leadT1ad

ধামরাইয়ে স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, সরেজমিন যা জানা গেল

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
সাভার (ঢাকা)

ধামরাইয়ের এই ঘরটিতেই অবস্থান করছিলেন ভুক্তভোগী দাবি করা ওই ‘দম্পতি’

ঢাকার ধামরাইয়ে পরিচিতের বাড়িতে বেড়াতে এসে এক নারী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন—এমন ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কয়েকটি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া খবরে বলা হয়, স্বামীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে স্ত্রীকে ধর্ষণ করে কয়েকজন। তবে সরেজমিনে অভিযোগের বিষয়ে তথ্যে গরমিল পাওয়া গেছে।

ভুক্তভোগী দাবি করা ব্যক্তিও বলছেন, ১৫ জানুয়ারি মধ্যরাতে স্ত্রীর গহনা, টাকা ও মোবাইলফোন ছিনিয়ে নিয়ে গেছে পাঁচ অজ্ঞাত ব্যক্তি। তবে ধর্ষণ বা বেঁধে রাখার মতো কিছু ঘটেনি।

ঘটনার চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন প্রতিবেশী এক নারী এবং খবর পেয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছান পরিচিতরাও। তাদের কাছেও ভুক্তভোগীরা শুধু লুটপাটের কথাই বলেছেন। সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকাদের কাছেও ধর্ষণ বা বেঁধে মারধরের বিবরণ পাওয়া যায়নি।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে খোঁজ নিয়ে স্ট্রিম জানতে পারে, গত ১৫ জানুয়ারি ধামরাইয়ের বালিয়া ইউনিয়নের রামরাবন এলাকায় শান্তি মনি দাসের বাড়িতে ঘটনাটি ঘটে। বিষয়টি ১৯ জানুয়ারি কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বলা হয়, বেড়াতে আসা স্বামীকে গাছের সঙ্গে বেঁধে মারধর করে স্ত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে। খবরে স্থানীয় ইউপি সদস্য, পুলিশ কর্মকর্তাসহ কয়েকজনের বক্তব্যও যুক্ত করা হয়। তবে ঘটনাস্থলে গিয়ে এসব বক্তব্যের গড়মিল পাওয়া যায়। এমনকি প্রায় ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগীরা কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দেননি।

ঘটনাস্থল ও এলাকাবাসীর কথা

ঘটনাস্থলটি সাটুরিয়া-কাওয়ালীপাড়া সড়ক থেকে বাম দিকে রামরাবন এলাকায়। ভুক্তভোগী দাবি করা ব্যক্তির নাম আব্দুর রাজ্জাক। তিনি তাঁর সহকর্মী, রামরাবন এলাকার বাসিন্দা কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস তাঁর বাড়ির পাশে বোনের বাড়িতে রাজ্জাক ও তাঁর কথিত স্ত্রীকে থাকতে দিয়েছিলেন।

কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের বোন স্ট্রিমকে জানান, ঘটনার বিষয়ে তিনি পরদিন জানতে পারেন।

মধ্যরাতে মারধরের শব্দ পেয়ে ঘটনাস্থলে যান পাশের বাড়ির বাসিন্দা শিল্পী মনি দাস ও তাঁর স্বামী নেপাল চন্দ্র মনি দাস। শিল্পী মনি দাস বলেন, ‘রাত ১টার দিকে হঠাৎ মারামারির শব্দ শুনি। এসে দেখি কেউ নাই। শুধু তারা দুজন ঘরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে ওই মহিলা বলেন, তাঁর কানের দুল, গহনা, টাকা ও মোবাইল নিয়ে গেছে। তবে তখন আশপাশে আর কাউকে দেখিনি। বেঁধে রাখার কোনো চিহ্নও দেখিনি। তাদের কথা অনুযায়ী, চার-পাঁচ মিনিটের মধ্যে এসব ঘটেছে।’

নিজ বাড়িতে থাকার জায়গা না থাকায় বোনে এই বাড়িতে অতিথিদের থাকতে দেন কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস। স্ট্রিম ছবি
নিজ বাড়িতে থাকার জায়গা না থাকায় বোনে এই বাড়িতে অতিথিদের থাকতে দেন কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস। স্ট্রিম ছবি

রাতেই ঘটনাস্থলে যান কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাসের চাচাতো ভাই বিকাশ চন্দ্র মনি দাস। তিনি বলেন, ‘রাত দেড়টার দিকে কৃষ্ণ দাদা আমাকে ডাক দেন। গিয়ে দেখি ওই মহিলা কান্নাকাটি করছেন। তিনি বলেন, তাঁর প্রায় ১৭-১৮ হাজার টাকা, কানের দুল, নাকফুল ও একটি চেইন নিয়ে গেছে। পরে আবার বলেন, কেউ কিছু নেয়নি, শুধু তাঁর স্বামীকে দুজন মারধর করেছে। ঘটনাস্থলে কাউকে গাছে বাঁধা বা এমন কোনো আলামত দেখিনি।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য মন্টু চন্দ্র মনি দাস বলেন, ‘আমি সকালে শুনেছি একটা লুটপাট হয়েছে। পরে এসে কাউকে পাইনি। কেউ কোনো অভিযোগ বা সহযোগিতা চায়নি। সবাই বলেছে মালপত্র নিয়েছে, আর কিছু হয়নি।’

কী ঘটেছিল সেদিন

কৃষ্ণ চন্দ্র মনি দাস জানান, ঘটনার দিন বিকেলে রাজ্জাক তাঁর স্ত্রীসহ বেড়াতে আসবেন বলে জানান। সন্ধ্যায় তারা আসেন। তাঁর বাড়িতে জায়গা না থাকায় বোনের বাড়িতে থাকতে দেন। রাত দেড়টার দিকে রাজ্জাক এসে জানান, তাদের মালামাল ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী আব্দুর রাজ্জাক স্ট্রিমকে বলেন, ‘রাত সাড়ে ১০টার দিকে এক যুবক এসে পরিচয় জানতে চান। রাত দেড়টার দিকে পাঁচজন আসেন, লাইট বন্ধ করে দেন। চারজন ঘরে ঢুকে আমার মানিব্যাগ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা নেন। আমার স্ত্রীর কাছ থেকে দুটি মোবাইল, কানের দুল, নাকফুল, স্বর্ণের চেইন ও প্রায় ১৭ হাজার টাকা নিয়ে যান। আমাকে মারধর করে। পাঁচ মিনিটের মতো সময় নিয়ে চলে যায়।’

ধর্ষণ বা বেঁধে রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, এমন কিছু ঘটেনি। তবে তাঁর স্ত্রী পরিচয় দেওয়া নারীর সঙ্গে কথা বলিয়ে দিতে রাজি হননি আব্দুর রাজ্জাক।

রাজ্জাকের স্ত্রী ভুক্তভোগী নারী নন, খোঁজ মেলেনি সেই নারীর

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) দুপুরে বক্তব্য নেওয়ার পরপরই আব্দুর রাজ্জাক তাঁর নম্বর বন্ধ করে দেন। ওই নারীর বিষয়েও কোনো তথ্য দেননি।

এই বিষয়ে খোঁজ নিতে তাঁর কর্মস্থল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডে (এনডিই) গিয়ে জানা যায়, ঘটনার পর থেকে কর্মস্থলে অনুপস্থিত আব্দুর রাজ্জাক। এনডিই এর স্টোর ইনচার্জ অশীষ কুমার জানান, ওই ঘটনার পর থেকে অফিসে আসছেন না আব্দুর রাজ্জাক। তার ফোনও বন্ধ। সবশেষ পারিবারিক সমস্যার কারণে তিনি কাজে আসছেন না বলে জানিয়েছেন।

এদিকে, কর্মস্থল থেকে পাওয়া তাঁর ঠিকানার সূত্র ধরে মানিকগঞ্জের শিবালয়ের তেওতা এলাকার গ্রামের বাড়ির খোঁজ পাওয়া যায়। পরে স্থানীয় ইউপি সদস্যের মাধ্যমে রাজ্জাকের স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন তিনি ধামরাইয়ের রামরাবন গ্রামে যাননি।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ। স্ট্রিম ছবি
ঘটনাস্থল পরিদর্শনে পুলিশ। স্ট্রিম ছবি

পুলিশ যা বলছে

মঙ্গলবার দুপুরের দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান ধামরাই থানার ওসি নাজমুল হুদা খান ও পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শহীদুল ইসলাম। ওসি নাজমুল স্ট্রিমকে বলেন, সংবাদমাধ্যম ও সূত্রে পাওয়া খবর থেকে আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসেছি। পরিদর্শনের সময় এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছি ও জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী বলা যায়, এখানে পালাক্রমে ধর্ষণ বা কোনো নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

তিনি বলেন, এই ঘটনায় কেউ অভিযোগ করতে চাইলে আইনগত সহযোগিতা করা হবে। তবে স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে ধর্ষণ বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইউপি সদস্যের কাছেও বিচারপ্রার্থী হিসেবে কেউ কোনো অভিযোগ জানায়নি। কোনো লোককে বাধা দিয়ে বা অস্ত্রের মুখে ভয় দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।

এদিকে, সংবাদমাধ্যমে উল্লেখিত ‘এসআই হারাধন’ নামে কোনো পুলিশ কর্মকর্তা ধামরাই থানায় কর্মরত থাকার তথ্য পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে ‘আরাধন চন্দ্র সাহা’ নামে একজনকে। তবে তিনি সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত