প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা: শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কখন চিন্তিত হবেন মা-বাবা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ২০: ৪০
প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা: শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কখন চিন্তিত হবেন মা-বাবা? এআই জেনারেটেড ছবি

গলির মোড়ে বা রাস্তার পাশে শিশুরা বিড়ালছানাকে লাঠি দিয়ে তাড়া করছে, কিংবা কুকুরের লেজ ধরে টানছে—এমন দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়। আমরা অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে ভাবি, ছোট মানুষ একটু দুষ্টুমি বা খেলা করছে। কিন্তু মনোবিজ্ঞান বলছে, এমন আচরণ দেখলে সব সময় এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। শিশুদের এই প্রবণতা কোনো সাধারণ দুষ্টুমি না-ও হতে পারে।

ক্লিনিক্যাল ও ফরেনসিক সাইকোলজিস্ট ড. জনি ই জনস্টন গবেষণায় দেখিয়েছেন, শৈশবে প্রাণীদের প্রতি এমন নিষ্ঠুরতা কোনো কোনো সময় পরবর্তী সহিংস বা অপরাধপ্রবণ আচরণের প্রাথমিক সতর্কসংকেত হতে পারে। কিছু গবেষণায় শৈশবের প্রাণী নির্যাতনের আচরণের সঙ্গে পরবর্তী সহিংস আচরণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুর এমন আচরণ যখন নিয়মিত রূপ নেয়, তখন তা চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

ড. জনি ই জনস্টনের মতে, যেসব শিশুরা প্রাণীদের নিয়মিত অত্যাচার করে, তারা নিজেরা কোনো না কোনো সহিংসতা দেখেছে অথবা নিজেরা এমন ঘটনার শিকার হয়েছে। একে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় ‘পোস্ট-ট্রমাটিক প্লে’ বা নির্যাতনকারীর আচরণ অনুকরণ করা। এই যোগসূত্র এতটাই পরিচিত যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কমিউনিটিতে সমাজসেবা ও পশু নিয়ন্ত্রণ সংস্থাকে একসঙ্গে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন আছে কি-না বুঝবেন যেভাবে

মনোবিজ্ঞানীরা শিশুদের এমন আচরণকে বয়স এবং মানসিক বিকাশ অনুযায়ী প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমত, ‘পরীক্ষক’ বা এক্সপেরিমেন্টার। এই দলে পড়ে ১ থেকে ৬ বছর বয়সী শিশুরা। এই বয়সের শিশুদের প্রাণীর অনুভূতি বোঝার মতো মানসিক পরিপক্বতা থাকে না। তারা অনেক সময় খেলার বা মজার বিষয় মনে করে ভুল করে বসে। এমন শিশুদের জন্য মা-বাবা ও শিক্ষকদের দেওয়া ‘মানবিক শিক্ষা’ বা প্রাণীর প্রতি দয়াশীল হতে শেখানোই যথেষ্ট। এতে করে তাদের এই আচরণ ধীরে ধীরে শুধরে যাবে।

শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে এবং প্রাণীদের প্রতি সহমর্মী মনোভাব গড়ে তুলতে শৈশবে পশুর প্রতি দয়াশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব।

অন্যটি, ‘সাহায্যের আকুতি জানানো শিশু’। এই দলে পড়ে সাধারণত ৭ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুরা। তারা বোঝে যে পশুকে কষ্ট দেওয়া অন্যায়, তবু এটা করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শিক্ষার অভাব নয়, বরং কোনো মানসিক ট্রমা বা নির্যাতনের লক্ষণ। আমাদের দেশে অনেক শিশু পরিবারে, স্কুলে বা আশেপাশে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এ ধরনের আচরণ করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে এই আচরণ গভীর মানসিক চাপ বা ট্রমার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। এমন শিশুদের জন্য প্রফেশনাল সাইকোলজিস্টের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন।

আরেকটি ‘আচরণগত ব্যাধিতে আক্রান্ত কিশোর’। ১২ বছরের বেশি বয়সী যেসব কিশোর প্রাণীর ওপর অত্যাচার করে, তারা সমাজবিরোধী কাজেও লিপ্ত থাকতে পারে। তারা বন্ধুদের দলে হিরো সাজতে বা ক্ষমতা দেখাতে প্রাণীদের কষ্ট দিতেও পারে। তাদের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে আরও গুরুতর আচরণগত সমস্যা দেখা দিতে পারে।

কখন সাধারণ কৌতূহল ‘রেড ফ্ল্যাগ’ হয়ে ওঠে

গবেষক ড. জনি ই জনস্টন জানিয়েছেন, পশুপাখির সঙ্গে দুষ্টামি করলে বা এদের ছোটখাটো ব্যথা দেওয়া মানেই সেই শিশু মানসিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত—ব্যাপারটি এমন নয়। আপনার শিশুর অসচেতন ভুলকে ‘সাধারণ ভুল’ মনে করে তাকে ভালো-মন্দের শিক্ষা দেওয়া যায়। কিন্তু কোনো পশুকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বন্ধ জায়গায় আটকে রাখা, আঘাত করা কিংবা পশুর ছটফটানি ও কষ্ট দেখে আনন্দ পাওয়া, এসব মোটেও সাধারণ বিষয় নয়। এগুলোকে বিশেষজ্ঞরা ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা বিপদের লক্ষণ হিসেবে দেখছেন।

বিশেষ করে শিশুটির বোঝার বয়স হওয়ার পরও যদি দেখেন কোনো অন্যায় কাজ সে বারবার করে যাচ্ছে, তখন বুঝতে হবে তাকে বোঝানো প্রয়োজন।

রাস্তার পশুপাখিকে আঘাত করাকে আমাদের সমাজে অনেক সময় হালকাভাবে নেওয়া হয়। কিন্তু এই নিষ্ঠুরতা অনেক সময় বড় সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে এবং প্রাণীদের প্রতি সহমর্মী মনোভাব গড়ে তুলতে শৈশবে পশুর প্রতি দয়াশীল হওয়ার শিক্ষা দেওয়া প্রতিটি পরিবারের দায়িত্ব।

  • সাইকোলজি টুডে অবলম্বনে

সম্পর্কিত