ঢাকা স্ট্রিম-সিএসআর গোলটেবিল

নীতিগত সীমাবদ্ধতায় সুযোগবঞ্চিত দেশীয় উদ্যোক্তারা

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

রাজধানীর বনানীতে ‘কৌশলগত সম্পদে দেশীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিলে অতিথিরা। স্ট্রিম ছবি

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কুইক রেন্টাল ও আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ চুক্তিতে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। চড়া মূল্যে বিদ্যুৎ কেনায় জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অথচ দেশীয় অনেক উদ্যোক্তা এখন আন্তর্জাতিক মানের কাজের সক্ষমতা অর্জন করেছেন। বিদেশনির্ভরতা ও সরকারের নীতিগত সমস্যার কারণে তাঁরা সুবিধা পাচ্ছেন না।

মঙ্গলবার (১৯ মে) রাজধানীর বনানীতে ‘কৌশলগত সম্পদে দেশীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিলে এই অভিমত দেন খাত সংশ্লিষ্টরা। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) এবং ঢাকা স্ট্রিম যৌথভাবে এই বৈঠক আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ও গণসংহতি আন্দোলনের সাবেক প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, বর্তমান সরকার দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা শক্তিশালী করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশি-বিদেশির মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ, বিনিয়োগ ব্যয় কমানো থেকে সব ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা অবসানে কাজ করছে।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনে রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, কর্মদক্ষতা হবে মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড। দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে বের হতে হবে।

গোলটেবিল বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। কিন্তু এখনো আমরা কৌশলগত সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বিদেশিনির্ভর। এটি শুধু অর্থনীতি নয়, জাতীয় নিরাপত্তা থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজ্য।

নিজস্ব সক্ষমতার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) দেশীয় প্রতিষ্ঠান সিডিডিএলের পরিচালনায় দক্ষতা ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি প্রমাণ করে আমরা নিজেরাও আন্তর্জাতিক মানে কাজের সক্ষমতা অর্জন করেছি।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

প্রবন্ধে বলা হয়, পতেঙ্গা কন্টেইনার টার্মিনালে ১৭০ মিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলা হলেও, প্রায় ৫৯ শতাংশ অর্থ এসেছে দেশীয় ব্যাংক এবং স্থানীয় উৎস থেকে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের প্রকৃত কাঠামো ও মালিকানা নিয়ে স্বচ্ছ আলোচনা প্রয়োজ। কৌশলগত খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক ৫১ শতাংশ দেশীয় মালিকানা, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা জরুরি।

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এক সময় এমন ধারণা ছিল– বাংলাদেশিরা বন্দর বা বিমানবন্দর পরিচালনা করতে জানে না। এসব খাত বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে হবে। কিন্তু বর্তমানে দেশীয় অনেক প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক মানের কাজের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

তিনি বলেন, কৌশলগত সম্পদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কারা নেয় এবং সেগুলো কতটা জাতীয় স্বার্থে, তা বড় প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক চুক্তি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও স্বার্থসচেতন হতে হবে। ইরানের উদাহরণ দিয়ে মান্না বলেন, বৈশ্বিক চাপের মধ্যেও অনেক দেশ নিজেদের সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে। সাম্প্রতিক উদাহরণ ইরান। পশ্চিমা রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সক্ষমতার জানান দিয়েছে তেহরান।

গোলটেবিল বৈঠকে ঢাকা স্ট্রিমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সোহেল রানা, পরামর্শক সম্পাদক হাসান মামুন, সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান, গবেষক সবুজ চৌধুরী প্রমুখ বক্তৃতা করেন।

বক্তারা বলেন, খাদ্যনিরাপত্তা, জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি ও সমুদ্রসম্পদের মতো সংবেদনশীল খাতে দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। বিদেশি বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, কৌশলগত খাতে জাতীয় স্বার্থ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা দরকার। এটি সম্ভব না হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা অর্জন কঠিন হবে। একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এবং নীতিগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তারা।

সম্পর্কিত