আজ বিশ্ব কাবাব দিবস

ইতিহাসের যে গন্ধ মেলে কাবাবের ধোঁয়ায়

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ২০: ০৬
ইতিহাসের যে গন্ধ মেলে কাবাবের ধোঁয়ায়। স্ট্রিম গ্রাফিক

আমরা অনেকেই কাবাব খেতে খুব পছন্দ করি। এই খাবারের নাম শুনলেই সাধারণত মাথায় আসে মধ্যপ্রাচ্য বা তুরস্কের কথা। একে ভারতীয় খাবার বলে মনে হয় না। আসলে কাবাবের উৎপত্তি এবং ভারতীয় উপমহাদেশে এর বিস্তার নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে নানা মত রয়েছে।

ইতিহাসবিদদের অনেকের মতে নবম শতাব্দীতে মধ্যপ্রাচ্যের সমরখন্দ শহরে কাবাবের উৎপত্তি। এটি পারস্য, ইরাক আর আরবের ঐতিহ্যবাহী পদ। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে যেমন মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে গেছে, তেমনি ভাষা, সংস্কৃতি ও খাবারও ছড়িয়ে পড়েছে। কাবাবও সম্ভবত সেই পথ ধরে পারস্য, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে সপ্তদশ শতাব্দীতে উপমহাদেশে এসে স্থানীয় মসলা ও রান্নার কৌশলের সঙ্গে মিশে নতুন স্বাদ ও বৈচিত্র্য পেয়েছে।

আরেকটি মত অনুযায়ী, প্রাচীন সিল্ক রোড দিয়ে যাতায়াতকারী বণিক ও যোদ্ধাদের হাত ধরেই আগুনে ঝলসানো মাংস রান্নার পদ্ধতি বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। তবে ইতিহাসবিদদের অনেকেই মনে করেন, কাবাবের ইতিহাস এতটা সরল নয়। এর উৎপত্তিকে একক কোনো অঞ্চল, জাতি বা ঘটনার সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা কঠিন।

কিছু ভারতীয় ঐতিহাসিকের ধারণা, কাবাবের মতো আগুনে ঝলসানো মাংসের খাবার ভারতীয় উপমহাদেশেও প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। এর নাম অবশ্য কাবাব ছিল না। শিকার করা পশুর মাংস লোহার শিকে গেঁথে আগুনে ঝলসে খাওয়ার রীতি এ অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যেত। পরে সুলতানি ও মুঘল আমলে এই রান্নায় স্থানীয় মসলা, দই, ঘি ও শুকনো ফল যুক্ত হওয়ায় কাবাব আরও বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

ভারতে এসে কাবাবের স্বাদ ও ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। হরিয়ালি কাবাব, দই কাবাব, পনির টিক্কা, টুন্ডে কাবাব, টিক্কা কাবাব, শামি কাবাব ভারতীয় রন্ধনশৈলীর নিজস্ব সৃষ্টি।

বিখ্যাত পর্যটক ইবন বতুতা চতুর্দশ শতকে ভারত ভ্রমণ করেছিলেন। দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দরবারে অবস্থানকালে তিনি রাজকীয় ভোজ, মাংসের বিভিন্ন পদ এবং শিকে গেঁথে ঝলসানো মাংসের উল্লেখ করেন। তবে তখন ভারতে মুঘল শাসন শুরু হয়নি। মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয় আরও প্রায় দুই শতাব্দী পরে, ১৫২৬ সালে। পরবর্তী সময়ে মুঘলদের রাজকীয় রান্নাঘরে মধ্য এশীয়, পারস্য ও আফগান রন্ধনশৈলীর সঙ্গে ভারতীয় মসলা ও উপকরণের সংমিশ্রণ ঘটে।

গবেষকদের মতে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে একসময় নিরামিষ খাবারের প্রাধান্য ছিল। এ কারণে মাংসের অনেক পদকেই সাধারণভাবে বহিরাগত খাবার বলে মনে করা হয়। তবে রাজস্থানে শিকার করা পশুর মাংস মসলা মাখিয়ে আগুনে ঝলসানোর পুরোনো রীতি ছিল। সেই পদ্ধতিতে রান্না করা ‘সুলা’ বা ‘মাঁস কা সুলা’কে অনেক গবেষক ভারতীয় কাবাবের প্রাচীন ধরনগুলোর একটি বলে মনে করেন। ঐতিহ্যগতভাবে এটি হরিণ কিংবা অন্য শিকার করা পশুর মাংস দিয়ে তৈরি হতো।

ভারতে এসে কাবাবের স্বাদ ও ধরনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। হরিয়ালি কাবাব, দই কাবাব, পনির টিক্কা, টুন্ডে কাবাব, টিক্কা কাবাব, শামি কাবাব ভারতীয় রন্ধনশৈলীর নিজস্ব সৃষ্টি। শুধু তাই নয়, নিরামিষ কাবাবের ধারণাও ভারতের অবদান। কাবাবে পনির বা আলুর ব্যবহার পৃথিবীর অন্য কোথাও তেমন দেখা যায় না।

ভারতে কাবাবের ইতিহাসের সঙ্গে তন্দুরের সম্পর্ক বহু পুরোনো। তন্দুর হলো নলাকার মাটির তৈরি বিশেষ ধরনের চুলা, যেখানে উচ্চ তাপে মাংস ঝলসানো এবং রুটি সেঁকা হয়।

কাবাব। সংগৃহীত ছবি
কাবাব। সংগৃহীত ছবি

ভারতীয় শেফরা সাধারণত নলাকার মাটির তন্দুরে কাবাব রান্না করেন। এই তন্দুরের ভেতরের তাপমাত্রা প্রায় ৪৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা সিন্ধু সভ্যতার বিভিন্ন শহর, যেমন ভারতের কালীবঙ্গান এবং পাকিস্তানের হরপ্পা থেকে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ২৬০০ সালের তন্দুরের সন্ধান পেয়েছেন। তবে তখন এগুলোকে 'তন্দুর' বলা হতো না। 'তন্দুর' শব্দটি এসেছে ফার্সি 'তন্নুর' থেকে, আর সংস্কৃতে এর নাম ছিল 'কন্দু'।

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার লেখাতেও গরম চুলার দেয়ালে রুটি সেঁকার বর্ণনা পাওয়া যায়। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের কয়েকটি রন্ধনবিষয়ক নথিতে গরম চুলার দেয়ালে খামিরবিহীন রুটি সেঁকার পদ্ধতির উল্লেখ রয়েছে। বর্তমান নান বা তন্দুরি রুটি তৈরির কৌশলের সঙ্গে এ পদ্ধতির যথেষ্ট মিল দেখা যায়।

সিন্ধু সভ্যতার কিছু প্রত্নস্থলে এ ধরনের চুলার পাশে বড় আকারের পাখির হাড়ও পাওয়া গেছে। প্রথমে এগুলোকে গৃহপালিত মুরগির হাড় মনে করা হলেও পরবর্তী বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, সেগুলো সম্ভবত বুনো মুরগি বা জংলি মোরগের হাড়। কারণ ওই সময়ে মুরগি গৃহপালিত হওয়ার প্রক্রিয়া পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।

তবে সিন্ধু সভ্যতার মানুষ এসব চুলায় ঠিক কীভাবে মাংস রান্না করত, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। সিন্ধু সভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধার এখনো সম্ভব না হওয়ায় তাদের রান্নার পদ্ধতি সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের ভিত্তিতেই ধারণা করতে হয়।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত