leadT1ad

১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য

প্রার্থীরা ‘অবরুদ্ধ’, ৫ আসনে সমঝোতার বাইরে জামায়াত

স্ট্রিম গ্রাফিক

মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) । ওই দিন নির্বাচনে জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করতে যাওয়া দলগুলো শরিকদের জন্য আসন ছেড়ে দিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছে। তবে সমঝোতা অনুযায়ী ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বৃহৎ শরিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাঁচটি আসনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেনি। এসব আসনে জামায়াত প্রার্থীদের ‘অবরুদ্ধ’ করে রাখেন নেতাকর্মীরা।

আলোচনা চলছে, মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে না দেওয়া তৃণমূল জামায়াতের অসন্তোষ নাকি প্রার্থীদের কৌশল, আসনগুলোতে জোট শরিকদের জামায়াতের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হবে কিনা। তবে যে আসনগুলোতে জামায়াতের প্রার্থীরা ‘অবরুদ্ধ’ থাকায় মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে পারেননি, সেখানকার স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত কম পরিচিত প্রার্থীদের জোটের পক্ষ থেকে মনোনয়ন দেওয়ায় জামায়াতের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ক্ষুব্ধ। এ কারণে জোটের সিদ্ধান্তের পরেও তারা জামায়াত মনোনীত প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে দেননি।

আসনগুলোর মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী সুনামগঞ্জ-১ আসনে এককভাবে নির্বাচন করার কথা নেজামে ইসলাম পার্টির সহকারী সচিব মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক তালুকদারের, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নারায়ণগঞ্জ জেলার সহ-সাধারণ সম্পাদক মাওলানা শাহজাহান শিবলীর, নরসিংদী-২ আসনে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারের, মৌলভীবাজার-৩ আসনে খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা আহমদ বিলালের আর চট্টগ্রাম-৮ আসনে এনসিপির প্রার্থী মো. জোবাইরুল হাসানের। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে এসব আসন ছেড়ে দেওয়ার কথা জোট শরিকদের।

‘অবরুদ্ধ’ জামায়াত প্রার্থীরা

১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমঝোতা অনুযায়ী সুনামগঞ্জ-১ আসনটি (ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ ও মধ্যনগর) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে নেজামে ইসলামকে। হাওরবেষ্ঠিত এ আসনে প্রার্থী হয়েছেন দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সচিব মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক তালুকদার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় নেতা হলেও মুজ্জাম্মিল হকের তেমন একটা পরিচিত নেই।

বিপরীতে এ আসনে জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই ব্যাপক প্রচারণার কারণে পরিচিত হয়ে ওঠেছেন জামায়াতের জেলা আমির তোফায়েল আহমদ খান। বিএনপি প্রার্থীর বিপরীতে তাঁকে বিকল্পহীন মনে করে তৃণমূল জামায়াত। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কেন্দ্র থেকে আসনটি নেজামে ইসলামকে দেওয়ার সিদ্ধান্তটি তারা মানতে পারছেন না।

এ কারণে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন গতকাল মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) বেলা তিনটা থেকে বিকেল সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত তোফায়েল আহমদ খান, জেলা শাখার নায়েবে আমির মোমতাজুল হাসান আবেদ, জেলা সেক্রেটারি মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, অফিস সম্পাদক মো. নুরুল ইসলাম, পৌর জামায়াতের আমির আবদুস সাত্তার মো. মামুনকে দলটির জেলা কার্যালয়ে কর্মী–সমর্থকরা অবরুদ্ধ করে রাখেন। ফলে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা তোফায়েল আহমদ খান মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে পারেননি।

তোফায়েল আহমদ খানের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে না পারা প্রার্থীর কৌশল নাকি তৃণমূল জামায়াতের অসন্তোষ থেকে জানতে চাইলে স্থানীয় সাংবাদিক আহমদ জাকারিয়া স্ট্রিমকে জানান, পেশাগত কারণে তিনি দীর্ঘদিন ধরে জেলার রাজনৈতিক হালচাল পর্যবেক্ষণ করছেন। ১০ দলীয় জোট যাঁকে সুনামগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী করেছে তাঁর নাম স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীরা এক সপ্তাহ আগেও শোনেননি। বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে জনসংযোগ করে নিজেকে পরিচিত করে তুলেছেন। মূলত এ কারণেই জামায়াতসহ ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীরা তোফায়েল আহমদকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে দেননি।

জামায়াত প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে না দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে নরসিংদী-২ (পলাশ) আসনেও। সমঝোতা অনুযায়ী এ আসনটি দেওয়া হয়েছে এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষারকে। তবে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে জামায়াত প্রার্থী মাওলানা আমজাদ হোসাইনকে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত তাঁর বাসায় অবরুদ্ধ করে রাখেন দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা। এ সময় সারোয়ার তুষারের বিরুদ্ধে তাঁদের স্লোগান দিতেও শোনা যায়।

জানতে চাইলে নরসিংদী-২ আসনের অন্তর্গত পাঁচদোনা ইউনিয়ন জামায়াতের বায়তুল-মাল সম্পাদক লিটন মিয়া স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের নেতা আমজাদ হোসাইন মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। তিনি যেন মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে না পারেন, সে জন্য জনগণ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে ওনাকে আটকে রেখেছিল। জনগণ মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে দেয়নি, কারণ জনগণ আমজাদ ভাইকে চায়।’

একইভাবে 'অবরুদ্ধ' হন মৌলভীবাজার-৩ আসনের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী আব্দুল মন্নান ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী প্রিন্সিপাল ড. ইকবাল হোসাইন ভূঁইয়া।

মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবু নাছেরও। তবে ওই দিন রাত ১০টায় এ আসনের জোট মনোনীত এনসিপির প্রার্থী মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ সংবাদ সম্মেলনের করে জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ করেন। এরপর বুধবার (২১ জানুয়ারি) আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন আবু নাছের।

তবে নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ থাকে না। ব্যালটে প্রার্থীর নাম ও বরাদ্দ মার্কা থেকেই যায়।

যা বলছে জামায়াত ও শরিকরা

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মঙ্গলবার এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার স্ট্রিমকে বলেন, ‘জামায়াত প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন নাই। আমি জানি না এখন কী হবে, আমার কাছে কোন উত্তর নেই। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে এটার উত্তর জানতে চাইব।’

অন্যদিকে যোগাযোগ করা হলে মঙ্গলবার জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্ট্রিমকে বলেন, ‘মনোনয়ন প্রত্যাহার হয়নি সুতরাং দুজন উন্মুক্ত থাকল, দুজনই নির্বাচন করবেন। আজকে যেহেতু মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ছিল, ওই হিসেবে সব দলই লিয়াজোঁ করেছে কারা থাকবে আর কারা থাকবে না। এ ছাড়া কোথায় ওপেন থাকবে, সেসব নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ঢাকা থেকে দূরে থাকায় শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে, আমার জানা নাই।'

জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে জামায়াতের যে প্রার্থীরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে চাইলে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘ব্যবস্থা নেওয়ার তো কিছু নেই!’

যোগাযোগ করা হলে নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার স্ট্রিমকে বলেন, ‘সুনামগঞ্জ-১ আসনটি জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমাদেরকে দেওয়া হয়েছে। আসনটি ছাড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই আমাদের। জামায়াতের প্রার্থী প্রত্যাহার না করার ব্যাপারে দলটির কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নেবে।’

মুসা বিন ইযহার জানান, এই ধরনের ব্যাপারগুলোতে দলগুলো কেন্দ্র থেকে ব্যবস্থা নেবে বলে আগে থেকেই জোটের সিদ্ধান্ত রয়েছে। তারপরেও নতুন করে জটিলতা তৈরি হওয়ায় শীঘ্রই শীর্ষ নেতাদের নিয়ে ১০ দলের বৈঠক হবে বলে জানান তিনি।

দুই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেনি এনসিপি

অন্যদিকে জোটের দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর আসনে মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রার্থীরাও। শরীয়তপুর-১ ও শেরপুর-১ আসনে জোটের পক্ষ থেকে নির্বাচন করার কথা যথাক্রমে মাওলানা মামুনুল হকের দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি রাশেদুল ইসলাম রাশেদের। কিন্তু আসন দুটিতে এনসিপির প্রার্থী যথাক্রমে আব্দুর রহমান ও লিখন মিয়া মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি।

এই দুই প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার না করার কারণ জানতে চাইলে এনসিপির নির্বাচনী মিডিয়া উপকমিটির প্রধান মাহবুব আলম স্ট্রিমকে বলেন, ‘এনসিপির ৩০টির বাইরে দুটি আসনে প্রার্থীতা প্রত্যাহার হয়নি। এর মধ্যে শরীয়তপুর-১ ও শেরপুর-১ আসন রয়েছে। ওই দুই প্রার্থী সময়ের আগে পৌঁছাতে পারেননি দেখে প্রত্যাহারও করতে পারেনি। আমরা পরবর্তী করণীয় নিয়ে ভাবছি।’

অন্যদিকে এনসিপির দুই আসনে জামায়াতের প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহার না করার কারণ জানতে চাইলে মাহবুব আলম বলেন, ‘এনসিপির দুইটি আসনে জামায়াত প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেনি। আসন দুটি হচ্ছে চট্টগ্রাম-৮ ও নরসিংদী-২। বিষয়টি সমাধান করার জন্য এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলেছেন। জামায়াত বলেছে, তাদের দিক থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নিবে। পাশাপাশি আইনি দিকগুলোও তারা খতিয়ে দেখছে।’

দুই উন্মুক্ত আসনে রিকশার সঙ্গে শাপলাকলির লড়াই

এনসিপি ৩০ আসনে তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে মঙ্গলবার। এর মধ্যে দুটি আসন শরিকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। মৌলভীবাজার-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে বিএনপি জোটের সঙ্গে এনসিপিকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীর বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হবে।

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় রিকশা প্রতীকের চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। দলটির প্রচার সম্পাদক ও মিডিয়া সমন্বয়ক হাসান জুনাইদ সন্ধ্যায় সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, মৌলভীবাজার-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। দুই দলের প্রার্থীই এই দুই আসনে লড়াই করবেন।

হাসান জুনাইদ জানান, ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের সমঝোতা অনুযায়ী রিকশা প্রতীকের ২৯ প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৩টি আসনে রিকশার প্রার্থীরা এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। জোট শরিকদের জন্য উন্মুক্ত আরও ৬টি আসনে রিকশার ৬ জন প্রার্থী নির্বাচন করবেন। এই ৬ আসনের মধ্যে সুনামগঞ্জ–৩ ও কিশোরগঞ্জ–১ আসনে খেলাফত মজলিস, মৌলভীবাজার–৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ফেনী–২ আসনে এবি পার্টি এবং ফরিদপুর–৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে উন্মুক্ত ভিত্তিতে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা রিকশা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন।

Ad 300x250

সম্পর্কিত