leadT1ad

দেশের কৃষিতে প্রথমবার স্বয়ংক্রিয় সেচ প্রযুক্তি, কমাবে শ্রম ও পানির অপচয়

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
পাবনা

পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক ‘সেন্টার-পিভট’ সেচ ব্যবস্থা

বাংলাদেশে শীতকালীন ফসল চাষে দীর্ঘদিনের চেনা ছবি নালা কেটে জমিতে পানি ঢেলে দেওয়া বা ‘প্লাবন সেচ’। এই পদ্ধতিতে যেমন বিপুল পরিমাণ পানির অপচয় হয়, তেমনি গম, পেঁয়াজ বা আখের মতো সংবেদনশীল ফসলের গোড়ায় পানি জমে মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। এই বাস্তবতায় দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)।

সম্প্রতি পাবনার ঈশ্বরদী ও নাটোরের ভবানীপুরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের কৃষি খামারে দেশে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক ‘সেন্টার-পিভট’ সেচ ব্যবস্থা। বিএডিসি বলছে, স্বয়ংক্রিয় এই প্রযুক্তির মাধ্যমে নামমাত্র শ্রমে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কয়েকশ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে।

ইউরোপসহ উন্নত বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত এই প্রযুক্তিতে টাওয়ারের মতো দেখতে একটি দীর্ঘ চাকাযুক্ত পাইপের কাঠামো কেন্দ্রীয় একটি অক্ষকে ঘিরে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। পাইপের গায়ে বসানো স্প্রিংকলার থেকে ফসলের ওপর বৃষ্টির মতো সমানভাবে পানি ছেটানো হয়। এতে একদিকে যেমন মাটির আর্দ্রতা ঠিক থাকে, অন্যদিকে পানির অপচয়ও কমে যায়।

বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, পাবনার ঈশ্বরদীর মুলাডুলি কৃষি খামারে প্রায় ৪০০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য ছয় স্প্যানবিশিষ্ট একটি সেন্টার-পিভট সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। আরেকটি বসানো হয়েছে নাটোরের ভবানীপুর আখ খামারে। সরকারি অর্থায়নে অস্ট্রিয়ান প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। অস্ট্রিয়ান প্রকৌশলীরা ইতোমধ্যে বিএডিসির কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

অত্যাধুনিক ‘সেন্টার-পিভট’ সেচ ব্যবস্থা
অত্যাধুনিক ‘সেন্টার-পিভট’ সেচ ব্যবস্থা

পাবনা বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, ধান চাষে প্লাবন সেচ প্রয়োজন হলেও পেঁয়াজ বা গমের মতো ফসলে বৃষ্টির মতো হালকা সেচ দরকার হয়। সেন্টার-পিভট সিস্টেমের মাধ্যমে মাটির প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত সেচ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এটি একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, যেখানে জলাবদ্ধতার ঝামেলাও নেই।

তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক পরীক্ষায় এর কার্যকারিতা দেখে তাঁরা খুবই সন্তুষ্ট। প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু হলে এই অঞ্চলের কৃষির চিত্র বদলে যাবে। কম খরচে ও অল্প শ্রমে বেশি জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হবে। উঁচু-নিচু জমিতেও সমানভাবে পানি সরবরাহ করে ফসল উৎপাদন বাড়ানো যাবে।

বিএডিসি পাবনার সহকারী প্রকৌশলী আফনান আজম রুদ্র জানান, প্রথাগত পদ্ধতির তুলনায় এই প্রযুক্তিতে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ কম পানি লাগে। এক বিঘা গমের জমিতে যেখানে ১ থেকে ২ লাখ লিটার পানি লাগত, সেখানে এই পদ্ধতিতে প্রয়োজন হয় মাত্র ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার লিটার।

বিএডিসি বলছে, এই প্রযুক্তি কমাবে শ্রম ও পানির অপচয়
বিএডিসি বলছে, এই প্রযুক্তি কমাবে শ্রম ও পানির অপচয়

মুলাডুলি আখ খামারের ইনচার্জ আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘এই যন্ত্রটির স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আমাদের সেচ পদ্ধতির ধারণাই বদলে দিয়েছে। আমাদের ১৫০ একরের একটি প্লটে যন্ত্রটি বসানো হয়েছে। আগে এই পরিমাণ জমি সেচ দিতে ৯০ জন শ্রমিকের ২৫ থেকে ৩০ দিন সময় লাগত। এখন কোনো অতিরিক্ত শ্রমিক ছাড়াই একজন কর্মীর মাধ্যমে মাত্র ৫ থেকে ৭ দিনে কাজ শেষ করা যাচ্ছে।’ পানির সুষম ব্যবহারে আখের উৎপাদন একরপ্রতি ১৫-১৭ টন থেকে বেড়ে ২৭–৩০ টনে উন্নীত হতে পারে বলেও ধারণা তাদের।

স্থানীয় কৃষকরাও এই উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। বহরপুর গ্রামের পেঁয়াজচাষী মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, ‘পেঁয়াজ ক্ষেত জমে থাকা পানি সহ্য করতে পারে না। এই প্রযুক্তি আমাদের জন্য আশীর্বাদ, কারণ এতে চারাগাছের ক্ষতি না করে ওপর থেকে পানি দেওয়া যায়। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বিরান জমি ও সবজি ক্ষেতে উৎপাদন বাড়াতে এ পদ্ধতি খুবই কার্যকর।’

বিএডিসি জানিয়েছে, বর্তমানে যন্ত্রটির চূড়ান্ত বিদ্যুৎ সংযোগের কাজ শেষ হয়েছে। চলতি মাসের শেষ নাগাদ এটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের কথা রয়েছে। পরীক্ষামূলক এই প্রকল্প সফল হলে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এই প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পথ খুলে যাবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত