মৌলভীবাজারে কমছে পানি, দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যার ক্ষত

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
মৌলভীবাজার

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৮: ৫৮
মৌলভীবাজারে বন্যার পানি নামতে শুরু করেছে। সংগৃহীত ছবি

মৌলভীবাজারে মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাবে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে।

জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বৃহস্পতিবার মনু ও ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের কয়েকটি অংশ ভেঙে জেলা সদর, রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া উপজেলার ২৮টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রায় দুই হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিলেও অধিকাংশ মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে মানবেতর জীবনযাপন করেছেন।

শনিবার থেকে বন্যার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, রাজনগর উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর রোপা আমন এবং কমলগঞ্জ উপজেলায় ৮৩ হেক্টর আমনের বীজতলা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া শত শত হেক্টর জমির সবজি, পানের বরজ, পেঁপেবাগান, মাছের ঘের ও পুকুরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সরেজমিনে রাজনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কয়েক দিন আগেও যেসব জমিতে সবুজ ধান ছিল, সেসব জমিতে এখন কাদামাটি আর বন্যার ধ্বংসস্তূপ।

রাজনগরের সৈয়দনগর এলাকার কৃষক রহিম মিয়া বলেন, ‘বন্যার পানিতে আমার পুরো বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে চারা সংগ্রহ করে রোপা আমন আবাদ করব কীভাবে, সেই চিন্তায় দিন কাটছে।’

বর্গাচাষী আলিক মিয়া বলেন, ‘ঋণ করে চাষ করেছি। এখন ঋণ শোধ করব কীভাবে, জানি না। মনে হচ্ছে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।’

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে রোপা আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে বীজতলা নষ্ট হওয়ায় অনেক কৃষক সময়মতো চারা রোপণ করতে পারবেন না। এতে শুধু চলতি মৌসুম নয়, বছরের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এদিকে পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট, নষ্ট হয়ে যাওয়া টিউবওয়েল এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে ডায়রিয়া, ডিসেন্ট্রি, সর্দি-জ্বর ও বিভিন্ন ধরনের চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন সব বয়সী মানুষ।

রাজনগর উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের বাসিন্দা রহিম মিয়া, রকিব ও ছাদেক মিয়া জানান, দুই দিন ঘরবাড়ি পানির নিচে থাকার পর পানি নেমেছে। কিন্তু এখন পরিবারের অনেকেই জ্বর ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশুদ্ধ পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যার পর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি থাকে দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। এ সময় বিশুদ্ধ পানি পান, ওআরএস ব্যবহার, খাবার ভালোভাবে রান্না করা এবং হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।

মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমনের বীজতলা। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহ চলছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে মাঠপর্যায়ে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হবে।

মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, বন্যাকবলিত এলাকায় মেডিকেল টিম কাজ করছে। পর্যাপ্ত ওষুধ মজুত রয়েছে। ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল জানান, বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য চাল, শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় মেডিকেল টিম মোতায়েন রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত