সিপিডি-ঢাকা স্ট্রিম সংলাপ

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে নীতি সহায়তার তাগিদ

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

‘আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ’ শীর্ষক সংলাপে অতিথিরা। স্ট্রিম ছবি

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের নীতিগত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা। রোববার (১৭ মে) বিকেলে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ে সেমিনারে এই আহ্বান জানান তাঁরা।

‘আসন্ন বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ’ শীর্ষক সংলাপের আয়োজক যৌথভাবে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম ঢাকা স্ট্রিম। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট খালিদ মাহমুদ।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশীয় উপায়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো পরিকাঠামো ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সরকারকে প্রতি মুহূর্তে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। অতীতে এমন সব চুক্তি করা হয়েছে, যার জন্য বর্তমানে ভুগতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের ক্যাপাসিটি চার্জ, অতীতের সরকারের বিভিন্ন চুক্তি ও যথাযথ পরিকাঠামো তৈরি না করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে বর্তমান সরকারকে কাজ করতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা বলেন, জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বিষয়গুলো অনুসন্ধান বা ‘এক্সপ্লোর’ করতে হবে। শুধু বিদেশি সহায়তায় এটি করলে হবে না, নিজস্ব সক্ষমতা প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকার একটি ‘বেঞ্চমার্ক’ করতে চায় এবং প্রতিটি জ্বালানির মজুত নিশ্চিত করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে এদেশে কৃষিও গুরুত্বপূর্ণ এবং জমি অফুরন্ত নয়। কৃষি জমির ক্ষতি করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে যাওয়া সঠিক হবে না। আমাদের এই বিষয়টি খুবই সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর ছাড়ের ব্যাপারে আলোচনা চলছে। আসন্ন বাজেটে এর প্রতিফলন দেখতে পাবেন বলেও জানান তিনি।

সিপিডি এবং ঢাকা স্ট্রিম আয়োজিত সংলাপে খাত সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। স্ট্রিম ছবি
সিপিডি এবং ঢাকা স্ট্রিম আয়োজিত সংলাপে খাত সংশ্লিষ্ট অংশীজন ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেন। স্ট্রিম ছবি

অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য মনজুর হোসেন বলেন, আগামী পাঁচ বছরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ ১০ হাজার মেগাওয়াটে উত্তীর্ণ করা গেলে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। জ্বালানি খাতের যে কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হচ্ছে, সেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। সৌরশক্তিকে জাতীয় গ্রিডে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আর বেসরকারি খাতে প্রণোদনা দিতে হবে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে তাদের চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের ধারণা ২০৩০ সালে চাহিদা হবে ২৩ হাজার মেগাওয়াট। এর মানে সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে সে সময় প্রয়োজন হবে। এটি অসম্ভব নয়। ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি হয়েছে। পানিসম্পদ ও রেলমন্ত্রী কমিটিতে আছেন। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ সহজের পাশাপাশি কীভাবে নীতি সহায়তা দেওয়া যায়, সে ব্যাপারে এই কমিটি আগামী মাসে সুপারিশ দেবে।

সংলাপে বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, সোলারের ট্যারিফ প্রত্যাহারের ব্যাপারে আলোচনা হচ্ছে বলে শুনছি। আশা করি, এই ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসবে। তবে এনবিআরের ফিল্ড লেভেলে যে কর্মকর্তারা কাজ করেন, তাদের সহযোগিতামূলক মনোভাব প্রয়োজন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মোট বাজেটের মাত্র ৩ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বরাদ্দ। বর্তমানে আমাদের মোট বিদ্যুতের মাত্র ২ শতাংশ বা তারও কম আসে এই নবায়নযোগ্য খাত থেকে। এর সঙ্গে বিনিয়োগের একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, আমরা এই খাতে যত বেশি বিনিয়োগ করব এবং বাজেট বরাদ্দ বাড়াব, আমাদের সক্ষমতাও তত বৃদ্ধি পাবে।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী বলেন, পুরো পৃথিবীতে যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির স্থাপিত সক্ষমতা ৩০ শতাংশ, সেখানে আমাদের মাত্র ৪ শতাংশ। আগামী ৫ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামের ওপর আমদানি শুল্ক মওকুফ করা হোক এবং আইপিপির ক্ষেত্রে আমরা তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন বা আয়ের ওপর যেভাবে ট্যাক্স রিবেট দিয়ে থাকি, ঠিক একইভাবে রুফটপ সোলার সিস্টেম যারা করতে চান, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হোক।

স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ও প্রকাশক গোলাম ইফতেখার মাহমুদ বলেন, বাজেটের প্রাক্কালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের সঠিক চিত্র যাতে নীতিনির্ধারকরা পান, সেজন্যই এই আয়োজন। এই খাতে প্রকৃত উদ্যোক্তা না এলে এবং সরকার নীতি সহায়তা না দিলে পুরোনো বৃত্তেই থেকে যাবে। সংশ্লিষ্টদের উচিত, উচ্চাকাঙ্ক্ষী না হয়ে প্রকৃত লক্ষ্য ঠিক করা।

সভাপতির বক্তব্যে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বছরভিত্তিক ন্যাশনাল এনার্জি ট্রানজিশন রিপোর্ট তৈরি করা যায় কিনা, ভেবে দেখা দরকার। এটি করা গেলে সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে বাস্তবায়নের তুলনা দেখা যাবে। স্রেডা যেহেতু দুর্বল, ভারতের মতো রিনিউয়েবল এনার্জির জন্য একটি বিশেষায়িত মন্ত্রণালয় করা যায় কিনা, তা নীতিনির্ধারকরা বিবেচনা করতে পারেন।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত