আতাউর রহমান রাইহান

দোকান থেকে খাবার কেনার সময় অধিকাংশ মানুষই প্যাকেটের গায়ে লেখা তথ্য গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। ফলে খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি আছে কি না, তা অনেকেরই অজানা থেকে যায়। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই প্রবণতা রুখতে মোড়কজাত খাবারের সামনের অংশে বিশেষ সতর্কবার্তা বা ‘ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং’ (এফওপিএল) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খসড়া ‘মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা ২০২৬’-এ উচ্চমাত্রার চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারে বিশেষ সতর্কচিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে ভোক্তারা সহজেই বুঝতে পারবেন কোন খাবারটি তাঁদের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে খসড়া প্রবিধানমালায় অনেক খাদ্যপণ্যকে এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এতে অনেক কোম্পানি আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ‘এই প্রবিধানটি বাস্তবায়িত হলে ভোক্তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারবেন। লেবেলে শুধু সতর্কবার্তাই থাকবে না, নিরক্ষর মানুষের বোঝার সুবিধার্থে ছবিও ব্যবহার করা হবে।’ তবে বেশ কিছু পণ্যকে এই প্রবিধানের বাইরে রাখা নিয়ে তিনিও উদ্বেগ জানান।
আইনটিতে যা আছে
মোড়কজাত খাবারের প্যাকেটে সব তথ্য পরিষ্কার ও সহজভাবে লিখতে হবে। কোনো ধরনের ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া যাবে না। দেশে তৈরি খাবারের লেবেল অবশ্যই বাংলায় হতে হবে। বিদেশি খাবারের মূল লেবেল অন্য ভাষায় হলে তাতে আলাদাভাবে বাংলা স্টিকার বা সাব-লেবেল যুক্ত করা বাধ্যতামূলক। নতুন খসড়া প্রবিধানমালায় এই শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে। খাবার প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের বিশেষ নিয়ম থাকলে তাও প্যাকেটে উল্লেখ করতে হবে। চিকিৎসক বা কোনো বিশেষজ্ঞের নাম ব্যবহার করে এমন কিছু লেখা যাবে না যাতে ক্রেতা বিভ্রান্ত হন। রোগ নিরাময় বা পুষ্টি নিয়ে কোনো মিথ্যা দাবি করা নিষিদ্ধ। তবে অনুমোদন নিয়ে গুণগত মানের সিল ব্যবহার করা যাবে।
খাবারের নামকরণের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নিয়ম মানতে হবে। খাবারটি গুঁড়ো, ঘনীভূত, ধূমায়িত বা হিমায়িত কি না—তা নামের সঙ্গেই থাকতে হবে। কোন উপাদান কতটুকু ব্যবহার করা হয়েছে তার ওজন বা অনুপাত উল্লেখ করতে হবে। অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান যেমন—গম, রাই, যব, চিংড়ি বা কাঁকড়া থাকলে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে হবে। জিনগত পরিবর্তিত খাবারের ক্ষেত্রে লিখতে হবে ‘জিএম খাদ্য’। দুধ থেকে তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে ননীযুক্ত বা পাস্তুরিত কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে। ঘনীভূত বা মিষ্টি দুধের পাত্রে ‘শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়’ কথাটি পরিষ্কারভাবে লিখতে হবে। এ ছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম বা ১০০ মিলি খাবারে পুষ্টির পরিমাণও উল্লেখ করতে হবে।
প্রবিধানটি সম্পর্কে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘আইনটি যদি হয় তবে যারা মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং অর্থাৎ যে প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো মোড়কজাত করা হয়, সেগুলোতে নিয়ম অনুসারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান যেমন—কতটুকু কার্বোহাইড্রেট, সুগার, ফ্যাট, চিনি বা লবণ আছে, তা উল্লেখ করতে হবে। এর মধ্যে কিছু উপাদান যেগুলোকে বলা হয় ‘নিউট্রিয়েন্ট অব কনসার্ন’ বা মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগের, তা যদি খাদ্যে থাকে তবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যেমন—লবণ ও চিনি। এগুলো কী পরিমাণ আছে তা মোড়কের লেবেলে উল্লেখ করতে হবে। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটি করতে উৎসাহিত করছে।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এটির ওপর অনেক জায়গা থেকে মতামত আসছে। এটি সমন্বয় বা হারমোনাইজেশন করার জন্য আমাদের একটি কমিটি আছে—বিভিন্ন কোম্পানি, আমাদের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সব মিলিয়ে ১২ জনের কমিটি রয়েছে। তাঁরা একটি সভা করেছেন, আরও বোধ হয় সময় লাগবে।’ ষাটটির বেশি মতামত এসেছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন মতামতগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মোটামুটি কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। খুব শিগগির হয়তো আমরা এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করতে পারব। এই মতামতগুলো বিশ্লেষণ করে আরেকটি পরামর্শ সভার প্রয়োজন হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ‘২০১৩ সালে একটি নিরাপদ খাদ্য আইন হয়েছে, সেটির অধীনে প্যাকেজিং প্রবিধান ছিল। সেটিকে নতুন করে প্রণয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। যেটিকে ফ্রন্ট অব প্যাক ওয়ার্নিং লেবেলিং বলে। এটি আমরা দেওয়ার চেষ্টা করছি শুধু অতিরিক্ত চিনি, অতিরিক্ত লবণ, অতিরিক্ত চর্বি এবং তেল-চর্বিযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে। যে খাবারগুলোতে নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি থাকে, সেখানে সতর্কবার্তা বা ওয়ার্নিং লেবেলটি বসানো থাকবে। অর্থাৎ সেসব মোড়কজাত খাদ্যের একদম সামনে সেই লেবেলগুলো থাকবে, যাতে ভোক্তারা বুঝতে পারেন যে এটির মধ্যে নির্দিষ্ট উপাদান বেশি আছে, যা তাঁদের জন্য ক্ষতিকর।’
অর্থাৎ প্যাকেটের সামনের অংশ দেখেই ভোক্তারা নিজেদের জন্য খাদ্য যাচাই করতে পারবেন বলে জানান পাবলিক হেলথ লয়ার নেটওয়ার্কের এই সদস্যসচিব। তিনি বলেন, ‘আগের যে প্যাকেজিং প্রবিধানমালা ছিল, সেটি ছিল সামনে-পেছনে সবকিছু মিলিয়ে। এই প্রবিধানমালার একটি অংশ হচ্ছে ফ্রন্ট অব প্যাক, আর বাকিগুলো হচ্ছে ব্যাক অব প্যাক বা অন্যান্য পুষ্টি সম্পর্কিত তথ্য। অন্যান্য তথ্যের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি আমরা, যেমন ফন্ট সাইজের ব্যাপারে। অনেক সময় দেখা যায় ফন্ট সাইজ ছোট হওয়ার কারণে আমরা পুষ্টি সম্পর্কিত তথ্য দেখতে পাই না। সেগুলোর ব্যাপারেও কিছু প্রবিধানমালা আছে। আবার ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিংয়ের একটি আলাদা নির্দেশিকা বা শিডিউলও দেওয়া আছে।’
তিনি বলেন, এটি ভোক্তাদের অধিকারকে আরও বেশি সুরক্ষিত করবে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলি থেকে এটি শুরু হয়েছে বলেও জানান এই আইনজীবী। তাঁর ভাষ্যে, এখন বিশ্বের নানা দেশে এই বিধান রয়েছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হলে এই ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং প্রবিধানমালায় আনা খুবই জরুরি।
সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের (সিএলপিএ) জ্যেষ্ঠ নীতিবিশ্লেষক কামরুননিছা মুন্না বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, প্যাকেটজাত খাবার ও কোমল পানীয়ের বোতলে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্স-ফ্যাটের তথ্য দেওয়া থাকলে ভোক্তারা সঠিকভাবে খাদ্য যাচাই করতে পারেন। চিলি, মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যের মোড়কের লেবেলে এ ধরনের তথ্য দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও প্যাকেটজাত খাবার এবং পানীয়তে এই তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে জনসাধারণের বোধগম্যতা ও জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে নকশাসহ সতর্কবার্তা দিতে হবে।’
এ বিষয়ে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গবেষণা করে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্স-ফ্যাটের নকশাসহ সতর্কবার্তা তৈরি করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছে বলেও জানান এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের নকশাসহ সতর্কবার্তা প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মোড়কে ব্যবহার করলে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে, যা অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে প্রবিধানমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।’
এই নীতি বিশ্লেষক আরও বলেন, খসড়া প্রবিধানমালায় মোড়কজাত খাদ্যে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিংয়ের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত খাদ্যপণ্যের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা বেশ বড়। অব্যাহতি পাওয়া পণ্যের তালিকা বেশি বড় হলে এফওপিএলের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। একই ধরনের পণ্যের মধ্যে কিছুতে লেবেল থাকবে আর কিছুতে থাকবে না—এটি নীতিগত অসংগতি তৈরি করবে। ‘অতিরিক্ত অব্যাহতি দিলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বিচ্যুতি ঘটবে। তালিকা বড় হলে কোম্পানিগুলো আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এই তালিকা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে করতে হবে।’
অব্যাহতি পাওয়া খাদ্যতালিকা বলতে যেসব খাদ্যপণ্য এই প্রবিধানের বাইরে রাখা হয়েছে সেগুলোকে বোঝানো হয়েছে। কামরুননিছা মুন্না বলেন, ‘খসড়া প্রবিধানমালায় কৃত্রিম চিনির কথা আসেনি। এতে স্যাকারিনের মতো পণ্যগুলো আইনের মারপ্যাঁচ দিয়ে বের হয়ে যেতে পারবে। আবার প্রবিধানের সব জায়গায় লবণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে যদি সোডিয়াম উল্লেখ না করা হয়, তবে টেস্টিং সল্টের মতো রাসায়নিক লবণগুলো পার পেয়ে যাবে। এই বিষয়গুলো প্রবিধানে স্পষ্ট করা দরকার।’
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘প্রবিধানটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। এখনো সংযোজন-বিয়োজন করা যাবে। আমরা চাচ্ছিলাম দ্রুততম সময়ে এটি শেষ করতে। আরও দু-একটা সভার পর এটিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব।’

দোকান থেকে খাবার কেনার সময় অধিকাংশ মানুষই প্যাকেটের গায়ে লেখা তথ্য গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। ফলে খাবারে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি আছে কি না, তা অনেকেরই অজানা থেকে যায়। জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই প্রবণতা রুখতে মোড়কজাত খাবারের সামনের অংশে বিশেষ সতর্কবার্তা বা ‘ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং’ (এফওপিএল) চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। খসড়া ‘মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা ২০২৬’-এ উচ্চমাত্রার চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাবারে বিশেষ সতর্কচিহ্ন ব্যবহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর ফলে ভোক্তারা সহজেই বুঝতে পারবেন কোন খাবারটি তাঁদের স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ বা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। তবে খসড়া প্রবিধানমালায় অনেক খাদ্যপণ্যকে এই বাধ্যবাধকতার বাইরে রাখায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, এতে অনেক কোম্পানি আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহারের সুযোগ পেতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ‘এই প্রবিধানটি বাস্তবায়িত হলে ভোক্তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে আরও সচেতন হতে পারবেন। লেবেলে শুধু সতর্কবার্তাই থাকবে না, নিরক্ষর মানুষের বোঝার সুবিধার্থে ছবিও ব্যবহার করা হবে।’ তবে বেশ কিছু পণ্যকে এই প্রবিধানের বাইরে রাখা নিয়ে তিনিও উদ্বেগ জানান।
আইনটিতে যা আছে
মোড়কজাত খাবারের প্যাকেটে সব তথ্য পরিষ্কার ও সহজভাবে লিখতে হবে। কোনো ধরনের ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া যাবে না। দেশে তৈরি খাবারের লেবেল অবশ্যই বাংলায় হতে হবে। বিদেশি খাবারের মূল লেবেল অন্য ভাষায় হলে তাতে আলাদাভাবে বাংলা স্টিকার বা সাব-লেবেল যুক্ত করা বাধ্যতামূলক। নতুন খসড়া প্রবিধানমালায় এই শর্তগুলো দেওয়া হয়েছে। খাবার প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের বিশেষ নিয়ম থাকলে তাও প্যাকেটে উল্লেখ করতে হবে। চিকিৎসক বা কোনো বিশেষজ্ঞের নাম ব্যবহার করে এমন কিছু লেখা যাবে না যাতে ক্রেতা বিভ্রান্ত হন। রোগ নিরাময় বা পুষ্টি নিয়ে কোনো মিথ্যা দাবি করা নিষিদ্ধ। তবে অনুমোদন নিয়ে গুণগত মানের সিল ব্যবহার করা যাবে।
খাবারের নামকরণের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নিয়ম মানতে হবে। খাবারটি গুঁড়ো, ঘনীভূত, ধূমায়িত বা হিমায়িত কি না—তা নামের সঙ্গেই থাকতে হবে। কোন উপাদান কতটুকু ব্যবহার করা হয়েছে তার ওজন বা অনুপাত উল্লেখ করতে হবে। অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান যেমন—গম, রাই, যব, চিংড়ি বা কাঁকড়া থাকলে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে হবে। জিনগত পরিবর্তিত খাবারের ক্ষেত্রে লিখতে হবে ‘জিএম খাদ্য’। দুধ থেকে তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে ননীযুক্ত বা পাস্তুরিত কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে। ঘনীভূত বা মিষ্টি দুধের পাত্রে ‘শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়’ কথাটি পরিষ্কারভাবে লিখতে হবে। এ ছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম বা ১০০ মিলি খাবারে পুষ্টির পরিমাণও উল্লেখ করতে হবে।
প্রবিধানটি সম্পর্কে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘আইনটি যদি হয় তবে যারা মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং অর্থাৎ যে প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো মোড়কজাত করা হয়, সেগুলোতে নিয়ম অনুসারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান যেমন—কতটুকু কার্বোহাইড্রেট, সুগার, ফ্যাট, চিনি বা লবণ আছে, তা উল্লেখ করতে হবে। এর মধ্যে কিছু উপাদান যেগুলোকে বলা হয় ‘নিউট্রিয়েন্ট অব কনসার্ন’ বা মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগের, তা যদি খাদ্যে থাকে তবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যেমন—লবণ ও চিনি। এগুলো কী পরিমাণ আছে তা মোড়কের লেবেলে উল্লেখ করতে হবে। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটি করতে উৎসাহিত করছে।’
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, ‘এটির ওপর অনেক জায়গা থেকে মতামত আসছে। এটি সমন্বয় বা হারমোনাইজেশন করার জন্য আমাদের একটি কমিটি আছে—বিভিন্ন কোম্পানি, আমাদের বিশেষজ্ঞ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসহ সব মিলিয়ে ১২ জনের কমিটি রয়েছে। তাঁরা একটি সভা করেছেন, আরও বোধ হয় সময় লাগবে।’ ষাটটির বেশি মতামত এসেছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এখন মতামতগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। মোটামুটি কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। খুব শিগগির হয়তো আমরা এটি গেজেট আকারে প্রকাশ করতে পারব। এই মতামতগুলো বিশ্লেষণ করে আরেকটি পরামর্শ সভার প্রয়োজন হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ বলেন, ‘২০১৩ সালে একটি নিরাপদ খাদ্য আইন হয়েছে, সেটির অধীনে প্যাকেজিং প্রবিধান ছিল। সেটিকে নতুন করে প্রণয়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। যেটিকে ফ্রন্ট অব প্যাক ওয়ার্নিং লেবেলিং বলে। এটি আমরা দেওয়ার চেষ্টা করছি শুধু অতিরিক্ত চিনি, অতিরিক্ত লবণ, অতিরিক্ত চর্বি এবং তেল-চর্বিযুক্ত খাবারের ক্ষেত্রে। যে খাবারগুলোতে নির্ধারিত মাত্রার অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি থাকে, সেখানে সতর্কবার্তা বা ওয়ার্নিং লেবেলটি বসানো থাকবে। অর্থাৎ সেসব মোড়কজাত খাদ্যের একদম সামনে সেই লেবেলগুলো থাকবে, যাতে ভোক্তারা বুঝতে পারেন যে এটির মধ্যে নির্দিষ্ট উপাদান বেশি আছে, যা তাঁদের জন্য ক্ষতিকর।’
অর্থাৎ প্যাকেটের সামনের অংশ দেখেই ভোক্তারা নিজেদের জন্য খাদ্য যাচাই করতে পারবেন বলে জানান পাবলিক হেলথ লয়ার নেটওয়ার্কের এই সদস্যসচিব। তিনি বলেন, ‘আগের যে প্যাকেজিং প্রবিধানমালা ছিল, সেটি ছিল সামনে-পেছনে সবকিছু মিলিয়ে। এই প্রবিধানমালার একটি অংশ হচ্ছে ফ্রন্ট অব প্যাক, আর বাকিগুলো হচ্ছে ব্যাক অব প্যাক বা অন্যান্য পুষ্টি সম্পর্কিত তথ্য। অন্যান্য তথ্যের মধ্যেও কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি আমরা, যেমন ফন্ট সাইজের ব্যাপারে। অনেক সময় দেখা যায় ফন্ট সাইজ ছোট হওয়ার কারণে আমরা পুষ্টি সম্পর্কিত তথ্য দেখতে পাই না। সেগুলোর ব্যাপারেও কিছু প্রবিধানমালা আছে। আবার ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিংয়ের একটি আলাদা নির্দেশিকা বা শিডিউলও দেওয়া আছে।’
তিনি বলেন, এটি ভোক্তাদের অধিকারকে আরও বেশি সুরক্ষিত করবে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলি থেকে এটি শুরু হয়েছে বলেও জানান এই আইনজীবী। তাঁর ভাষ্যে, এখন বিশ্বের নানা দেশে এই বিধান রয়েছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে হলে এই ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং প্রবিধানমালায় আনা খুবই জরুরি।
সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের (সিএলপিএ) জ্যেষ্ঠ নীতিবিশ্লেষক কামরুননিছা মুন্না বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, প্যাকেটজাত খাবার ও কোমল পানীয়ের বোতলে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্স-ফ্যাটের তথ্য দেওয়া থাকলে ভোক্তারা সঠিকভাবে খাদ্য যাচাই করতে পারেন। চিলি, মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যের মোড়কের লেবেলে এ ধরনের তথ্য দেওয়া হয়। আমাদের দেশেও প্যাকেটজাত খাবার এবং পানীয়তে এই তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে জনসাধারণের বোধগম্যতা ও জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে নকশাসহ সতর্কবার্তা দিতে হবে।’
এ বিষয়ে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি গবেষণা করে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ট্রান্স-ফ্যাটের নকশাসহ সতর্কবার্তা তৈরি করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে পাঠিয়েছে বলেও জানান এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ‘এ ধরনের নকশাসহ সতর্কবার্তা প্যাকেটজাত খাবার ও পানীয়ের মোড়কে ব্যবহার করলে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে, যা অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে প্রবিধানমালাটি দ্রুত চূড়ান্ত করা প্রয়োজন।’
এই নীতি বিশ্লেষক আরও বলেন, খসড়া প্রবিধানমালায় মোড়কজাত খাদ্যে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিংয়ের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত খাদ্যপণ্যের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা বেশ বড়। অব্যাহতি পাওয়া পণ্যের তালিকা বেশি বড় হলে এফওপিএলের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে। একই ধরনের পণ্যের মধ্যে কিছুতে লেবেল থাকবে আর কিছুতে থাকবে না—এটি নীতিগত অসংগতি তৈরি করবে। ‘অতিরিক্ত অব্যাহতি দিলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে বিচ্যুতি ঘটবে। তালিকা বড় হলে কোম্পানিগুলো আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহারের সুযোগ পাবে। এই তালিকা আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার আলোকে করতে হবে।’
অব্যাহতি পাওয়া খাদ্যতালিকা বলতে যেসব খাদ্যপণ্য এই প্রবিধানের বাইরে রাখা হয়েছে সেগুলোকে বোঝানো হয়েছে। কামরুননিছা মুন্না বলেন, ‘খসড়া প্রবিধানমালায় কৃত্রিম চিনির কথা আসেনি। এতে স্যাকারিনের মতো পণ্যগুলো আইনের মারপ্যাঁচ দিয়ে বের হয়ে যেতে পারবে। আবার প্রবিধানের সব জায়গায় লবণের কথা বলা হয়েছে। সেখানে যদি সোডিয়াম উল্লেখ না করা হয়, তবে টেস্টিং সল্টের মতো রাসায়নিক লবণগুলো পার পেয়ে যাবে। এই বিষয়গুলো প্রবিধানে স্পষ্ট করা দরকার।’
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘প্রবিধানটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞ কমিটি কাজ করছে। এখনো সংযোজন-বিয়োজন করা যাবে। আমরা চাচ্ছিলাম দ্রুততম সময়ে এটি শেষ করতে। আরও দু-একটা সভার পর এটিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেব।’
.png)

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা হয়েছে। শনিবার (২৭ জুন) বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের (বিওএ) উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সার্বিক সহায়তায় এই আয়োজন করা হয়।
১৮ মিনিট আগে
ইতালির রোমে নিজ বাসায় দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে নিহত একই পরিবারের তিনজন নোয়াখালীর বসুরহাট এলাকার বাসিন্দা। গতকাল শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ৮টার দিকে রাজধানী রোমের পার্শ্ববর্তী এলাকা ক্যাসালোত্তির ভিয়া মন্তিলিওর একটি অ্যাপার্টমেন্টে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এ ঘটনায় বাবুলের গ্রামের বাড়িতে শোকের মাতম চলছে।
২০ মিনিট আগে
ঢাকার আশুলিয়ায় তুরাগ নদে ভাসমান অবস্থায় মো. সুমন (১৭) নামে এক কিশোরের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে সাভার উপজেলার আশুলিয়া বাজার এলাকায় গরুর হাটের পাশে নদে ভাসমান অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়।
২ ঘণ্টা আগে
সরকার গঠনের পর প্রথম বিদেশ সফর শেষে গতকাল (২৬ জুন) রাতে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর আজ শনিবার মা ও বাবার কবর জিয়ারত করেছেন তিনি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজধানীর শেরে বাংলা নগরে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরের স্থানে পৌঁছান তিনি।
২ ঘণ্টা আগে