জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বুধবার (১৩ মে) ২০২৬ তারিখে প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প অনুমোদন করেছে।
ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে গবেষণা, সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিতর্কের পর এবার প্রকল্পটি অনুমোদন পেল। বাস্তবায়িত হলে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে এটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে পারে বলে মনে করছে সরকার। সরকারি নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
এর আগেও সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার নিজস্ব অর্থায়ন ও বিদেশি ঋণের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সেটি আলোর মুখ দেখেনি।
প্রকল্প এলাকা
এই প্রকল্প দেশের মোট ভূমির প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা, অর্থাৎ ৫৪ হাজার ২০৬ বর্গকিলোমিটার অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করবে। এটি চারটি বিভাগ, ২৬টি জেলা ও ১৬৩টি উপজেলায় বিস্তৃত। চার বিভাগের ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলার মানুষ সরাসরি এর সুফল পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকল্পের প্রধান অবকাঠামো
প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে— ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইস, দুটি ফিশ পাস ও একটি নেভিগেশন লক। এছাড়া থাকবে তিনটি অফ-টেক অবকাঠামো।
প্রকল্পের আওতায় দুটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে— পদ্মা নদীর ওপর ৭৬ দশমিক ৪ মেগাওয়াট। গড়াই নদীর ওপর ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট।
এছাড়া গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থার ১৩৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার এবং হিসনা নদী ব্যবস্থার ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার এলাকায় ড্রেজিং করা হবে। নির্মাণ করা হবে ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ বাঁধ।
কেন এই প্রকল্প
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রকল্পটির মাধ্যমে জলাধারে ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা হবে। ২ দশমিক ৮৮ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সেচ নিশ্চিত করা হবে (মোট সেচ সুবিধা ৪ দশমিক ৬৯ মিলিয়ন হেক্টর) যার ফলে বার্ষিক ধান উৎপাদন ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন এবং মাছ উৎপাদন ২ লাখ ৩৪ হাজার টন বাড়বে। ব্যারাজের ডেককে সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হবে এবং ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। এছাড়াও, ৩ হাজার ৪৫০ একর এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার পরিবারের জন্য আধুনিক নগর সুবিধাসম্পন্ন গ্রামীণ টাউনশিপ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে এবং ভূমি উন্নয়নের মাধ্যমে সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার ভিত্তি তৈরি হবে
প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৪৭ হাজার ৯৫০ মানুষের জন্য ১২ কোটি ২৫ লাখ কর্মদিবসের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৯ লাখ ২৭ হাজার স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরকে ভিত্তি ধরে এই প্রকল্প দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ অবদান রাখবে। এর মধ্যে প্রত্যক্ষ সুবিধা থেকে শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ এবং পরোক্ষ সুবিধা থেকে শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আসবে।
বাংলাদেশে জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে দেশের মোট প্রয়োজনীয় পানির মাত্র ১৫ শতাংশ পাওয়া যায়। অথচ এই সময়েই কৃষিতে পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ বাড়ে। অন্যদিকে ভারতের গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় ৯৪২টি পানিনিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো রয়েছে। এর মধ্যে আছে ৭৮৪টি বাঁধ, ৬৬টি ব্যারাজ ও ৯২টি উইয়ার।
ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পদ্মা থেকে ৪০ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করায় নদীর পানিপ্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর ফলে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদীব্যবস্থা পদ্মা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
দেশের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকা—বিশেষ করে বৃহত্তর কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলে—পানিসংকট, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস, জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততার সমস্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর প্রভাবে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন কমেছে। প্রায় ৭ কোটি মানুষের জীবিকা, অর্থনৈতিক স্থিতি ও স্বাস্থ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
সরকার বলছে, পদ্মানির্ভর অঞ্চলে সুন্দরবনের মতো পরিবেশগত ভারসাম্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা, পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য পদ্মা ব্যারাজ ‘অত্যাবশ্যক’।
দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষা
১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে টানা চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়।
২০০২ সালে পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) পরিচালিত প্রাথমিক সমীক্ষায় কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ি অথবা রাজবাড়ীর পাংশাকে ব্যারাজ নির্মাণের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০০৫ সালের ১৮ এপ্রিল বিস্তারিত সমীক্ষা প্রকল্প অনুমোদন করা হয়।
২০০৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া ও পাকিস্তানের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। এ কাজে অংশ নেয় বাংলাদেশের ডিডিসি, বেটস, বিসিএল ও এসিই; পাকিস্তানের ডিভাইন এসিই ও নেসপাক; এবং অস্ট্রেলিয়ার স্মেক। এছাড়া আইডব্লিউএম, আরআরআই, বুয়েট, সিইজিআইএস ও ডেটএক্সসহ পাঁচটি স্থানীয় অংশীদার প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল।
সমীক্ষায় প্রকল্পটিকে প্রযুক্তিগতভাবে বাস্তবসম্মত, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব বলে উল্লেখ করা হয়। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটির নকশা চূড়ান্ত করতে কাজ করে।
২০২৫ সালে প্রকল্প প্রণয়নের সময় ২০১১-২০২৫ সালের স্যাটেলাইট চিত্র ও ১৯৯৭-২০২৫ সময়ের জয়েন্ট রিভার কমিশনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সম্ভাব্য ব্যারাজ স্থানে নদীতীরের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এমনকি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও ব্যারাজ পরিচালনার মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া এবং জি-কে সেচ প্রকল্প এলাকায় প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।