সৃষ্টির শুরু থেকেই ‘নারী’ শব্দটি সংবেদনশীল। নারীর কর্ম, পাপ, পুণ্য পরিমাপের জন্য থাকে বিচিত্র সব মাপকাঠি যা অভিহিত করা যায় ‘নারীভাবনা’ অভিধায়। নারীকে নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হয়, পুরুষ ভাবে, ভাবে নারী নিজেও; সমাজ তাদেরকে প্রভাবিত করে সেই ভাবনাটা কেমন হতে পারে তার ডায়াগ্রাম দিয়ে। একেকটা যুগের আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে নারী অবস্থানগত উন্নয়ন ও অবনয়ন। ভারতবর্ষী নারীদের একান্তই স্বতন্ত্র হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথ-পরিক্রমা নিয়ে রয়েছে বহুরৈখিক সংগ্রামের ইতিহাস, যার গুরুত্বপূর্ণ অংশী হিসেবে মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রসঙ্গও আসে।
বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তার জগতে এক অভাবনীয় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল মুসলিম সাহিত্য সমাজের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’। ১৯২৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একঝাঁক প্রগতিশীল তরুণ শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিকের হাত ধরে যে চিন্তার সংস্কার শুরু হয়েছিল তার সর্বজনীন কল্যাণকামী ভাষ্য ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’ এবং এই ভাষ্যের মুখপাত্র ছিল কল্লোল যুগের সমসাময়িক শিখা পত্রিকা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল হুসেন, আবুল ফজল, আবদুল কাদির, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, কাজী আনোয়ারুল কাদির, মোতাহের হোসেন চৌধুরী মতো অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল চেতনার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিবর্গ ছিলেন মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব।
এই সংগঠনের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে প্রথমে বাংলার, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রেনেসাঁ বলেও চিহ্নিত করা হয় যার সঙ্গে সাদৃশ্য চলে গত শতাব্দীর ডিরোজিও ও তাঁর ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর নবজাগরণের সঙ্গে। বলা হয়, 'But while much has been written about Derozio and his Hindu School pupils who were known collectively as 'Young Bengal', the Sikha movement still waits for its historian. (A new Renaissance and Allied Essays, Calcutta, 1998; PP 82-83). ডিরোজিও এবং তাঁর তরুণ দ্রোহী ছাত্রদল প্রথাগত আচার সর্বস্ব সনাতনী হিন্দু সমাজ দ্বারা যেমন সমালোচনার শিকার হয়েছিল মুসলিম সাহিত্য সমাজের উদারনৈতিক মতবাদ ও ক্রিয়াসমূহও ঢাকার আশরাফতন্ত্রী আলেম, নবাব পরিবার এবং কলকাতার ‘মোহাম্মদী গোষ্ঠী’দের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল। ইয়ং বেঙ্গল ও মুসলিম সাহিত্য সমাজের সভ্যগণের বৌদ্ধিক লক্ষ্য ছিল সমাজে নারীর দৃশ্যমান সামাজিক অবস্থা পরিবর্তন। ইয়াং বেঙ্গলদের মুখপত্র ‘এনকোয়াইরার’ (Enquirer) পত্রিকায় নারীশিক্ষা ও স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে বলা হয়েছিল:
'He who is in the habit of undervaluing the females and regards them as an inferior race of beings, must be a person of no education or very little reading.' অনুরূপ শিখা পত্রিকার আশ্রয়ে প্রগতিশীল মুসলিম সাহিত্য সমাজও অনবরত লিখে গেছে, ‘অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অশিক্ষা ও প্রথার অন্ধকারে বন্দি রেখে কোনো জাতির পক্ষে প্রকৃত মুক্তি বা রেনেসাঁ সম্ভব নয়।’ সেসময় বাংলায় নর-নারীর মধ্যে কেবল একটা অংশকে শিক্ষার আলোর বাইরে রাখায় তৎপর ছিল তথাকথিত সমাজের নীতিনির্ধারকগণ। সে প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও মুসলিম সাহিত্য সমাজের পণ্ডিত বিদ্বৎজনেরা ছিলেন নারী শিক্ষার পক্ষে এবং অবরোধ প্রথার বিরুদ্ধে। আর এ থাকাটা এতটাই যৌক্তিক ছিল যে সকল সময়ের প্রেক্ষাপটে এর বিপক্ষে যুক্তি থাকা উচিত নয়। পুরো উনিশ শতক থেকে বিশ শতকের শুরু; বাঙালি মুসলমান নারীর যে পরিস্থিতি দৃশ্যমান ছিল তা পুরো মাত্রায় অস্বস্তিদায়ক বলা যায়। শুধু নারী কেন পুরো সমাজেরই একই রূপ। কাজী মোতাহার হোসেন তৎকালীন সমাজের এক স্থবির চিত্র অঙ্কন করে লিখেছিলেন:
‘মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এককথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনো সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষেরা কেবল কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে; মেয়েরা কেবল রাঁধবে, বাড়বে, আর বসে বসে স্বামীর পা টিপে দিবে; তাছাড়া খেলাধুলা, হাসি-তামাসা বা কোনও প্রকার আনন্দ তারা করবে না। সব সময় আদব-কায়দা নিয়ে দুরস্ত হয়ে থাকবে।’
এই শ্লেষাত্মক বর্ণনায় তিনি স্পষ্ট দেখাতে চেয়েছেন যে, সমাজ নারীকে কেবল একজন ‘গৃহপরিচারিকা’ বা ‘সেবিকা’ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত। নারীর নিজস্ব কোনো শখ, খেলাধুলা বা শিল্পচর্চার অধিকার কেবল উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন মাত্র। মুসলিম সাহিত্য সমাজ এই দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন চেয়েছে। তাঁরা চেয়েছিলেন নারী কেবল রাঁধা-বাড়া বা পা টেপার যন্ত্র হয়ে না থাকুক, বরং একজন সৃজনশীল ও আনন্দময় মানুষ হিসেবে ঘরে ও বাইরে সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত হোক। বর্তমানে নারীরা আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও অনেক পরিবারে আজও নারীকে কেবল ‘সেবিকা’ হিসেবে দেখার মানসিকতা রয়ে গেছে। নারীর সৃজনশীলতা বা ললিতকলায় অংশগ্রহণের অধিকার নিয়ে এখনও নানা সামাজিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামি কাজ করে। বিশেষত, কর্মজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী নারীদের ‘সংসারবিমুখ’ ‘ডিভোর্সপ্রবণ’ ভাবাটা ট্রেন্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। কার্যত এ কারণেই এ সময়ের নারীদের অগ্রগতির জন্যও মুসলিম সাহিত্য সমাজ প্রত্যাশিত ‘আনন্দময় মুসলমান গৃহ’-একান্ত আবশ্যক।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ও ‘বুদ্ধির মুক্তি’ আন্দোলনের প্রধান পুরুষ কাজী আবদুল ওদুদের সাহিত্য-ভাবনার মূলে যে মানুষের চিত্তকে অন্ধ সংস্কার ও কূপমণ্ডূকতা থেকে মুক্ত করার প্রয়াস ছিল তার মধ্যে নারীভাবনা ছিল মানবতাবাদ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, সমাজ-জীবন ও সাহিত্যের বিকাশ তখনই সম্ভব যখন মানুষ তার যুগ-সঞ্চিত জড়তা কাটিয়ে উঠতে পারবে। তৎকালীন রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে অবরোধপ্রথা ও নারীশিক্ষার অনগ্রসরতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট; তিনি মনে করতেন, সমাজ ও জাতির মগ্নচৈতন্যের রস জোগাতে হলে নারীকে অসূর্যম্পশ্যা রাখা চলবে না। ওদুদ সাহিত্যে তথাকথিত নীতি-রুচির বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধী ছিলেন এবং তরুণ প্রজন্মের ফ্রয়েডীয় যৌনতা বা আধুনিক জীবনবোধের চর্চাকে সহনশীলভাবে গ্রহণ করেছিলেন, যা পরোক্ষভাবে নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও মানবিক অধিকারকেই স্বীকৃতি দেয়।
মুসলিম সাহিত্য সমাজে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে আবুল ফজলের মনোভাবও ছিল নারীমুক্তি ও প্রগতির পক্ষে। তিনি ধর্মীয় গোড়ামি, পর্দা প্রথা ও কুসংস্কারের কারণে মুসলিম নারীদের দুর্দশা তুলে ধরেছেন এবং আবশ্যক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন নারীদের শিক্ষা ও তাদের আত্মিক জাগরণ। ‘শিখা’ পত্রিকার মাধ্যমে তিনি মুসলিম সমাজের প্রগতির ধারায়, জ্ঞান ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় নারীদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের মূল হোতা এবং ‘শিখা’ গোষ্ঠীর প্রাণপুরুষ আবুল হোসেনের নারীভাবনা ছিল সমাজ পরিবর্তনের এক বৈপ্লবিক আকাঙ্ক্ষা। বিশ থেকে চল্লিশের দশক পর্যন্ত তাঁর একক, গোষ্ঠীগত লিখন ও বক্তৃতার প্রধান লক্ষ্য ছিল বাঙালি মুসলমান সমাজকে ধর্মীয় কুসংস্কার ও জড়তা থেকে মুক্ত করা। তিনি বিশ্বাস করতেন, বুদ্ধির মুক্তি ও শিক্ষার আলো ছাড়া সমাজকে ‘নিজ বলে বলীয়ান’ করা সম্ভব নয়, আর এই মুক্তির জন্য নারীর অবরোধ প্রথা ভেঙে তাকে শিক্ষার মূলধারায় নিয়ে আসা সমাজের জন্য অপরিহার্য। আবুল হোসেনের এই প্রগতিশীল ভাবান্দোলন কেবল নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং সমাজের অর্ধেক অংশকে অন্ধকারমুক্ত করার মাধ্যমে একটি বৃহত্তর জাতিসত্তা গঠনের পথ প্রশস্ত করেছিল। অনেক বুদ্ধিজীবীর মতে, তাঁর এই সুদূরপ্রসারী নারী জাগরণ ও প্রগতিশীল চিন্তা পরবর্তীকালে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের মতো জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে যেখানে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি বহুভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কেবল নারীশিক্ষার তাত্ত্বিক সমর্থকই ছিলেন তা নয়, বরং তাঁর কর্মকাণ্ডে প্রগতিশীল ও সাহসী পদক্ষেপের প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি সেসময়ের কঠোর রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজ কন্যাদের বেশিদূর পড়াতে না পারলেও নারীর প্রগতিশীল সত্তার বিকাশে তিনি সহায়ক ছিলেন। বেগম সুফিয়া কামাল ও শামসুন্নাহার মাহমুদের মতো নারী জাগরণের অগ্রদূতদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা এবং ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষায় নিরন্তর উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, গভীর ধর্মীয় নিষ্ঠার সঙ্গে প্রগতিশীল জীবনবোধের কোনো বিরোধ নেই। তাঁর নাতনি শান্তা মারিয়া ভয়েস অব আমেরিকায় এক সাক্ষাৎকারে তার দাদা ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সম্পর্কে বলেন, ‘বিগত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে যখন সারা তৈফুরসহ প্রগতিশীল নারীরা পৃথক ঈদের জামাত করতে চাইলেন, তখন ইমাম খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। মেয়েরা প্রকাশ্যে নামাজ পড়বে, সেটার ইমামতি কেউ করতে চাইছিল না। সেই প্রতিক্রিয়াশীল সমাজে আমার দাদা খুব সাহসের সঙ্গে নারীদের জামাতে অংশ নিলেন।’
পারিবারিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও নারীশিক্ষা ও সামাজিক আন্দোলনে তাঁর এইরূপ সক্রিয় অংশগ্রহণ মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা বৃহত্তর বাঙালি মুসলিম মানসে নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এক তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সদস্যরা কেবল তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং তাঁরা নারী স্বাধীনতার স্বপক্ষে রাজপথেও সোচ্চার ছিলেন। তাঁরা অনুভব করেছিলেন নারীমুক্তি কেবল নারীর ব্যক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং পুরো সমাজের পঙ্গুত্ব ঘোচানোর একমাত্র উপায়। তাঁরা বিশ্বাস করতেন একটি শ্রেষ্ঠ সমাজব্যবস্থা তখনই গড়ে উঠবে যখন প্রতিটি নারী ও পুরুষ নিজের স্বকীয়তা বিকাশের স্বাধীনতা পাবেন এবং সেই স্বকীয়তা দিয়ে সমাজকে সমৃদ্ধ করবেন।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের আদর্শে যে সকল নারীর অগ্রগতি হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ফজিলাতুন্নেসা জোহা এক অনন্য নাম। ১৯২৭-২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী হিসেবে তিনি যখন শাড়ি পরে ক্লাস করতে আসতেন, তখন তাঁকে প্রায়ই ইট-পাটকেলের আঘাতে হেনস্তার শিকার হতে হতো। তবে প্রতিকূলতার মুখেও তিনি দমে যাননি। তিনি মনে করতেন, ইসলাম নারীকে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দেয় এবং তাকে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি রাখতে বলে না। বরং ধর্মের দোহাই দিয়ে যে অবরোধ প্রথা প্রচলিত ছিল, তাকে তিনি নারীদের সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় মনে করতেন।
তিনি লিখেছিলেন:
'Islam does not direct women to stay cocooned. It rather directs women to acquire knowledge. The system of purdah under false pretension of religion is the best of the worst weapons to kill women. It is a strong deterrent against women's enlightenment and employment. Such social blockades and lack of education are pushing the women to the doorway of death.' ফজিলাতুন্নেসা যখন গণিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন, তখন ‘এন্টি পর্দা লিগ’-এর আয়োজনে শিখা গোষ্ঠীর সদস্যরা তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেন। এটি ছিল বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের এক বিশাল নৈতিক জয়।
ফজিলাতুন্নেসা জোহার পাশাপাশি বেগম রোকেয়া, রাজিয়া খাতুন চৌধুরানী এবং শামসুন্নাহার মাহমুদের মতো নারীরাও এই চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন। যদিও বেগম রোকেয়া সরাসরি মুসলিম সাহিত্য সমাজ-এর মূল নেতৃত্বের অংশ ছিলেন না, কিন্তু তাঁর নারীশিক্ষা, নারীমুক্তির মতো কর্মধারা এই ধরনের সংগঠনের মূল লক্ষ্য যেমন মুসলিম সমাজে নবজাগরণ, আধুনিকীকরণের সঙ্গে অঙ্গীভূত ছিল, এবং তাঁর লেখালেখি ও কর্মপন্থা সেই সময়ের প্রগতিশীল মুসলিম লেখকদেরও অনুপ্রাণিত ও প্রভাবিত করেছিল। বেগম রোকেয়া নারী-মুক্তির দার্শনিক মেরি ওলস্টোনক্র্যাফটের লেখা আ ভিনডিকেশন অব দ্য রাইটস অব উইমেন এবং জন স্টুয়ার্ট মিলের যুগান্তকারী গ্রন্থ দ্য সাবজেকশন অব উইমেন পড়েছিলেন এবং তাঁর নিজের চিন্তাকে প্রসারিত করতে এই বইগুলোর মতকে সানন্দে গ্রহণও করেছিলেন। ফলে তিনি বুঝেছিলেন নারী তথাকথিত ‘প্রাকৃতিক দুর্বলতা’, ‘কমনীয়তা’ ‘রূপচর্চা’ ইত্যাদি থেকে বেরিয়ে পুরুষের মতো যোগ্যতা অর্জন না করতে পারলে মুক্তি অসম্ভব। মূলত এই বৈশ্বিক চেতনার সঙ্গে নারীর ভাবনার সংযোগের বিষয়টিও মুসলিম সাহিত্য সমাজের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের ধারাবাহিক সফলতার ফসল।
রাজিয়া খাতুন চৌধুরানী মুসলিম সাহিত্য সমাজের আনুষ্ঠানিক সদস্য নন, কিন্তু তাঁর সাহিত্য সাধনা ও নারী জাগরণের প্রয়াস সেই সময়ের প্রগতিশীল মুসলিম নারী আন্দোলনেরই প্রতিফলন ঘটাত, যা মুসলিম সাহিত্য সমাজের লক্ষ্য ও আদর্শের পরিপূরক ছিল। স্বামী সৈয়দ নেহাল হোসেনের মুসলিম সাহিত্য সমাজের সঙ্গে সংযোগ থাকার সুবাদে সুফিয়া কামালের মধ্যেও গড়ে উঠছিল প্রগতিশীল চেতনা। মুসলিম নারী সমাজের প্রগতি ও মুক্তির পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি, বিশেষত বেগম রোকেয়ার সংগঠনে যুক্ত থেকে। এ প্রসঙ্গে আরও একটি নাম না বললেই নয়। তিনি উপমহাদেশের নারী সাংবাদিকতার অগ্রদূত এবং সাহিত্যিক হিসেবে সুপরিচিত নূরজাহান বেগম। তিনি সওগাত পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ নাসিরুদ্দিনের কন্যা বেগম পত্রিকার সম্পাদক। তিনি বাংলাদেশের হাজার হাজার গৃহবধুদের মধ্যে লেখক, কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী তৈরি করেছেন। সাহস যুগিয়েছেন, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছেন। যেখানে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ ছিল পুরুষকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন, সেখানে নূরজাহান বেগম নারীদের নিয়ে কাজ করার মাধ্যমে সেই ধারাকে আরো প্রসারিত ও সার্থক রূপ দিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৌদ্ধিক চর্যায় নারীর অন্তর্ভুক্তি যেহেতু একদিনে হয়নি তাই তাদের ভাবনা ও প্রগতিশীলচেতনা প্রসারিত হওয়ার নেপথ্যে মুসলিম সাহিত্য সমাজের পথ প্রদর্শকের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।
সবশেষে বলা যায়, নারীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ছাড়া সমাজ পূর্ণতা পায় না। সমাজকে ‘পঙ্গু’ অবস্থা থেকে মুক্ত করার প্রয়াসে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ যে আরও জোরালো করা প্রয়োজন- এই মন্ত্রই মুসলিম সাহিত্য সমাজকে শতবর্ষ অতিক্রমেও প্রাসঙ্গিক করে রেখেছে। তাই একশ বছর আগে জ্বালানো সেই ‘শিখা’ আজ প্রতিটি নর-নারী অন্তরে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন, যাতে মুক্তবুদ্ধি আর যুক্তির শক্তিতেই গড়ে ওঠে আগামীর সাম্যবাদী ও আধুনিক বাঙালি সমাজ।
লেখক: হুমায়ূন গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়