পরবর্তী বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ২২: ০৬
শ্রীলঙ্কায় বায়ু টারবাইন দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি কৃষিজমি। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দেশ দুটির সাম্প্রতিক সংঘাত অর্থনীতিকে প্রায় অচল করে দিয়েছিল।

২০২৬ সালের মার্চে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে, তখন ক্ষেপণাস্ত্র ও পাল্টাপাল্টি হুমকির প্রভাব ওয়াশিংটন বা ব্রাসেলসে পৌঁছানোর আগেই আঘাত হানে ঢাকা, ইসলামাবাদ ও কলম্বোয়।

এই সংকট কেবল একটি ভূরাজনৈতিক সংঘাত ছিল না। এর বাস্তব রূপ দেখা গেছে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানির জন্য দীর্ঘ সারি, বন্ধ হয়ে যাওয়া রেস্তোরাঁ এবং বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাটে। সাধারণ মানুষকে নিত্যদিনের জীবনযাত্রায় এর মূল্য দিতে হয়েছে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা— তিনটি দেশই নিজেদের প্রয়োজনীয় তেলের বড় অংশ আমদানি করে। দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ তেল মজুত প্রায় নেই বললেই চলে। আবার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের দাম নিয়ন্ত্রণ করার মতো ক্ষমতাও নেই। ফলে এমন একটি যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ তাদের বহন করতে হয়েছে, যে যুদ্ধের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এটি নতুন অভিজ্ঞতা নয়। ২০০৮ সালের তেলের দামের উল্লম্ফন, ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর গ্যাস সরবরাহ সংকট— সব ঘটনাই একই দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করেছে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এই দেশগুলোকে বারবার বৈশ্বিক সংকটের সামনে অরক্ষিত করে তুলেছে।

তবে ২০২৬ সালের পরিস্থিতির একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। এখন বিকল্প জ্বালানি প্রযুক্তি শুধু বিদ্যমান নয়, আগের তুলনায় অনেক বেশি সাশ্রয়ীও। এই তিন দেশের কয়েকটি ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

এখন মূল প্রশ্ন হলো, এসব দেশ কি পরবর্তী সংকট আসার আগেই নিজেদের জ্বালানি কাঠামো বদলাবে, নাকি আগের মতো সংকট দেখা দেওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেবে?

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে বিদ্যুৎ, পরিবহন ও কৃষি— এই তিন গুরুত্বপূর্ণ খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে যেসব সমাধানের সম্ভাবনা দেখা গেছে, সেগুলোকে আরও বড় পরিসরে বাস্তবায়ন করতে হবে।

জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা কমানোর চ্যালেঞ্জ

এই তিন দেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান কাঠামো। বৈশ্বিক বাজারে গ্যাস বা তেলের দাম বাড়লেই তার প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ও ভোক্তার ওপর পড়ে। দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার যতই বাড়ুক না কেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে এই ঝুঁকি থেকেই যায়।

বাংলাদেশের উৎপাদিত ৪২ শতাংশ বিদ্যুৎ গ্যাসভিত্তিক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার ৬৫ শতাংশ পূরণ হয়েছে আমদানিনির্ভর জ্বালানি দিয়ে।

শ্রীলঙ্কার বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেও তেল ও কয়লার ভূমিকা এখনো বড়। দেশটির রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সংস্থা সিলন ইলেকট্রিসিটি বোর্ড উল্লেখযোগ্য পরিমাণে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। ফলে জ্বালানি আমদানি দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্যের বড় ব্যয়ের একটি অংশ হয়ে আছে।

পাকিস্তানের পরিস্থিতিও একই রকম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ফার্নেস অয়েল ও আমদানিকৃত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রায় অলস পড়ে ছিল। এসব কেন্দ্রের গড় ব্যবহার হার ছিল যথাক্রমে মাত্র ২ শতাংশ ও ২৩ শতাংশ। এলএনজি ব্যবহারকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ব্যবহারের হার ছিল ৪১ শতাংশ।

তারপরও এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রকে নির্দিষ্ট অর্থপ্রদান করতে হচ্ছে। এর ফলে পাকিস্তানের বিদ্যুৎ খাতে সক্ষমতা বাবদ বার্ষিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি। যা দেশটির মোট বিদ্যুৎ ক্রয় ব্যয়ের প্রায় ৬১ শতাংশ।

এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দেয়, বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান কাঠামো শুধু ব্যয়বহুল নয়, একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ।

এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ এখন অনেকটাই পরিষ্কার। আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোতে হবে।

পাকিস্তানের সৌরবিদ্যুৎ বিস্তার এই সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সাধারণ মানুষ নিজেদের উদ্যোগে ছোট আকারের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে দেশটির জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। থিংক ট্যাংক রিনিউয়েবলস ফার্স্ট-এর এক জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তানে ৩৮ গিগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে।

২০২০ সালের পর এই সৌরবিদ্যুৎ বিস্তার দেশটির জ্বালানি আমদানি ব্যয় প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার কমাতে সহায়তা করেছে বলে ধারণা করা হয়। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংকটের সময় এটি পাকিস্তানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে।

শ্রীলঙ্কাও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখিয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে দেশটি জলবিদ্যুৎ, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও বায়ুশক্তির মাধ্যমে মোট বিদ্যুতের ৭২ শতাংশ উৎপাদন করেছে বলে জানা যায়। ২০২৪ সালে দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন ৫ দশমিক ৮ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য সক্ষমতা তৈরির লক্ষ্য ঘোষণা করেছে।

তবে বাংলাদেশ এখনো এই দৌড়ে পিছিয়ে আছে। ২০২৫ সালে দেশের মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। অথচ দেশের সৌর ও বায়ুশক্তির সম্ভাবনা অনেক বেশি। প্রযুক্তিগতভাবে বাংলাদেশে ইউটিলিটি-স্কেলের সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা প্রায় ১৫৬ গিগাওয়াট এবং বায়ুশক্তির সম্ভাবনা ১৫০ গিগাওয়াট পর্যন্ত বলে বিবেচনা করা হয়।

বাংলাদেশের ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান গতির চেয়ে অনেক দ্রুত অগ্রসর হতে হবে।

সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের সম্প্রসারণের জন্য দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া, প্রতিযোগিতামূলক নিলামব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি প্রয়োজন। এতে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট আয় নিশ্চিত করতে পারবেন এবং প্রকল্পের শুরুতে প্রয়োজনীয় বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ সহজ হবে।

একই সঙ্গে সৌর, বায়ু ও বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তির ওপর থাকা কর ও আমদানি শুল্ক কমাতে হবে। কারণ পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থায় মোট ব্যয়ের বড় অংশই শুরুতে বিনিয়োগ করতে হয়। এনার্জি ট্রানজিশনস কমিশন এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবস্থার মোট খরচের ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত আসে প্রাথমিক মূলধন ব্যয় থেকে।

অন্যদিকে নতুন জীবাশ্ম জ্বালানি অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে। কারণ অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সক্ষমতা, ভবিষ্যতে অচল হয়ে পড়া সম্পদ এবং পরিবেশগত ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এসব বিনিয়োগের অর্থ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণে ব্যবহার করা বেশি কার্যকর হবে।

বিশ্বব্যাপী পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের জন্য বড় আকারের বিনিয়োগ প্রয়োজন। এনার্জি ট্রানজিশনস কমিশন-এর হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ও পরিবহন ব্যবস্থাকে এমন পর্যায়ে নিতে হলে বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ দরকার, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থার সমান বা কম পরিচালন ব্যয়ের একটি পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।

জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়েও এখন স্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন কেন্দ্র কখন বন্ধ হবে, কোনগুলো কীভাবে রূপান্তর করা হবে— এসব বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকা দরকার।

বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির পুনর্বিন্যাস, অপ্রয়োজনীয় বেসলোড বিদ্যুৎকেন্দ্র ধীরে ধীরে অবসরে নেওয়া এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোকে নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহার উপযোগী করা—এসব পদক্ষেপ নিতে হবে।

জ্বালানি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ শুধু কম খরচের হিসাবের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। পরিকল্পনার সময় বিবেচনায় নিতে হবে জলবায়ু ঝুঁকি এবং জ্বালানির উৎস কতটা নিজস্ব, নাকি আমদানিনির্ভর।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ গ্রিডকে আরও নমনীয় করতে হবে। এর জন্য বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থা, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা, স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি এবং উন্নত সঞ্চালন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো সহজ হবে এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষতিও কমবে।

তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে পরিবহন খাতে পরিবর্তন

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো পরিবহন খাত। তিন দেশেই তেলের সবচেয়ে বড় ব্যবহার হয় এই খাতে। বিশেষ করে দুই ও তিন চাকার যানবাহনের আধিপত্য রয়েছে, যা পাকিস্তানের মোট যানবাহনের ৮৪ শতাংশ, বাংলাদেশের ৭৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৭২ শতাংশ।

এই খাতকে বিদ্যুতায়িত করা গেলে আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমানো সম্ভব। কারণ গত এক দশকে ব্যাটারির দাম নাটকীয়ভাবে কমেছে। ২০১০ সালের তুলনায় ব্যাটারির খরচ ৯০ শতাংশের বেশি কমেছে। ফলে বৈদ্যুতিক দুই ও তিন চাকার যান এখন অনেক ক্ষেত্রেই প্রচলিত জ্বালানিচালিত যানবাহনের সঙ্গে খরচের দিক থেকে প্রতিযোগিতা করতে পারছে।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিস্তার বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল কমাতে পারে। এটি বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় ৫ শতাংশের সমান।

থিংক ট্যাংক এম্বার-এর হিসাব অনুযায়ী, সড়ক পরিবহনে আমদানিকৃত তেলের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক যান ব্যবহার করা গেলে তেল আমদানিনির্ভর দেশগুলো বছরে ৬০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জ্বালানি ব্যয় কমাতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য পরিবহন খাতের এই রূপান্তর শুধু পরিবেশগত উদ্যোগ নয়, এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়ও। কারণ তেলের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর।

সরকারগুলো পেট্রোল ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর আরোপিত কর ও শুল্কের একটি অংশ আলাদা করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের অবকাঠামো তৈরিতে ব্যবহার করতে পারে। এই অর্থ দিয়ে চার্জিং স্টেশন, সহজ শর্তের ঋণ এবং যানবাহন পরিবর্তনের জন্য সহায়তা দেওয়া সম্ভব।

শুরুতে কয়েকটি পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে বৈদ্যুতিক যান আমদানির শুল্ক কমানো, পুরোনো অভ্যন্তরীণ দহন ইঞ্জিন (আইসিই) যানবাহনের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা এবং সরকারি যানবাহনের বহরকে ধাপে ধাপে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা।

সরকারি বহরের পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সাধারণ মানুষের সামনে একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করবে এবং বাজারে বৈদ্যুতিক যানবাহনের চাহিদা বাড়াবে।

একই সঙ্গে প্রচলিত জ্বালানিচালিত যানবাহন বন্ধের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সময়সীমা নির্ধারণ করতে হবে। ইউরোপের ২০৩৫ সালের শূন্য নির্গমন যানবাহন নীতি এবং ইথিওপিয়ার ২০২৪ সালের জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যান আমদানির নিষেধাজ্ঞা এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারে।

তবে শুধু যানবাহন আমদানি পরিবর্তন করলেই হবে না। দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে নিজেদের বৈদ্যুতিক যান শিল্প, যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

এর জন্য প্রয়োজন লক্ষ্যভিত্তিক শিল্পনীতি ও আর্থিক প্রণোদনা। তাহলে জ্বালানি রূপান্তর নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। অন্যথায় একটি আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে আরেকটি আমদানি নির্ভরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।

কৃষি খাতে জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্ব

জ্বালানি সংকটের প্রভাব সবচেয়ে গভীর হলেও সবচেয়ে কম আলোচিত খাত হলো কৃষি।

পাকিস্তানের মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষির অবদান ২৪ শতাংশ। বাংলাদেশে কৃষি খাত জিডিপির ১১ দশমিক ২ শতাংশ অবদান রাখে। দেশের ৩৮ শতাংশ মানুষ এই খাতে কর্মরত। শ্রীলঙ্কায় কৃষির অবদান ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হলেও দেশটির শ্রমশক্তির এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ এই খাতের সঙ্গে যুক্ত।

তিন দেশেই গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় শিকার। কৃষকদের আয় সীমিত, ঋণ পাওয়ার সুযোগ কম এবং ডিজেল ও সারের দাম বাড়লে তাদের উৎপাদন খরচ সরাসরি বেড়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে সেচ ব্যবস্থার সৌরায়ন।

পাকিস্তানে প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষি ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ওপর নির্ভরশীল। এসব কাজে ডিজেলচালিত বা গ্রিড-সংযুক্ত টিউবওয়েল ব্যবহৃত হয়। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষকদের উৎপাদন খরচও বেড়ে যায়।

২০২৫ সালের পাঞ্জাব সোলার টিউবওয়েল প্রকল্পে ডিজেল ও বিদ্যুৎচালিত পাম্পকে সৌর পাম্পে রূপান্তরের জন্য ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই প্রকল্পে মাত্র ৮ হাজার ব্যবস্থার জন্য ৫ লাখ ৩০ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়ে।

এটি দেখিয়েছে, কৃষকদের মধ্যে সৌর সেচের চাহিদা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন।

এই ধরনের উদ্যোগকে শুধু প্রাদেশিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য একটি কেন্দ্রীয় সবুজ কৃষি অর্থায়নব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে, যেখানে কৃষকদের স্বল্প সুদের ঋণ ও সরকারি সহায়তা দেওয়া হবে।

কারণ সৌর সেচ শুধু জ্বালানি খরচ কমানোর উপায় নয় বরং এটি কৃষকদের আয় স্থিতিশীল করার এবং কৃষি উৎপাদনকে আরও নিরাপদ করার একটি কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে।

বাংলাদেশেও কৃষিতে জ্বালানি ব্যয়ের চাপ বড় সমস্যা। দেশের কৃষি খাতে সেচের পেছনে মোট কৃষি উপকরণ ব্যয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশ চলে যায়। ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরতা কৃষকদের ব্যয় বাড়িয়ে দেয়।

এই সমস্যা মোকাবিলায় সৌর সেচ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এক মিলিয়নের বেশি কৃষকের জন্য ডিজেলচালিত পাম্পকে সৌর সেচ ব্যবস্থায় রূপান্তরের লক্ষ্যে ৪২ দশমিক ৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে এই খাতে অগ্রগতি প্রত্যাশিত গতিতে হয়নি। ২০১৯ সালের পর সৌর সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বর্তমানে প্রতি বছর মাত্র কয়েক মেগাওয়াট করে সক্ষমতা বাড়ছে, যা আগের গতির তুলনায় অনেক কম।

এর মূল কারণ প্রযুক্তির অভাব নয়। সমস্যাটি মূলত অর্থায়ন ও বাস্তবায়নে। সৌর পাম্প স্থাপনের জন্য শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়। অনেক কৃষকের পক্ষে এই প্রাথমিক বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। পাশাপাশি ব্যাংকের কঠোর ঋণ ও গ্যারান্টির শর্তও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ থেকে স্পষ্ট যে, প্রযুক্তি নয়—অর্থায়ন কাঠামো এবং নীতির কার্যকর প্রয়োগই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতিও একই ধরনের। দেশটিতে এখনো ডিজেলচালিত সেচ পাম্পকে বড় পরিসরে সৌর ব্যবস্থায় রূপান্তরের জন্য কোনো সমন্বিত জাতীয় কর্মসূচি নেই।

তিনটি দেশকেই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য সৌরশক্তির সুযোগকে শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, কৃষকের আয় সুরক্ষা এবং খাদ্য নিরাপত্তার অংশ হিসেবে।

এর জন্য এমন অর্থায়নব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যা ক্ষুদ্র কৃষক ও কৃষক সমবায়ের কাছে পৌঁছাতে পারে। বহুপাক্ষিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সহায়তায় এই উদ্যোগের ভিত্তি এখনই তৈরি করা প্রয়োজন।

কারণ এটি এমন কোনো সমাধান নয়, যা আগামীকালই ফল দেবে। কিন্তু আজকের প্রস্তুতিই নির্ধারণ করবে, ভবিষ্যতের জ্বালানি সংকটে এই দেশগুলো কতটা নিরাপদ থাকবে।

জ্বালানি নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করতে হবে এখনই

হরমুজ প্রণালি এখন আবার চালু হয়েছে, যদিও আগের মতো পূর্ণ সক্ষমতায় নয়।

কিন্তু বর্তমান সংকটের শিক্ষা হলো, ভবিষ্যতে আবারও কোনো ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বা সশস্ত্র সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করতে পারে। কারণ ইতিহাস দেখিয়েছে, এক সংকট শেষ হওয়ার পর আরেক সংকটের সম্ভাবনা থেকেই যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য তাই জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো সাময়িক সংকট মোকাবিলার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনার অংশ হতে হবে।

বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক পরিবহন এবং সৌরভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থায় বিনিয়োগ শুধু জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলা করবে না, বরং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বাড়াবে।

কারণ, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে সস্তা তেলের ব্যারেল হলো সেই বস্তু, যা কোনো দেশকে কখনো কিনতেই হয়নি।

সুত্র: ডায়ালগ আর্থ

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত