leadT1ad

হাসিনাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে ব্যারিস্টার আরমানের সাক্ষ্য

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ৩২
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। সংগৃহীত ছবি

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে দীর্ঘ আট বছর গুম করে রাখা, পাশবিক নির্যাতন এবং এসিডে ঝলসে লাশ গুমের পরিকল্পনার লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছেন ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেম (আরমান)। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রমের সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বে তিনি এই জবানবন্দি দেন।

আজ বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

এসিডে ঝলসে লাশ গুমের পরিকল্পনা

ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে ব্যারিস্টার আরমান অভিযোগ করেন, তাঁকে হত্যার চূড়ান্ত পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বন্দিদশার কয়েক বছর পর এক প্রহরী তাঁকে জানান, তাঁকে আটকের দিনই ওজন নেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল, এসিড দিয়ে তাঁর চেহারা ও হাত ঝলসে দেওয়ার পর ওজন অনুযায়ী শরীরে ইট বেঁধে বরিশালের কোনো এক নদীতে ফেলে দেওয়া হবে।

সাক্ষ্যে তিনি উল্লেখ করেন, এই হত্যার সিদ্ধান্ত যিনি নিয়েছিলেন, তিনি কয়েকদিনের মধ্যেই এক হামলায় নিহত হন, যার ফলে আরমানের বিষয়ে সিদ্ধান্তটি ঝুলে যায়। প্রহরীর বরাতে তিনি বলেন, ‘জিয়া এখন আর এখানে নেই, থাকলে আপনি এতদিন হায়াত পেতেন না।’

র‍্যাব সদর দপ্তরের আয়নাঘর ও আলামত

ব্যারিস্টার আরমান দাবি করেন, তাঁকে র‍্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইংয়ের টিএফআই সেলে রাখা হয়েছিল এবং এর স্বপক্ষে তিনি মুক্তির পর একাধিক প্রমাণ মিলিয়ে দেখেছেন।

তিনি জানান, সেলে থাকাকালীন তাঁর উরুতে ফোঁড়ার মাইনর সার্জারি করা হয় এবং ঘা শুকানোর জন্য যে মলমের টিউব দেওয়া হয়েছিল, তাতে লাল অক্ষরে লেখা ছিল প্রোপার্টি অব র‍্যাব হেডকোয়ার্টার।

এছাড়া ওষুধের কাঠের বাক্সে ‘টিএফআই', প্যাকেটে ‘ভিআইপি-২, স্ট্যান্ড ফ্যানের নিচে ‘র‍্যাব-১’ এবং শীতকালের কম্বলে ‘র‍্যাব আইএনটি’ লেখা ছিল বলে তিনি সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন।

মুক্তির পর তদন্ত সংস্থার পরিদর্শনের সময় তিনি সেলের টাইলস ও টয়লেটের টাইলসের রঙের (সাদার ওপর নীল ডোরাকাটা) হুবহু মিল পেয়েছেন বলেও আদালতকে জানান।

বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার উপস্থিতি

জবানবন্দিতে বিদেশি কর্মকর্তাদের আনাগোনার তথ্য উঠে আসে। ব্যারিস্টার আরমান বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা পরিদর্শনে আসতেন, যাদের পায়ে দামি জুতার শব্দ ও শরীরে দামি পারফিউমের ঘ্রাণ পাওয়া যেত।’ তিনি তাদের মধ্যে হিন্দি ভাষায় কথোপকথন শুনতে পেয়েছেন বলে দাবি করেন।

ধর্মীয় অধিকার হরণের অভিযোগ করে তিনি জানান, দীর্ঘ আট বছরে তাঁকে কোরআন শরীফ দেওয়া হয়নি। এক প্রহরী তাকে জানিয়েছিলেন, ‘র’ (ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা)-এর এক অফিসারের কারণে তাঁকে কোরআন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরবর্তীতে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে তাঁকে কোরআন দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের আগস্টের শুরুতে তাঁকে চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় দিয়াবাড়ি এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘প্রথমে ভেবেছিলাম আমাকে মেরে ফেলা হবে, তাই মৃত্যুর প্রস্তুতি হিসেবে সুরা ইয়াসিন পড়ছিলাম। পরে বাঁধন খুলে তিনি হেঁটে উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরের একটি মসজিদে ফজরের নামাজ পড়েন এবং বাবার প্রতিষ্ঠিত ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যান। সেখানে পরিচয় দেওয়ার পর ম্যানেজার তাঁকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “আমরা দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলাম এবং আমাদের ভাইকেও ফেরত পেলাম”।’

গত ২৩ ডিসেম্বর এই মামলায় ১৭ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল।

মামলার আসামিদের মধ্যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন র‍্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ারসহ ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা।

পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছেন শেখ হাসিনা, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, বেনজীর আহমেদ প্রমুখ।

আজ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এমএইচ তামিম ও শাইখ মাহদী। আসামিপক্ষ ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীরাও শুনানিতে অংশ নেন।

বিষয়:

Ad 300x250

সম্পর্কিত