লেখা:

স্বাধীনতার পর থেকে দেশের ইতিহাস বারবার গণসহিংসতা, কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়মুক্তির একই চক্রে আবর্তিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধানত দুটি দল—আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—প্রভাব বিস্তার করেছে। এই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন এক ‘জয়ীই সবকিছু পাবে’ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও সম্পদকে দলীয় ক্ষমতা সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই অবৈধ গোপন আটককেন্দ্র পরিচালনা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক বিরোধীদের ব্যাপক হারে কারাবন্দি করা হয়েছে এবং এমন একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে অপরাধে অভিযুক্ত সামরিক, গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষেত্রেই বিচারের আওতায় আনার পরিবর্তে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বৈষম্যমূলক চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া গণআন্দোলন দমন করতে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা হয়। জাতিসংঘের একটি তদন্তকারী দল তাদের পর্যবেক্ষণে জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের এই দমন-পীড়ন, যাতে শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হন, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
ওই বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। তবে সরকারের পতন সংস্কারের একটি সুযোগ তৈরি করলেও, বাংলাদেশে নৃশংস অপরাধ সংঘটনের জন্য যে কাঠামোগত পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, তা দূর করতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত নির্বাচিত সরকার—উভয়েই এমন একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি, রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর, বিচারব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে এবং সংবাদমাধ্যম বহু বছরের রাষ্ট্রীয় ও ব্যবসায়িক প্রভাবের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
একই সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বিস্তৃত হওয়া উগ্র ইসলামপন্থী নেটওয়ার্ক ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক কাঠামো ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে চলেছে। পাশাপাশি গণপিটুনি ও জনতার সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৫ জেলায় এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা একদিকে আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা এবং অন্যদিকে সংগঠিত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর প্রবণতার প্রতিফলন।
এই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিগুলো বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যাগত বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতিজনিত দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। ভূমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি এবং সীমিত সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যা অতীতে শোষণ, মানবপাচার এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিবেশী মিয়ানমারে নৃশংস অপরাধের শিকার হয়ে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি এবং সীমিত সম্পদের শরণার্থী শিবিরে বসবাস উগ্রপন্থার বিস্তার ও অপরাধচক্রের শোষণের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্যদিকে হিন্দু, খ্রিস্টান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু ধারাবাহিকভাবে সহিংসতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষ কয়েক দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত বহন করছে। বিভিন্ন গবেষক ও মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দেশে এমন একটি ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যার অন্যতম কারণ ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম। এসব ঘটনা শুধু প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীদের নয়, তাঁদের পরিবার, স্বজন এবং বৃহত্তর সমাজের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গবেষণায় মানসিক আঘাত, সহিংসতা এবং উগ্রবাদের মধ্যে অন্তর্নিহিত সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ অ্যাট্রোসিটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট: দ্য চ্যালেঞ্জেস অ্যাহেড ফর দ্য নিউ গভর্নমেন্ট শীর্ষক গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে নৃশংস অপরাধের ঝুঁকির সাতটি কাঠামোগত উপাদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেছি। এই উপাদানগুলো হলো—সামরিকীকৃত ও জবাবদিহিহীন নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা বাহিনী, উগ্র ইসলামপন্থী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমতার মনোভাব না থাকা ও বিরোধ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানি এবং জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতিজনিত চাপ, যার মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিও অন্তর্ভুক্ত।
আমাদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, এসব উপাদান সামাজিক সংহতি দুর্বল করে, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ায় এবং সহিংসতা প্রতিরোধের সক্ষমতা ক্ষয় করে। ফলে গণবিক্ষোভ, সন্ত্রাসী হামলা, অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণ কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো সহজেই নৃশংস অপরাধে রূপ নিতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে জাতিসংঘ যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, সেটিও এই ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণ। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমাদের সিদ্ধান্ত হলো, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উন্মুক্ততা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশ এখনো নৃশংস অপরাধের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে সরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। যদিও এই প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ নয়, তবু এটি ভুক্তভোগীদের জন্য আংশিক প্রতিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার শাস্তিহীন থাকবে না—এমন একটি বার্তা দেয়।
আমাদের মতে, এই অগ্রগতিকে আরও শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সবার জন্য সমান ও নিরপেক্ষ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এতে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, সহিংসতার প্রবণতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ কমবে এবং সামাজিক সংহতি জোরদার হবে।
নৃশংস অপরাধ প্রতিরোধ কেবল নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার প্রয়োজন। কাঠামোগত ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করে এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
স্কুল অফ পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড
(বাংলাদেশ অ্যাট্রোসিটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট: দ্য চ্যালেঞ্জেস অ্যাহেড ফর দ্য নিউ গভর্নমেন্ট শীর্ষক গবেষণাপত্রের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ)

স্বাধীনতার পর থেকে দেশের ইতিহাস বারবার গণসহিংসতা, কর্তৃত্ববাদ, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়মুক্তির একই চক্রে আবর্তিত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধানত দুটি দল—আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—প্রভাব বিস্তার করেছে। এই দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন এক ‘জয়ীই সবকিছু পাবে’ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও সম্পদকে দলীয় ক্ষমতা সুসংহত করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। এ সময় নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই অবৈধ গোপন আটককেন্দ্র পরিচালনা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক বিরোধীদের ব্যাপক হারে কারাবন্দি করা হয়েছে এবং এমন একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে অপরাধে অভিযুক্ত সামরিক, গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষেত্রেই বিচারের আওতায় আনার পরিবর্তে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে বৈষম্যমূলক চাকরির কোটা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া গণআন্দোলন দমন করতে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করা হয়। জাতিসংঘের একটি তদন্তকারী দল তাদের পর্যবেক্ষণে জানায়, শেখ হাসিনা সরকারের এই দমন-পীড়ন, যাতে শত শত বেসামরিক মানুষ নিহত হন, তা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে।
ওই বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। তবে সরকারের পতন সংস্কারের একটি সুযোগ তৈরি করলেও, বাংলাদেশে নৃশংস অপরাধ সংঘটনের জন্য যে কাঠামোগত পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান, তা দূর করতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত নির্বাচিত সরকার—উভয়েই এমন একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব গ্রহণ করে, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রয়োজনীয় সংস্কার হয়নি, রাজনৈতিক মেরুকরণ গভীর, বিচারব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপের মধ্যে এবং সংবাদমাধ্যম বহু বছরের রাষ্ট্রীয় ও ব্যবসায়িক প্রভাবের কারণে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
একই সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বিস্তৃত হওয়া উগ্র ইসলামপন্থী নেটওয়ার্ক ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক কাঠামো ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে চলেছে। পাশাপাশি গণপিটুনি ও জনতার সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৪৫ জেলায় এ ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা একদিকে আনুষ্ঠানিক বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা এবং অন্যদিকে সংগঠিত উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর প্রবণতার প্রতিফলন।
এই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকিগুলো বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যাগত বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতিজনিত দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর একটি বাংলাদেশ। ভূমি হারানো, বাস্তুচ্যুতি এবং সীমিত সম্পদের ওপর বাড়তি চাপ এমন পরিস্থিতি তৈরি করে, যা অতীতে শোষণ, মানবপাচার এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিবেশী মিয়ানমারে নৃশংস অপরাধের শিকার হয়ে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর দীর্ঘমেয়াদি বাস্তুচ্যুতি এবং সীমিত সম্পদের শরণার্থী শিবিরে বসবাস উগ্রপন্থার বিস্তার ও অপরাধচক্রের শোষণের জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে। অন্যদিকে হিন্দু, খ্রিস্টান এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু ধারাবাহিকভাবে সহিংসতা ও কাঠামোগত বৈষম্যের শিকার হয়েছে।
বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষ কয়েক দশকের কর্তৃত্ববাদী শাসনের কারণে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক আঘাত বহন করছে। বিভিন্ন গবেষক ও মানবাধিকার সংস্থার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, দেশে এমন একটি ভয়ের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যার অন্যতম কারণ ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিয়মিত বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুম। এসব ঘটনা শুধু প্রত্যক্ষ ভুক্তভোগীদের নয়, তাঁদের পরিবার, স্বজন এবং বৃহত্তর সমাজের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন গবেষণায় মানসিক আঘাত, সহিংসতা এবং উগ্রবাদের মধ্যে অন্তর্নিহিত সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত বাংলাদেশ অ্যাট্রোসিটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট: দ্য চ্যালেঞ্জেস অ্যাহেড ফর দ্য নিউ গভর্নমেন্ট শীর্ষক গবেষণাপত্রে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে নৃশংস অপরাধের ঝুঁকির সাতটি কাঠামোগত উপাদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করেছি। এই উপাদানগুলো হলো—সামরিকীকৃত ও জবাবদিহিহীন নিরাপত্তা এবং গোয়েন্দা বাহিনী, উগ্র ইসলামপন্থী নেটওয়ার্কের উপস্থিতি, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমতার মনোভাব না থাকা ও বিরোধ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর নিপীড়ন, ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সহিংসতায় উসকানি এবং জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতিজনিত চাপ, যার মধ্যে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ঝুঁকিও অন্তর্ভুক্ত।
আমাদের মূল্যায়নে দেখা গেছে, এসব উপাদান সামাজিক সংহতি দুর্বল করে, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বাড়ায় এবং সহিংসতা প্রতিরোধের সক্ষমতা ক্ষয় করে। ফলে গণবিক্ষোভ, সন্ত্রাসী হামলা, অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর আক্রমণ কিংবা নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতার মতো ঘটনাগুলো সহজেই নৃশংস অপরাধে রূপ নিতে পারে। ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে বলে জাতিসংঘ যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, সেটিও এই ঝুঁকির বাস্তব উদাহরণ। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে আমাদের সিদ্ধান্ত হলো, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক উন্মুক্ততা ও গণতান্ত্রিক সংস্কারের কিছু ইতিবাচক লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশ এখনো নৃশংস অপরাধের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে বাংলাদেশ অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক সহিংসতাসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি থেকে সরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। যদিও এই প্রক্রিয়া এখনো সম্পূর্ণ নয়, তবু এটি ভুক্তভোগীদের জন্য আংশিক প্রতিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার শাস্তিহীন থাকবে না—এমন একটি বার্তা দেয়।
আমাদের মতে, এই অগ্রগতিকে আরও শক্তিশালী করতে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সবার জন্য সমান ও নিরপেক্ষ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এতে রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে, সহিংসতার প্রবণতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণ কমবে এবং সামাজিক সংহতি জোরদার হবে।
নৃশংস অপরাধ প্রতিরোধ কেবল নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অন্তর্ভুক্তি এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার প্রয়োজন। কাঠামোগত ঝুঁকিগুলো মোকাবিলা করে এবং জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার সাম্প্রতিক অগ্রগতিকে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ আরও স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে।
স্কুল অফ পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ, ইউনিভার্সিটি অব কুইন্সল্যান্ড
(বাংলাদেশ অ্যাট্রোসিটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট: দ্য চ্যালেঞ্জেস অ্যাহেড ফর দ্য নিউ গভর্নমেন্ট শীর্ষক গবেষণাপত্রের নির্বাচিত অংশের অনুবাদ)
.png)

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে তুমুল বর্ষা এখন। ভারী বৃষ্টি-বাদলে দক্ষিণ সীমান্তের আশ্রয়শিবিরগুলোতে ভূমিধসে বহু বাসিন্দা মারা যাচ্ছেন। ৫ জুলাই বিকেল থেকে ৬ জুলাই সকাল পর্যন্ত অল্প কয়েক ঘণ্টায় উখিয়ায় বিভিন্ন ক্যাম্পে কয়েক ডজন জায়গায় টিলার মাটি ধসে পড়ে।
৩১ মিনিট আগে
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে হাইকোর্টের রায় আপিল বিভাগে বহাল থাকাটাই ছিল প্রত্যাশিত। মাঠে থাকা রাজনৈতিক দল আর নাগরিক সমাজও এ বিষয়ে একমত। আপিল বিভাগ এ সংক্রান্ত কিছু বিষয়ের নিষ্পত্তি জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। সংসদ জনগণ প্রদত্ত সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী।
১ ঘণ্টা আগে
ভবিষ্যতে কোনো সরকার যেন সংবিধানকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে না পারে, সেজন্য সাংবিধানিক কাঠামোতে পর্যাপ্ত রক্ষাকবচ প্রয়োজন। বর্তমানে আমাদের সামনে তিনটি বড় রক্ষাকবচ তৈরি হলো: প্রথমত, সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা; দ্বিতীয়ত, গণভোট; এবং তৃতীয়ত, উচ্চ আদালতের বিচারিক পর্যালোচনা।
৩ ঘণ্টা আগে
পশ্চিমবঙ্গেও কি উত্তরপ্রদেশের মতো পুলিশি এনকাউন্টারের নতুন সংস্কৃতির সূচনা হলো? বারুইপুরের ১১ বছরের নাবালিকা যৌন নির্যাতন ও খুন মামলার অন্যতম অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের পুলিশি এনকাউন্টারে মৃত্যুর পর এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায়।
৭ ঘণ্টা আগে