জন্মদিনে শ্রদ্ধা

আল মাহমুদ: আধুনিকতার অন্য মুখ

আল মাহমুদ। স্ট্রিম গ্রাফিক

আমাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, কার কবিতায় বাংলাদেশের প্রাণের স্পন্দন আর মর্মের সুর শুনতে পাওয়া যায়? সমস্ত কুণ্ঠা আর দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে দিয়ে আমি আল মাহমুদের নাম নেব। এই কবিই আমাকে চমকে দিয়ে গিয়েছিলেন স্বপ্নের ভেতর, ‘নারকোলের ওই লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল/ ডাবের মতো চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা গোলগাল।’ পাঠ্যবইয়ের এই কবিতা স্বপ্নগ্রস্ত করে ফেলেছিল। স্বপ্নগ্রস্ত করেছিল আরও একটি কবিতা—‘আম্মা বলেন, পড়রে সোনা/ আব্বা বলেন, মন দে;/ পাঠে আমার মন বসেনা/ কাঁঠালচাঁপার গন্ধে।’ অনেক পরে হাতে উঠে এসেছিল সোনালি কাবিন। তারপর পুরনো বইয়ের দোকান থেকে হাতে উঠে এসেছিল আল মাহমুদের কবিতা।

‘সোনালি কাবিন’ পড়ার ঘোর আমি আজও কাটাতে পারি নি। কিন্তু বেশ কয়েকটি সংকট ছিল তাঁকে পড়ার—এক. তাঁকে পড়ছিলাম ‘আধুনিক’ কবি হিসেবে, দুই. অথচ আধুনিক কবিতার সংকলন থেকে তাঁকে খারিজ করা হচ্ছিল, তিন. কেউ কেউ আবার উত্তর-আধুনিক কবিতার সংকলনে তাঁকে জায়গা দিয়ে পরিপূরণের কাজ করছিলেন, চার. তাঁকে বিবেচনা করা হচ্ছিল রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানের দিক থেকে। বিশ বছর বয়সী তরুণের পক্ষে এইসব মীমাংসা করা জটিল জটিলতর একটি কাজ। আর তাই মনের ভেতর সংগুপ্ত সংশয় নিয়েই তাঁকে পড়তে হয়েছে। কিন্তু আজ বুঝতে পারি, ওই সংশয়ের আড়ালে চাপা পড়েছিল আল মাহমুদের কবিতার প্রতি তুলনারহিত মুগ্ধতা ও ভালোবাসা। তাই কল্পলোক কম্পিত করে ছড়িয়ে পড়ে অজস্র পংক্তির ঢেউ।

আমাদের চমকিত করে আল মাহমুদের নিসর্গগাথা। কবিতা লেখার শুরুর দিককার পটভূমি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘প্রেম, প্রকৃতি ও স্বদেশভূমিই আমার রচনার বিষয়বস্তু বলে ভাবতে আমার ভালো লাগতো।’ বিশ্বাসে সমর্পিত হওয়ার আগে এভাবেই তিনি ভাবতেন; মনের ভেতর প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিল ‘কবির কাছে নারীর চেয়ে সুন্দর দৃশ্যমান জগতে আর কি আছে?’ তার জবাব পেতে গিয়ে তিনি ‘সারা নিসর্গমণ্ডলিকেই এলোমেলো করে ফেলেছেন’। আল মাহমুদের জবানিতে শুনতে পাই, ‘প্রাণের সাথে প্রকৃতির এবং দৃশ্যমান জগতের বস্তুনিচয়ের পরস্পরের তুলনা-প্রতিতুলনার সফলতা ও ব্যর্থতাই সম্ভবত কবির জীবনকে অধিকার করে থাকে।’

আল মাহমুদের কবিতা শীর্ষক সংকলনের ভূমিকায় তিনি কথাগুলো বলেছিলেন ১৩৫১ বঙ্গাব্দে। বুঝতে পারি, আল মাহমুদের কবিসত্তায় প্রকৃতি বড়ো একটি বিষয় ও প্রেরণাবিন্দু হিসেবে কাজ করেছে। নারী ও প্রকৃতির সৌন্দর্যের তুলনা বরাবরই তাঁকে উদ্বেলিত করেছে। তার প্রাথমিক দেখা মেলে লোক লোকান্তরের কবিতাগুলোতে। কালের কলস আর সোনালি কাবিন কাব্যগ্রন্থে দেখতে পাব বাংলার নিসর্গের এক দীর্ঘায়িত বিস্তার। আর তারই মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছিলেন এক ইস্তেহার।

প্রেম আর বিপ্লবের খুনমাখা ১৪টি সনেটসহ পুরো সোনালি কাবিন যেন এক অখণ্ড ইস্তেহার। বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কালে লেখা চলছিল কবিতা ও ইতিহাস। আঁকা হচ্ছিল বাঙালির ভাবপরিচয়ের রেখাচিত্র। আলাওল, মুকুন্দরাম, কপিল, শবরী, শ্রীজ্ঞান, লালন এই সব শব্দোচ্চারণ জানান দিল কবিতার স্বরবদল জরুরি—আধুনিকতার নামে আর প্রতারণা নয়, যদি জাতি, জাতীয়তাবাদ, সংস্কৃতির লড়াই বুঝতে চাই তাহলে খনন করতে হবে পূর্বসূরির সৃজনভুবন। আর তাই আল মাহমুদ লিখে চললেন ধর্ম-সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ, অন্বয়বাদী, সাম্য-দীক্ষিত ইস্তেহার। শহুরে মধ্যবিত্তের গালে জোরসে এক থাপ্পড় মেরে বলে ফেললেন:

খেতের আড়াল থেকে কালো

মানুষের ধারা এসে বলে দেবে সরোষে আমাকে

কী ভাবে এগোবে তারা দুর্ভেদ্য নগরের তোরণে প্রথম।

কণ্ঠের লাবণ্য ঝেড়ে শোনালেন, ‘যে অতর্কিতে/শহরগুলোকে দখল করা হবে/আমার মুখ তারি রক্তাক্ত পরিকল্পনা।’ কিন্তু না, ইতিহাসের এই মহাবাসনা তিনি নিজেই চূর্ণ করলেন, ভাঙলেন সাম্য ও সমঝোতার দেউড়ি। একটি ধর্ম ও ধর্মানুষঙ্গের সাথে জড়ালেন স্বঘোষিতভাবে। নিন্দার কাঁটা গায়ে না-মেখে লিখলেন ধর্মবাদী কবিতা, ধর্মের পরিচয় সেঁটে দিয়ে এ ধরনের চর্চাকে আদর করে ডাকতে থাকলেন ‘ইসলামী সাহিত্য’। শুভত্ব ও কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল সাহিত্যের জন্য বরাদ্দ রাখলেন ওই একই শিরোনাম।

১৯৯৪-তে হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত আধুনিক বাংলা কবিতা থেকে অন্য অনেকের মতো বহিষ্কৃত হলেন আল মাহমুদ। তাঁর সাবেক কৃতিত্বের সবটা প্রত্যাখ্যাত হল না ঠিকই, কিন্তু সাদরে গৃহীতও হল না। প্রগতিশীলতা বনাম মৌলবাদিতা নিয়ে এক দোনোমোনা ভঙ্গি বিস্তৃত হতে থাকল। আজও আমরা এই দ্বিধাদোদুল মনকে স্থির করতে পারি কিনা সন্দেহ! আমাদের সাহিত্যিক বাস্তবতা এই যে, আল মাহমুদের ব্যক্তি-ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর কবিতাপাঠের একটি রীতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই রীতি বাদ দিয়ে পাঠ যেন অসম্ভব। আল মাহমুদ নিজেও তাঁর কবিতাপাঠের সহজ রাস্তাগুলো তৈরি করে দেন কবিতায় বা সরব সাক্ষাৎকারে। কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে গেছে তাঁর সাম্যবাদ, দ্রোহ আর ইসলামপন্থায় সমর্পণের খবর।

আল মাহমুদের কবিতাজীবনই তো দুই ভাগে ছিন্ন হয়ে গেছে; এক ভাগ লোক লোকান্তর থেকে সোনালি কাবিন পর্যন্ত বিস্তৃত, অন্য ভাগ মায়াবী পর্দ দুলে ওঠো থেকে ক্রমপ্রসারমান। তাঁর নিজের জীবনঘেঁষা মন্তব্য ও পদ্যপঙক্তির খাত ধরেই আমরা পড়ে উঠি তাঁর সমস্ত বই। বাংলাদেশের আরও কোনো কবি কি ভাবনার রূপবদলের জন্যে এতোটা আলোচিত হয়েছেন? কৈফিয়তের ধরনে আরও কোনো কবি কি নিজেকে ঘিরে জমে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন কবিতায়? সম্ভবত না।

আল মাহমুদ ও তাঁর ব্যক্তি-ইতিহাসের যে-পটভূমি নিয়ে কথা হলো এতক্ষণ, তারই এক পদ্যরূপ ২০০৪-এ প্রকাশ পাওয়া দ্বিতীয় ভাঙন। কাব্যিক কলা-প্রকৌশল আর আধেয়গত মাপকাঠির বিবেচনায় বইটির কবিতাগুলোকে, আল মাহমুদেরই সমগ্র কাব্যের বিচারে, অভিনব হিসেবে চিহ্নিত করা মুশকিল। ঘুরে ফিরে সেই একই মোটিফ: কবি, নারী-পুরুষ, কর্ষণ-সৃজন, প্রকৃতি, সম্ভোগলিপ্সা। দেশবোধের মানচিত্র খোলাসা হয়েছে কয়েকটি কবিতায়। গদ্যের সারল্য নিয়ে যেমন বলেন, ‘আমি গোখরো সাপের হিস্হিসানির মধ্যেও কোনো জটিলতা দেখি না।/ কিন্তু মানুষ যখন রাজনীতি, মানবকল্যাণ ও গণতন্ত্রের কথা বলে/ তখন যেন মনে হয় একটা আস্ত দেশকে কতিপয় গূঢ়ার্থবাদী পিশাচ/ ছারখার করে দিচ্ছে?’ ‘গুলির শব্দ ও হত্যার গুঞ্জন’-ভরা বাংলাদেশকে তাই গ্রহণে অস্বীকৃতি তাঁর। বহু কাল আগে শ্রেণির উচ্ছেদ চেয়ে একটি দেশ গড়ার যে-পথ খুড়ে চলছিলেন তিনি, দ্বিতীয় ভাঙনে সে-পথ থেকে সরে গেছেন বহু দূর।

আল মাহমুদের সাহিত্য আমাদের নিয়ে যায় গ্রামীণ মধ্যবিত্তের জগতে - যে-জগত থেকে ধানের গন্ধ মুছে যায় নি, কাদামাটির লুপ্ত হয় নি। তাঁর কবিতা আধা-শহুরে আধা-গ্রামীণ মধ্যবিত্তকে নিয়ে যায় গ্রাম-গ্রামান্তরের পথে, নস্টালজিয়ায়।

ভোগবাসনার কেন্দ্রে স্থিত নারীকে দেখা গিয়েছিল লোক লোকান্তর, কালের কলস কিংবা সোনালি কাবিনে; সেসব নারীকে ভোগের কেন্দ্রেই অবনত রাখা হয়েছে : ‘নারীর দেহের চেয়ে নম্য কিছু নেই পৃথিবীতে/সব শাস্ত্র ঘেঁটে শেষে হে জ্যোতিষী নারীতে আরাম।’ তার সঙ্গে যোগ হয়েছে অধিপতি পুরুষের প্রতি একচক্ষু পক্ষপাত, ‘পুরুষের অনুপস্থিতি হলো স্বাধীনতা ও সীমান্ত সংকোচিত হয়ে আসার আলামত’ এবং ‘মাতৃরূপ ত্যাগ করলে নারীর চেহারায় আর নেকড়েনীর মুখের পার্থক্য ঘুচে যায়।’ এই ভোগ, এই গ্রহাবর্ত থেকে নিজেকে নিয়ে যেতে চান পরম প্রভুর সান্নিধ্যে, ‘একটি ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে’ আবর্তন করতে প্রভুর সিংহাসন। অর্থাৎ বিশ্বাসের দিগন্তে উড়াল দিয়েছেন আল মাহমুদ। কিন্তু একদিন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মাঝামাঝি দোলাচল ছিল; প্রথম বইতেই দেখা পাবো, ‘...তাই আমি নাস্তিক নই।/ বিশ্বাসী নই।’ দ্বিতীয় ভাঙন বইতে সুস্থির বিশ্বাসীর ছকে খুঁজেছেন স্বর্গোদ্যান, কানাকড়ি মূল্যে যা হারিয়ে ফেলেছেন আদিপিতা ও আদিমাতা। একদা-প্রগতিবাদী কবির কাছে মানবীয় সভ্যতার জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আবিষ্কার ‘সবি নিরর্থক স্বপ্নের জ্বালানিতে ব্যর্থতার সমুদ্রে সাঁতার মাত্র’।

‘দ্বিতীয় ভাঙনে’র তাৎপর্যপূর্ণ দিক এই যে, আল মাহমুদের ব্যক্তি-ইতিহাসের নানা চূর্ণক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে; কিন্তু একটি বিশেষ মুহূর্তে—বিশ শতকের শেষ ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠছে তখন। রচনাকাল খেয়াল করার পাশাপাশি কবিতাগুলো পড়লে বোঝা যায় শতাব্দিশেষের অনুভূতিগুচ্ছ গুঞ্জরন তুলছিল মনে মনে। কবিতাবাহিত এই অনুভূতিগুলোয় একটি বিশেষ সংযোজন পেছন ফিরে দেখা। পেছন ফিরে সময়প্রবাহের ছিন্ন সূত্রগুলি যেন জড়ো করছিলেন, ‘দ্যাখো আমার ইতস্তত বিচ্ছিন্ন আমিকে আমি/প্রায় জোড়া লাগিয়ে এক কবির আমিতে খাড়া করে/ফেলেছি।’ যে-‘আমি’কে তিনি পেলেন সে-‘আমি’ ফেলে এসেছে সোনালি কাবিনের সেই অহমিকা ‘পরাজিত হয় না কবিরা’; দ্বিতীয় ভাঙনের আমি দেখতে ‘কাকতাড়ুয়ার মতো’ - ‘সকলের ফসল রক্ষার এক হাস্যকর প্রতিশ্রুতি আমি’; দুমড়ানো, মুচড়ানো ভাঙচুরের অবশেষ এই আমি ‘লোভের বাতাসে’ কাত হয়ে পড়ে।

আবার অকুণ্ঠ স্পর্ধায় দাঁড়িয়ে থাকে। দয়িতার প্রত্যাখ্যান যে-‘আমি'র বিচ্ছুরণ আর ‘কবিতার স্ফুলিঙ্গ’ ছিটিয়ে দিয়েছিল এক কালে, তা যদি হ্যাঁ-তে রূপান্তরিত হয় তাহলেও বুঝি আরেক চণ্ডনাচন তাঁকে কাঁপিয়ে তুলবে। হয়তো-বা আরেকটি ভাঙন তৈরি হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তা সইবার সাহস আর নেই। কেমন করে বইবেন তিনি ভাঙনের ভার? তাহলে নিশ্চয়ই বিশ্বাসের দরোজায় এমন শক্ত খিল এঁটে গেছে যা ভেঙে গেলে কোনো থই পাবেন না তিনি। কথাগুলো দয়িতাকে উদ্দেশ্যে করে বলা, হয়তো-বা খানিকটা নিজেরই উদ্দেশ্যে। পরাস্ত কবির কাছে বদলে গেছে কবির সংজ্ঞার্থ, ‘কবি শব্দটির অর্থই হলো মানুষের কবন্ধে শেয়ালের মুণ্ডু বসানো।’ নিজের মস্তকে তিনি দেখলেন ‘রোবোটের মস্তক’, শরীরে বেজে উঠছে ‘কলকবজার ঘষটানি’। সোনালি আশ্বাসের কাবিননামায় যন্ত্রমানব বা কাষ্ঠপুতুলসুলভ নিঃসহায়তার এমন বিবরণ ছিল না।

বিশ্বাসে নতজানু হলে যদি ভুল হয়, ষাট বছরের পরিক্রমণে যদি ত্রুটি থাকে তবু আর কোনো পথ নেই: ‘যদি ভুল পথে এসে থাকি তবে জেনো ভ্রান্তিই আমার ধ্রুব। এখন/গাছ সাক্ষী আমি আর ফিরব না। নদী সাক্ষী আমি ফিরব না।’ দীপ্ত আশার কোনো শ্লোক তিনি শোনাতে চান না, বরং হতে চান ‘নিস্পৃহ কালের পথিক’। শতাব্দির শেষ সূর্য অস্তমিত হবার লগ্নে দ্বিতীয় ভাঙন বইতে আমরা পড়ে ফেলি আল মাহমুদের আত্মস্বীকৃতি, কিছু অভিমান, অভিযোগও। একটি স্তবক পড়ে নিই : ‘যে দেশে কবির ঠোঁটে ছুঁচ দ্যায় রাজার সেপাই/সে মাটিতে মেঘবৃষ্টি প্রকৃতির ষড়ঋতু নাই।’—এই উচ্চারণ কবির শিল্প-স্বাধিকারের প্রশ্নটিকে উসকে দেয়।

আল মাহমুদের কবিতার প্রতি কট্টর প্রগতিবাদী/ আধুনিকতাবাদী/ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ইত্যাদি নানা বর্গের মতাদর্শের পক্ষ থেকে যে-প্রবল নাসিকাকুঞ্চন দেখা যায় তারই কি প্রতিবাদ এই উচ্চারণ? কবিই বলতে পারবেন ভালো। এটুকু বলতে চাই, কবির অন্তরের স্বায়ত্তশাসন যদি মেনে নিই তাহলে আল মাহমুদের চিত্তবদল অস্বাভাবিক নয়, বরং গণতান্ত্রিক। তাঁর লেখার সঙ্গে অনবরত তর্ক হতে পারে, তাঁর সমকালীন রাজনৈতিক বয়ানের বিরুদ্ধে লড়াকু অবস্থানও গ্রহণ করতে পারি সক্রিয়ভাবে। গ্রহণ করাটাই বাংলাদেশের সমাজ-ইতিহাসের জন্যে যৌক্তিক। কিন্তু তাঁর শিল্পভাষার মূল্যায়ন করা দরকার শৈল্পিক প্রয়োজন সামনে রেখে।

রাজনৈতিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গি কবির পক্ষে অন্তরায় বলে মনে করি না। এক রাজনৈতিক বিশ্বাস, আরেকটি রাজনৈতিক বিশ্বাসের সমালোচনা করবে, এটাই স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক। আল মাহমুদের বেলায় এই বিচার উহ্য রাখা প্রবল অন্যায়। আর এই আশাবাদও অর্থহীন ও ফ্যাসিস্ট প্রবণতা যে, কোনো কবি/ লেখক/ শিল্পী অন্য কারো বিশ্বাসমতো শিল্প সৃষ্টি করবেন বা হৃদয়তুষ্টির জন্য লিখবেন। এমনও আশা করা অনুচিত, কোনো কবি একই বিশ্বাস ও চিন্তায় রূপান্তরহীনভাবে সচল থাকবেন। ব্যক্তির অন্তরবদলকে অস্বাভাবিক মনে করার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কোনো কারণ নেই। বাস্তব বিশ্ব আমাদের এই প্রমাণই হাজির করে যে, আর্থ-সামাজিক কাঠামো, সংস্কৃতির বাতাবরণে মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের বদল ঘটে। রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ চিরকাল একই চিন্তা ও বিশ্বাসে স্থির থাকেন না; যদিও মৌল কিছু ধারণা সারা জীবন ধরেই বহন করেছেন। কিন্তু চিন্তা ও রুচির বদল ঘটিয়েছেন সময়ের তাগিদেই।

একইভাবে বদলেছেন আল মাহমুদ। তিনি গিয়েছেন ধর্ম ও ধর্মীয় সংস্কৃতির পথে। আর তা কাব্যিক কৌশলেই। কিন্তু তাই বলে এমন নয় যে, তাঁর পরবর্তী কবিতা মানেই ধর্ম, ধর্ম এবং ধর্ম। ধর্ম হলেই বা সমস্যা কোথায়? আধুনিক কবিরা কি ধর্ম ও ধর্মবোধকে কবিতায় ব্যবহার করেন নি? স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের অনেক সঙ্গীত কি পরম ব্রহ্মের কাছে প্রার্থনা নয়? এলিয়টের ধর্মবিশ্বাস ও তার প্রয়োগ কি তাঁর কবিতা পাঠের অন্তরায়? আধুনিকতার অন্তরায় হয়ে দেখা দিয়েছে? কিংবা তলস্তয়ের মতো প্রতিভা কি বিলীন হয়ে গেছেন উপন্যাসে খ্রিস্টমহিমা লিপিবদ্ধ করার অভিযোগে?

প্রকৃতপক্ষে আল মাহমুদের রূপান্তরের ইতিহাস দেখাতে গিয়ে রচনা করা হয়েছে তাঁকে প্রত্যাখ্যানের ইতিহাস। কিন্তু কাল খুবই নির্মম পর্যবেক্ষক। আর তাই যতোই তাঁকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে ততোই তিনি প্রবলভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন। এর পেছনে যাদুমন্ত্র হিসেবে কাজ করেছে - আর কিছুই নয়, তাঁরই কবিতা, গল্প, উপন্যাস।

প্রশ্ন হলো—কেন তাঁর সাহিত্যের কাছে পাঠক ধাবিত হয়? তার উত্তর মিলবে আমাদের ঐতিহাসিক বিকাশের ভেতর। আল মাহমুদের সাহিত্য আমাদের নিয়ে যায় গ্রামীণ মধ্যবিত্তের জগতে - যে-জগত থেকে ধানের গন্ধ মুছে যায় নি, কাদামাটির লুপ্ত হয় নি। তাঁর কবিতা আধা-শহুরে আধা-গ্রামীণ মধ্যবিত্তকে নিয়ে যায় গ্রাম-গ্রামান্তরের পথে, নস্টালজিয়ায়। তাঁর সমকালীন কবিরা যখন কবিতায় ঠেসে দিতে চেয়েছেন কল্পিত মেট্রোপলিটন মন, তিনি তখন লিখে চলেছেন গ্রামীণ জীবন, জনপদ, সংস্কৃতি, বিশ্বাসের বৃত্তান্ত। এ-কারণে সহজেই তাঁকে আলাদা করে চেনা যায় এবং এ-কথাও বলা যায়, তিনি আসলে ইউরো-আমেরিকান কবিতার ছাঁচে ঢালাই করা ‘আধুনিক’ কবিতাকে অনুসরণ করেন নি। তাঁর আধুনিকতা জাতীয়তাবাদী, আঞ্চলিক ও বি-উপনিবেশী।

আমাদের দেশে আধুনিক কবিতার কবি ও বিচারকরা বরাবরই কবিতাকে মাপতে চান ইউরোপীয় গজ-ফিতা দিয়ে; কিন্তু তার বাইরেও আধুনিকতারই আরও আরও দিক-চিহ্ন আছে। সেই নিশানায় চোখ রাখলে দেখা যাবে, আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকা-ক্যারিবীয় অঞ্চলে তৈরি হচ্ছিল আধুনিক কবিতার প্রতিরোধী পাটাতন, যা ইউরোপকে গ্রহণ করেই ইউরোপের সমালোচক। কিন্তু বাংলাদেশে দেখা গেছে ভিন্ন রূপ; আধুনিক কবি ও সমালোচকদের বেশির ভাগই ইউরো-আমেরিকান আধুনিকতার মহাস্তাবক ও দুর্বল অনুসারী।

আমাদের সৌভাগ্য আল মাহমুদ সে-পথে হাঁটেন নি। তাঁর পথ ধর্মের দিকে বেঁকে গেলেও আফসোস করার কিছু নেই; কেননা তাঁর ধর্মানুষঙ্গযুক্ত কবিতাগুলো শেষ পর্যন্ত ‘কবিতা’রই স্বাদ দেয়। সেখানেই আল মাহমুদের কৃতিত্ব আর কাব্যিক সাম্রাজ্য, যাকে উপেক্ষা করা যায়, কিন্তু উৎখাত করা যায় না। মারাত্মক ভুল হবে যদি না মনে রাখি, ষাটের দশকের পূর্ববাংলায় আল মাহমুদ প্রতীচ্যের খপ্পরে পড়া আত্মবিধ্বংসী আধুনিকতার এক বিকল্প খুঁজছিলেন। লোকায়ত গণসাহিত্যের মোড়কে জসীমউদ্দীন যেমন খুঁজে ফিরছিলেন বাংলা কবিতার আত্মা। দু’জনের কেউ-ই সংহতভাবে আধুনিকতার বিকল্প নন্দনতত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন নি ঠিকই; কিন্তু ইঙ্গিতগুলোর আঁচড় রেখে দিয়েছেন। আঁচড়ের অসামাপ্ত ও অস্বচ্ছ রেখাগুলোকে স্পষ্ট করে নেয়ার দায় উত্তরসূরির।

Ad 300x250

সম্পর্কিত