এবার কি তাজমহল নিয়ে ‘রাজনীতি’ করতে চায় বিজেপি

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬, ১২: ৪৪
তাজমহল। ছবি: আনসপ্ল্যাশ থেকে নেওয়া

ইউনেস্কো ঘোষিত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট ও ভারতের ঐতিহাসিক স্থাপনা তাজমহল নিয়ে নতুন এক আইনি ও সামাজিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। কথিত আছে, সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা ও স্মৃতি সমাধি হিসেবে তাজমহল নির্মাণ করেছেন, তবে বিতর্ক শুরু হয়েছে তাজমহলের নিচে বা একই স্থানে আগে একটি প্রাচীন শিবমন্দির ছিল, যার নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’।

ঐতিহাসিক এই স্মৃতিস্তম্ভটির নিচে প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের জন্য কেন কোনো জরিপ করা হবে না—এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াকে (এএসআই) নোটিশ দিয়েছে এলাহাবাদ হাইকোর্ট। কিন্তু ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব এবং আদালতের নথি কী বলছে? সত্যিই কি তাজমহলের নিচে কোনো মন্দির রয়েছে, নাকি এটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিতর্কের অংশ?

কোথা থেকে ‘তেজো মহালয়া’ তত্ত্ব শুরু

তাজমহলের নিচে শিবমন্দির থাকার দাবি প্রথম করেন ভারতীয় লেখক ও ইতিহাসবিদ পি এন ওক। ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত তাঁর তাজ মহল: দ্যা ট্রু স্টোরি বইয়ে তিনি লেখেন, তাজমহলের প্রকৃত নাম ছিল ‘তেজো মহালয়া’ এবং এটি বহু শতাব্দী আগে নির্মিত একটি হিন্দু মন্দির। পরে শাহজাহান সেটিকে দখল করে সমাধিতে রূপান্তর করেন।

তবে মূলধারার ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতত্ত্ববিদরা শুরু থেকেই এ তত্ত্বকে প্রমাণবিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে, ওকের দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক, শিলালিপি বা সমসাময়িক ঐতিহাসিক কোনো প্রমাণ নেই।

ইতিহাস ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কী বলছে

মূলধারার ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, মুঘল সম্রাট শাহজাহান তাঁর স্ত্রী মমতাজ মহলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ১৬৩২ সালে তাজমহলের নির্মাণকাজ শুরু করেন এবং প্রায় দুই দশক ধরে এর কাজ চলে। সমসাময়িক মুঘল দলিল, দরবারি ইতিহাস, ইউরোপীয় পর্যটকদের বিবরণ এবং নির্মাণসংক্রান্ত নথিতে এ তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া জমি অধিগ্রহণ, কারিগর নিয়োগ, নির্মাণ ব্যয় ও স্থাপত্য পরিকল্পনার বিভিন্ন নথিও ইতিহাসবিদরা তুলে ধরেছেন। এসব নথি তাজমহলকে মুঘল আমলে নির্মিত একটি সমাধিসৌধ হিসেবেই নির্দেশ করে।

অন্যদিকে ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন ‘হিন্দু মহাসভা’র আইনি ও সাংগঠনিক সদস্য প্রবীণ আইনজীবী হরিশঙ্কর জৈনের নেতৃত্বে আবেদনকারী পক্ষ দাবি করছে, ১১৫৫-৫৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পরমর্দি দেব ভগবান মহাদেবের উদ্দেশ্যে প্রাচীন হিন্দু মন্দির তেজো মহালয়া নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে মুঘলরা এটি জোরপূর্বক দখল করে তাজমহল স্মৃতিসৌধে রূপান্তর করে। আবেদনকারী পক্ষের দাবি, তাদের কাছে ১০৯টি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে যা প্রমাণ করে এটি একটি মন্দির।

ভারতের সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ (এএসআই) একাধিকবার আদালতে লিখিতভাবে জানিয়েছে, তাজমহল একটি সমাধিসৌধ এবং এটি কোনো মন্দির নয়। ২০১৭ সালে আগ্রার একটি আদালতে এএসআই স্পষ্টভাবে জানায়, তাজমহলকে শিবমন্দির হিসেবে দাবি করার পক্ষে উপস্থাপিত প্রমাণ ‘কাল্পনিক’ এবং গ্রহণযোগ্য নয়। সংস্থাটি আরও জানায়, তাজমহলের ভেতরে তালাবদ্ধ থাকা কক্ষগুলো খুলে দেখারও কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক প্রয়োজন নেই।

আদালতের অবস্থান

তাজমহল নিয়ে একাধিক মামলা ভারতের আদালতে হয়েছে। ২০০০ সালে পি এন ওক তাজমহলকে ‘তেজো মহালয়া’ দাবি করলে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট এই আবেদন খারিজ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০২২ সালে বিভিন্ন আদালতে ‘২২টি বন্ধ কক্ষ খুলে দেখা’, ‘নতুন জরিপ পরিচালনা’ বা ‘মন্দিরের প্রমাণ অনুসন্ধান’ সংক্রান্ত আবেদন করা হলেও আদালত সেগুলোর বেশিরভাগই খারিজ করেছেন।

তবে ২০২৬ সালে আবারও একটি আবেদনকে কেন্দ্র করে নতুন আইনি বিতর্ক শুরু হয়েছে। এলাহাবাদ হাইকোর্ট কেন্দ্রীয় সরকার ও এএসআইয়ের কাছে জবাব চেয়েছে, যদিও এর অর্থ এই নয় যে আদালত এ দাবি সত্য বলে মেনে নিয়েছে। এটি কেবল বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ।

নতুন করে আবার কেন বিতর্ক

তাজমহলকে ঘিরে বিতর্ক কেবল ইতিহাসের নয়, এটি ভারতের পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির (বিজেপি) উত্থানের পর মুঘল আমলের বহু স্থাপনা নিয়ে নতুন করে আবারও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তাজমহল, কুতুব মিনার, জ্ঞানবাপী মসজিদ ও মথুরার শাহী ঈদগাহসহ এমন বিভিন্ন স্থাপনাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় মালিকানার দাবি সামনে এসেছে।

ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, তাজমহল বা অনুরূপ ঐতিহাসিক স্থাপনা নিয়ে ধর্মীয় মালিকানার দাবি প্রায়ই আধুনিক রাজনৈতিক পরিচয় ও জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের সঙ্গে জড়িত। মার্কিন ইতিহাসবিদ ও দক্ষিণ এশিয়ার গবেষক অড্রি ট্রুশকে তাঁর রামাস অযোধ্যা: ক্রিয়েটিং অ্যান্ড কনটেসটিং হিন্দু আইডেন্টিটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, অযোধ্যাকে ঘিরে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বর্ণনা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে এবং আধুনিক রাজনৈতিক আন্দোলনে সেগুলো নতুন অর্থ পেয়েছে। তাঁর মতে, ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও রাজনৈতিক পরিচয়কে একাকার করে দেখলে অতীতের ঘটনাকে নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা কঠিন হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, দাবির সমর্থকেরা বলছেন, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক তথ্য নিয়ে নতুন করে গবেষণা ও অনুসন্ধানের সুযোগ সব সময় থাকা উচিত। তাঁদের যুক্তি, নতুন প্রমাণ বা প্রযুক্তি পাওয়া গেলে অতীত সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাও পুনর্মূল্যায়ন করা যেতে পারে।

ভারতের ইতিহাসে এ ধরনের বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হলো অযোধ্যার বাবরি মসজিদ। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উগ্র হিন্দুত্ববাদী করসেবকদের একটি জনতা ১৬শ শতকে নির্মিত বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলে, যার পর দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রায় দুই হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। প্রায় তিন দশক ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সর্বসম্মত রায়ে বিতর্কিত জমি রামমন্দির নির্মাণের জন্য একটি ট্রাস্টকে দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আদালত মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনাকে ‘আইনের শাসনের গুরুতর লঙ্ঘন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে মুসলিম পক্ষকে অযোধ্যায়ই পাঁচ একর বিকল্প জমি বরাদ্দ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

তবে বাবরি মামলার সঙ্গে তাজমহলের পরিস্থিতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। বাবরি মামলায় কয়েক দশক ধরে বিস্তৃত প্রত্নতাত্ত্বিক তদন্ত, ঐতিহাসিক দলিল, সাক্ষ্য প্রমাণ এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া ছিল। অন্যদিকে তাজমহলকে ঘিরে তেজো মহালয়ার দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত ভারতের সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বা মূলধারার ইতিহাসবিদরা গ্রহণযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ স্বীকার করেননি। অর্থাৎ দুটি মামলার রাজনৈতিক আবেগে মিল থাকলেও তাদের প্রমাণগত ও আইনি ভিত্তি এক নয়।

ইতিহাস নাকি রাজনীতি

ইতিহাসকে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে পুনর্মূল্যায়ন করা স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তি হতে হবে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ, নির্ভরযোগ্য নথি এবং গবেষণা। কোন রাজনৈতিক বক্তব্য বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার নয়।

তাজমহল নিয়ে বর্তমানে যেসব দাবি প্রচারিত হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগই এখনো প্রমাণিত ঐতিহাসিক সত্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। বরং ভারতের সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, অধিকাংশ ইতিহাসবিদ এবং বিদ্যমান আদালতের রেকর্ড এখনো তাজমহলকে শাহজাহান নির্মিত মুঘল সমাধিসৌধ হিসেবেই বিবেচনা করে। তাজমহলের নিচে মন্দির রয়েছে এমন দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো গ্রহণযোগ্য ও সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি। বিতর্কটি রাজনৈতিক ও আদর্শিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও ইতিহাসের বিচারে সেটি এখনো প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়া টুডে, এনডিটিভি ও দ্য হিন্দু

Ad 300x250

সম্পর্কিত