টাইলের মিউজিক। হঠাৎ তিনি থেমে গেলেন। সবার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘তোমরা কি সব সংসদে ঢুইকা যাইবা?’ তারপরই বেজে উঠলো Fahh! এই মিমে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাকে হাস্যকর বুঝাতে এতে Fahh! সাউন্ড ইফেক্ট যুক্ত করা হয়েছে।

ছবি: ইন্টারনেট
ছবি: ইন্টারনেট

ইন্টারনেটে অধিকাংশ মিম ট্রেন্ডের উৎপত্তি সম্পর্কে তেমন খোঁজ না পাওয়া গেলেও ব্যতিক্রম হইতেছে Fahh! নো ইওর মিম ডট কম এবং টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতে, Fahh! এর শুরু ২০২৪ সালে। ২০২৪ সালে ইউটিউবার এবং টুইচ স্ট্রিমার টাইলিয়নস এই সাউন্ড ইফেক্টটা রেকর্ড করে তার কন্টেন্টে নিয়মিত ব্যবহার করতে থাকে। ২০২৫ সালের ৭ই জুলাই, টিকটকার @premiumtai টিকটকে একটি ভিডিও পোস্ট করে। সেখানে সে টাইলিয়নসের টিকটকের কিছু ভিডিও স্ক্রল করে করে দেখায়। সেখানে দেখা যায় Fahh! সেই ভিডিও দুই মাসে ১.৬ মিলিয়ন ভিউ পায়।

২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর টাইলিয়নস টিকটক অ্যাকাউন্টে এই সাউন্ড ইফেক্টের উৎস নিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করে। সেখানে সে জানায়, সে সাউন্ড ইফেক্টটি ২০২৪ সালে রেকর্ড করেছিল। ২০২৫ সালের তার প্রায় সব কনটেন্টে এই সাউন্ড ইফেক্টটির ব্যবহার দেখা যায়।

আমরা কেনো এতো Fahh! Fahh! করতেছি

মাথার ভেতর অদৃশ্য এক স্পিকারে যেন অবিরাম বাইজা যাচ্ছে এই ‘Fahh!’! মনে হইতেছে কেউ কানের একদম গোড়ায় এসে অবিরত চিৎকার করতেছে। এমনকি ঘুমের ঘোরে বা স্বপ্নের ভেতরেও একই সাউন্ড ইফেক্ট পিছু ছাড়তেছে না। বন্ধুর সিরিয়াস কোনো শোকসংবাদ বা বসের পাঠানো ডেডলাইনের রিপলাই দিতে গিয়েও আপনার আঙুল চুলকায়, আপনি টাইপ করতে চান ‘Fahh!’

কিন্তু কেন এই অবসেশন? আমরা কি সবাই মিলে একটা ডিজিটাল মাস সাইকোসিসের দিকে যাচ্ছি?

এর পেছনে কাজ করছে মগজের এক অদ্ভুত মেকানিজম, যাকে বলা হয় ইয়ারওয়ার্ম। সাধারণত কোনো পপুলার গানের সুরের ক্ষেত্রে এটা ঘটে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের প্রেসার কুকারে যখন ফ্রাস্ট্রেশনের বাষ্প জমে যায়, তখন ‘Fahh!’ শব্দটা সেই বাষ্প বের করে দেওয়ার সেফটি ভাল্ভ হিসেবে কাজ করে।

তা ছাড়া এই অদ্ভুত চিৎকারটা একটা কালচারাল ইনসাইডার ট্রেডিংয়ে পরিণত হয়েছে। একে বলা হয় ইন গ্রুপ সিগন্যালিং। আপনি যখন কাউকে ‘Fahh!’ বলছেন, আপনি আসলে অদৃশ্য একটা পাসওয়ার্ড শেয়ার করতেছেন। এটা প্রমাণ করে যে আপনি ডিজিটাল কালচারের সেই এলিট সার্কেলের অংশ, যারা ব্রেইনরট কালচারের ভাষা বোঝে। এটা একধরনের কালচারাল ক্যাপিটাল; আজকের দুনিয়ায় যার মিম সেন্স যত উইয়ার্ড, ডিজিটাল স্পেসে তার কারেন্সি তত চড়া।

তবে সবচেয়ে বড় সত্য হইল, ‘Fahh!’ আমাদের একটা সিউডো লিবার্টি দেয়। যে সিস্টেমে আমরা সরাসরি গালি দিতে পারি না, সরাসরি চিৎকার করতে পারি না, সেই সিস্টেমকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য এখন এই একটা শব্দই যথেষ্ট।

তাই পরের বার যখন আপনার অজান্তেই মুখ দিয়ে ‘Fahh!’ বের হবে, বুঝবেন আপনি আসলে জীবন যুদ্ধে হাইরা যান নাই; বরং আপনি আপনার ভেতরের সব না বলা হাহাকারকে কয়েক সেকেন্ডে একটা ফানি সাউন্ডে কনভার্ট করে সিস্টেমরে কড়া একটা চেকমেট দিছেন।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত