শ্রমবাজার নিয়ে ঢাকার আগ্রহে সাড়া নেই মালয়েশিয়ার

স্ট্রিম গ্রাফিক

বাংলাদেশের কর্মীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য মালয়েশিয়া। দেশটিতে ১৯৭৮ সাল থেকে কর্মী পাঠানো শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে একাধিকবার বন্ধ হয়ে যায় এই শ্রমবাজার। সবশেষ ২০২২ সালের আগস্ট মাসে চালু হলেও ২০২৪ সালের ৩১ মে আবারও বন্ধ হয়ে যায় কর্মী পাঠানো। এরপর থেকে একাধিকবার চেষ্টা করলেও বাজারটি চালু করতে ব্যর্থ হয় বাংলাদেশ। আর এর কারণ হিসেবে মালয়েশিয়ার সরকারের অনীহাকে দায়ী করছেন অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে সাড়া মিলছে না।

শুধু অভিবাসন সংশিষ্টরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের কমকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেও একই ভাষ্য পাওয়া যায়। তাঁদের মতেও, বাংলাদেশ থেকে বাজারটি চালু করতে নানাভাবে চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সাড়া নেই।

এ বিষয়ে মালয়েশিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের লেবার মিনিস্টার সিদ্দিকুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা কূটনৈতিকভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমাদের হাইকমিশনার মালয়েশিয়া সরকারের বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ করছে। আমাদের হাইকমিশনার ডিপ্লোমেটিক যে উইন্ডোগুলা আছে, সবগুলোই চেষ্টা করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ায় যারা আছেন, তাঁদের সাথে যোগাযোগ করা, দেখা করা, তাদের বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি আমরা মালয়েশিয়া সরকারকে রিক্রুটিং এজেন্সিরও তালিকা দিয়েছি। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাইনি।’

একই কথা জানিয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপসচিব গাজী মো. শাহেদ আনোয়ার স্ট্রিমকে বলেন, ‘মালয়েশিয়া নিয়ে এখনও তেমন কোনো আলোচনা শুরু হয়নি। আমরা কয়েক মাস আগে মালয়েশিয়া সরকারকে রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাঠাইছিলাম। কিন্তু তাঁরা এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।’

অন্তর্বর্তী সরকারের চেষ্টাতেও ছিল না সাড়া

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তবর্তীকালীন সরকার এই শ্রমবাজারটি চালু করতে একাধিকবার চেষ্টা চালায়। বাজারটি চালু করতে গত বছরের ১৩ থেকে ১৬ মে অন্তবর্তী সরকারের সাবেক প্রবাসী কল্যাণ উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার সাবেক আন্তর্জাতিক বিষয়ক সংক্রান্ত বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী মালয়েশিয়া সফর করেন। সফরকালে তাঁরা দেশটির স্বরাষ্ট্র ও মানবসম্পদ বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গে যৌথ সভায় অংশ নেন। সভা শেষে উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল এক ভিডিও বার্তায় জানান, ‘কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে মালয়েশিয়া।’

আসিফ নজরুল ও লুৎফে সিদ্দিকীর এই সফর শেষে ওই বছরের ২১ ও ২২ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নিরাপদ অভিবাসন ও কর্মসংস্থান সম্পর্কিত তৃতীয় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা। যেখানে মালয়েশিয়া সরকারের ১৪ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা। তবে সেই বৈঠক থেকেও নতুন কোনও ঘোষণা আসেনি। এমনকি বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন করার কথা থাকলেও, নির্ধারিত সময়ের ৪৫ মিনিট আগে অনিবার্য কারণ দেখিয়ে তা বাতিল করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

বৈঠক থেকে কোনো সিদ্ধান্ত না আসলেও দুই দেশের বৈঠক হওয়ার ৫ মাস পরে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে ১০টি শর্ত জুড়ে দেয় মালয়েশিয়া সরকার। যার থেকে তিনটি শর্ত বাতিলের দাবি জানিয়ে গত বছরের ৪ নভেম্বর মালয়েশিয়া সরকারকে চিঠি দেয় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। তবে সেই চিঠির কোনো উত্তর দেয়নি দেশটির সরকার। শুধু চিঠির উত্তর নয় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকার বিষয়ে কিছু জানায়নি দেশটির সরকার।

আওয়ামী আমলে হয়েছিল সিন্ডিকেটের বাজার

আওয়ামী লীগ সরকারের দ্বিতীয় আমলে ২০১৫ সালে কর্মী পাঠানোর নামে ১০টি রিক্রুর্টি এজেন্সির সিন্ডিকেট তৈরি করে জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা। এই সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম বেড়ে গেলে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয় মালয়েশিয়া সরকার। এরপর দুই দেশের মধ্যে অনেক আলোচনার পর ২০২২ সালের আগস্টে বাজারটির পুনরায় চালু করে মালয়েশিয়া সরকার। কিন্তু সে সময় বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের (আরএল-৫৪৯) স্বত্বাধিকারী ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন এবং মালয়েশিয়ার আইটি কম্পানি বেসটিনেটের মালিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ান নাগরিক দাতোশ্রি আমিন নুরের নেতৃত্বে অনলাইন পদ্ধতি এফডব্লিউসিএমএসের মাধ্যমে একটি সিন্ডিকেট তৈরি করা হয়। পরে ১০১টি রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেটে পরিণত হয়।

কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াকে সিন্ডিকেটমুক্ত করে বাজারটি চালু করার তাগিদ দিচ্ছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। তিনি স্ট্রিমকে বলেন, ‘মালয়েশিয়া শ্রমবাজারটা দীর্ঘ দিন ধরে বন্ধ আছে। এটা চালু হওয়া খুবই প্রয়োজন। কিন্তু সেটা অবশ্যই সিন্ডিকেট মুক্তভাবে চালু করতে হবে। কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মন্ত্রী-এমপিদের সিন্ডিকেটের কারণে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে, কর্মীদের অতিরিক্ত অভিবাসন খরচ দিতে হয়েছে। এতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা যেমন ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হইছে তেমন কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হইছে। ফলে সরকারের বাজার চালুর পাশাপাশি লক্ষ্য রাখতে হবে এই ধরনের কোনো প্রকার সিন্ডিকেশন এই গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে কোনোভাবেই না হয়।’

মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর জন্য কর্মীপ্রতি সরকার নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয় ছিলো ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। তবে ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যত কর্মী গিছে সবাই ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা খরচ করেছে। জনশক্তি রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, কর্মীদের ৪ থেকে ৬ লাখ টাকা দেওয়া লাগত। কারণ, ছিল সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের কর্মীপ্রতি ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা করে দিতে হতো। এ ছাড়া মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর তালিকায় অন্তর্ভূক্ত হতে তাঁদের ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আওয়ামী সরকারের আমলে মালয়েশিয়ার বাজার চালু করতে যে সমাঝোতা স্মারক বাংলাদেশ সরকার স্বাক্ষর করেছে, সেই সমাঝোতা স্মারক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সিন্ডিকেট করার জন্যই করা হয়েছিল। সমাঝোতা স্মারকে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কোন কোন রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠাবে, তা নির্ধারণ করবে মালয়েশিয়া সরকার। তারা স্বচ্ছভাবে অনলাইন পদ্ধতিতে রিক্রুটিং এজেন্সি নির্ধারণ করবে। কিন্তু সেখানে কোনো স্বচ্ছতা ছিল না। রুহুল আমিন স্বপন ও দাতুশ্রী আমিন তাঁদের নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী রিক্রুটিং এজেন্সি নির্ধারণ করেছেন। তাঁরা নির্ধারণকৃত প্রতিটি এজেন্সি থেকে পাঁচ-সাত কোটি টাকা নিয়ে তাদের নির্ধারণ করেছেন।’

আর সিন্ডিকেট মুক্ত না হলে বাজারটির একই পরিণতি হবে বলে জানিয়েছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘মালয়েশিয়া শ্রমবাজার চালু করা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কিছুটা আলাপ করেছিল। কিন্তু খুব বেশি অগ্রগতি করতে পারেনি। কারণ, এই বাজারের ক্ষেত্রে দুই দেশেরই সিন্ডিকেট নিয়ে একটা সমস্যা রয়েছে। আর সিন্ডিকেটের কারণেই বৈধভাবে যারা যেতে চায়, তারা ওখানে গিয়ে কাজ পায় না বা অনেক বেশি টাকা দিতে হয়। ফলে নতুনভাবে এই বাজার চালু করার ক্ষেত্রে এই জিনিসগুলো ঠিক করে নেওয়া ভালো। এর ফলে আমি বলবো, তাড়াহুড়া না করে একটা প্ল্যানিং দরকার। বিশেষ করে কূটনৈতিকভাবে কী নেগোশিয়েট করতে পারি অতীতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে এবং সেই অনুযায়ী আমরা কী কী জিনিস অফার করতে পারি। আমরা যদি আমাদের জায়গাটা ঠিক করতে পারি এবং যারা এর আগে অতীতে নিয়ম ভেঙেছে তাদের ব্যাপারে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও যদি মালয়েশিয়ার সঙ্গে নেগোশিয়েট করা যায়, তাহলে কিন্তু একটা ভালো জায়গায় যাওয়ার সুযোগ আছে।’

নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে ৫ বার বন্ধ হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৮ সালে ২৩ জন কর্মী যাওয়ার মধ্য দিয়ে চালু হয় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। তবে এর পরের বছর দেশটিতে কোনো কর্মীই যায়নি। ১৯৮০ সালে আবারও দেশটিতে মাত্র তিনজন কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। এরপর আবার দুই বছর দেশটিতে কোনও কর্মী যাননি। দুই বছর পর আবার ১৯৮৩ সালে মালয়েশিয়ায় ২৩ জন কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। এরপর ১৯৮৬ সালে সর্বোচ্চ ৫৩০ জন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়ার পর বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।

দীর্ঘ ৬ বছর বন্ধ থাকার পর ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে দুই দেশের মধ্যে জনশক্তি নিয়োগের চুক্তি হয়। কিন্তু চুক্তি হওয়ার দুই বছরের মধ্যে ১৯৯৪ সালে শ্রমবাজারটি দ্বিতীয়বারের মতো বন্ধ হয়ে যায়। পরে ১৯৯৬ সালে আবার শ্রমবাজারটি চালু হয়।

এরপর ২০০০ সালে নিজেদের চাহিদা বিবেচনায় সে দেশের সরকার বিশেষ অনুমোদনের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিয়োগের অনুমতি দেয়। ২০০৬ সালে আবারও কর্মী পাঠানো শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু বিপুল সংখ্যক অবৈধ বাংলাদেশি ধরা পড়ার পর ২০০৯ সালে তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর দুই দেশের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে ২০১২ সালে পুরোনো চুক্তি বাতিল করে নতুন চুক্তি হয়। এই চুক্তির পর ২০১৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে আবার বাংলাদেশি কর্মীরা মালয়েশিয়া যাওয়া শুরু করে। কিন্তু কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যসহ নানা অভিযোগে ২০১৮ সালে চতুর্থবারের মতো বন্ধ মালয়েশিয়া সরকার।

২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সরকার কর্মী প্রেরণ বিষয়ে একটি সমঝোতা স্বারক সই করে। যার ভিত্তিতে ২০২২ সালের আগস্ট মাস থেকে কর্মী পাঠানো শুরু করে বাংলাদেশ। কিন্তু আবারও সিন্ডিকেটের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পঞ্চমবারের মতো ২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়া শ্রমবাজার।

সম্পর্কিত