রোহিঙ্গা সুনামির নবম বর্ষপূর্তিতে দক্ষিণ সীমান্তে বাড়তি জটিলতা

প্রকাশ : ০৯ জুলাই ২০২৬, ১৯: ৪৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

আগামী মাসে বাংলাদেশমুখী রোহিঙ্গা সুনামির ৯ বছর পূর্ণ হবে। নবম বার্ষিকী এই মানবিক সংকটকে বাড়তি দুর্দশাময় করে তুলছে।

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে তুমুল বর্ষা এখন। ভারী বৃষ্টি-বাদলে দক্ষিণ সীমান্তের আশ্রয়শিবিরগুলোতে ভূমিধসে বহু বাসিন্দা মারা যাচ্ছেন। ৫ জুলাই বিকেল থেকে ৬ জুলাই সকাল পর্যন্ত অল্প কয়েক ঘণ্টায় উখিয়ায় বিভিন্ন ক্যাম্পে কয়েক ডজন জায়গায় টিলার মাটি ধসে পড়ে। এতে মারা গেছেন ৮ জন। ২০২১ থেকে এরকম মৃত্যুর ঘটনা প্রায় ৫০। ৭ জুলাই ইউএনএইচসিআর বলেছে কেবল এ সপ্তাহে পূর্ববর্তী ৪ দিনে ১৬ হাজার রোহিঙ্গা ভারী বর্ষণে বিপদে পড়েছে। মৃতের সংখ্যা ১০।

এরকম ঘটছে প্রতি বর্ষা মওসুমে। গ্রীষ্মে এই মানুষরা মারা যায় অগ্নিকাণ্ডে। প্রতিবছর বিভিন্ন শিবিরে বড় আকারে আগুন লাগার ঘটনা ঘটছে।

এবার ভারী বৃষ্টি শুরুর প্রথমেই ভূমিধস ব্যাপক আকার নিয়েছে। ভবিষ্যতে এরকম ঘটনা আরও বাড়তে পারে ভেবে অনেক শরণার্থীকে সরানোর উদ্যোগ চলছে।

রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের জন্যও এরকম অবস্থা অসহনীয়। দক্ষিণাঞ্চল আগে থেকে ঘনবসতিভরা এবং জলবায়ু উপদ্রুত। বিদেশ থেকে আসা মানুষকে নিরাপদ বসতি করে দেয়ার মতো অঞ্চল সেখানে কম। সেকারণেই একসময় রোহিঙ্গাদের একাংশকে ভাসানচর নেওয়া হয়। এরকম আনা-নেওয়া-পুনর্বাসনের জন্য বাড়তি সম্পদপ্রবাহ নেই এখন।

ইউক্রেন, গাজা ও ইরান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক দাতাদের তহবিল প্রবাহের অভিমুখ অনেক পাল্টে গেছে। আবার, রোহিঙ্গাদের বড় সংখ্যায় নাড়াচাড়ার কাঠামোগত পার্শ্বফল হিসেবে অনেকে তারা বাংলাদেশের মূলস্রোতে মিশে যাচ্ছে। সাগর পথে অনেক পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই রওয়ানা দিচ্ছে দূরদেশে। তাতে মানব পাচারের দুর্নাম হচ্ছে বাংলাদেশের। ঠিক এই সময়েই উত্তর আরাকান থেকে নতুন করে রোহিঙ্গা জনস্রোতের বাস্তব শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ‘তাতমা-দ’ নামে পরিচিত মিয়ানমার আর্মির সঙ্গে বাংলাদেশ লাগোয়া প্রদেশটির দুই দিকে স্থানীয় আরাকান আর্মির সংঘাত তীব্রতা পেয়েছে।

নতুন যুদ্ধ, জাতিগত মেরুকরণ এবং শরণার্থীর শঙ্কা

আরাকানের উত্তরাঞ্চলে তাতমা-দ ব্যাপক বোমা ফেলছে এখন। এখানকার মংডু ও সন্নিহিত অঞ্চলে রোহিঙ্গা বসতি অনেক। প্রদেশের দক্ষিণেও যুদ্ধ চলছে আরাকান-বাগো সীমান্তে।

আরাকানের একেবারে দক্ষিণের জেলা থানদেউ। সেখানে বাগোর পাদাং টাউনশিপের সঙ্গে যে ছোট সীমান্ত রয়েছে সেই দিক দিয়ে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে তীব্রতায় আরাকান আর্মিকে কোনঠাসা করার উদ্যোগ নিয়েছে তাতমা-দ। ফলে যুদ্ধ চলছে দুই ফ্রন্টে।

তাতমা-দ’র অভিযানে আরাকানের মূল জনগোষ্ঠী রাখাইনদের বড় একাংশ প্রতিরোধে শামিল হলেও রোহিঙ্গারা তৃতীয় পক্ষ হিসেবে নিরাপদ স্থানে সরার প্রয়োজনে বাংলাদেশ রওয়ানা হতে পারে। এখনও বড় আয়তনে সেটা শুরু হয়নি, তবে শঙ্কার বাস্তবতা স্পষ্ট।

একই মুহূর্তে বান্দরবান সীমান্তে কুকি-চিন এবং খুমিদের অন্তত দুটি সশস্ত্র গ্রুপের তৎপরতাও নজর কাড়ছে অনেকের। যা অল্প-বিস্তর আরাকান পরিস্থিতির সঙ্গে সম্পর্কিত। কুকিরা মিজোরাম চিন প্রদেশেও আছে বড় সংখ্যায়। সেখানে তারা ‘জো’ নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের কুকিদের সঙ্গে এখানকার নিরাপত্তা বাহিনীর অতীতেও সংঘর্ষ হয়েছে। সম্প্রতি নতুন করে রক্তাক্ত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। খুমিদের সঙ্গে সেরকম কিছু না ঘটলেও বান্দরবানের তিন্দু’র দিকে তাদেরও মাঝে মাঝে দেখা যায়।

সশস্ত্র খুমীদের সক্রিয়তার ভরকেন্দ্র আরাকান-চিন সীমান্তের পালেতোয়া এলাকা। স্থানীয়রা একে ‘প্লাক্-ওয়া’ও বলে—যা বর্তমানে আরাকানিজদের নিয়ন্ত্রণে আছে। বান্দরবান-চিন-আরাকান-মিজোরাম ভূখন্ডের মিলনস্থলের কাছাকাছি প্লাক-ওয়া টাউন।

এখানে বিগত এক দশকে রাখাইনদের নতুন নতুন বসতি হচ্ছে। তাতে পুরোনো বাসিন্দা খুমীরা প্রায় ৩০ শতাংশের সংখ্যালঘু হয়ে গেছে। এ নিয়ে আরাকান আর্মির প্রতি খুমিদের ক্ষোভ আছে। আবার চিন প্রদেশের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক নেতারা মনে করে প্লাক-ওয়া মূলত চিনের এলাকা—যা রাখাইনরা জোর করে দখল করে আছে।

প্লাক-ওয়ার উল্টোদিকে বাংলাদেশের থানচির মারমা-প্রধান বড়মদক। আপার বড়মদকে ম্রো সম্প্রদায় অনেক। আছে খুমীরাও। একসময় এই অঞ্চলে রাখাইন জওয়ানদের দেখা গেলেও এখন একদম নেই। কোন এক জমকালো সাংগ্রাই উৎসব শেষে তাদের বিদায় নিতে হয় অত্র এলাকা থেকে।

অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, দেশ-বিদেশের নানান ধরনের গোপন, আধা-গোপন শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়াতেই প্রভাবশালী রোহিঙ্গা সংগঠকরা গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। আবার বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিগুলোও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনায় নেয়নি কখনো। আজও উভয় তরফে এরকম দূরত্ব রয়ে গেছে।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, এই সীমান্তের তৃতীয় দিক চিন প্রদেশে প্রধান দুটি গেরিলা ফ্রন্ট রয়েছে এমুহূর্তে। একটার নেতৃত্ব দিচ্ছে চিন ব্রাদারহুড এলায়েন্স বা চিবিএ এবং আরেকটার নেতৃত্বে চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা চিএনএফ। প্রথমোক্ত ফ্রন্ট কিছুটা রাখাইন বান্ধব হলেও চিএনএফ রাখাইন বিরোধী। এসব এলাকায় বিভিন্ন জাতির সম্পর্কগুলো শত্রু বা বন্ধু’র চিরস্থায়ী কোন কাঠামোতে নেই। প্রায়ই তাতে অদল-বদল হয়।

বর্তমান মুহূর্তে প্লাক-ওয়ায় খুমী ও চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের রাখাইন বিরোধী ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে তাতমা-দ তাদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে বলে জানা যায়। এতে আরাকান আর্মি রাজ্যের দক্ষিণে বহুশক্তির পাল্টা হামলার মুখে পড়েছে। আবারও উত্তরেও গোলা-বারুদ বিনিময় হচ্ছে। এসবের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ সীমান্তের চলতি জুলাই-আগস্ট ২০১৭ সালের কালো-আগস্ট থেকেও উদ্বেগ ও অশান্তির।

প্রধানমন্ত্রীর গণচীন সফর এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের আশাবাদ প্রসঙ্গে

সম্প্রতি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে গণচীন সফরে গেলেন সেখানে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে চীনের সক্রিয় ভূমিকার প্রত্যাশাও ছিল। সফর শেষে উভয় দেশের যৌথ ঘোষণাতে প্রসঙ্গটা এসেছে ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদে। সেখানে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দের উল্লেখ না করে ‘জোরপূর্বক উদ্বাস্তু’ হওয়া এই মানুষদের সমস্যার ‘উভয়পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানে’ চীন ‘সাধ্য মতো সহায়তা’র আশ্বাস দেয়। যৌথ ঘোষণার বাক্য চয়ন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য কিছুটা আশাব্যাঞ্জক। তবে পূর্বাপর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখাও জরুরি।

রোহিঙ্গা সমাজ কিংবা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চেয়েও মিয়ানমার ও আরাকানে গণচীনের অধিক গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। সেই আদি ও মৌলিক স্বার্থে ছাড় না দিয়েই কেবল গণচীন বাংলাদেশের আকুতিকে বিবেচনায় নেবে।

বিশেষ করে লক্ষ্য করার মতো ব্যাপার, ২০২৪ এ বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের কয়েক মাস পর থেকে গণচীন মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনেকখানি বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধিকে চীন বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। তারা সেখানকার কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীকে জাতিগত বিভিন্ন গেরিলাদলের বিরুদ্ধে জোরেশোরে মদদ দিতে থাকে। প্রথমে নিজেদের সীমান্ত লাগায়ো শান অঞ্চলে জান্তাবিরোধী গেরিলা দলগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ফেরত দিতে বাধ্য করে। তাতমা-দ’র জেনারেল মিন অঙ হ্লাইয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বগ্রহণকেও তারা বেশ উঞ্চতার সঙ্গে গ্রহণ করে।

এরকম সবকিছু জান্তার জন্য বেশ উদ্দীপনাময় হয়েছে। দেশজুড়ে তারা এখন গণতন্ত্রপন্থী এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে যুদ্ধরত সকল আঞ্চলিক শক্তির বিরুদ্ধে পোড়ামাটি অভিযান চালাচ্ছে। যার একাংশ হিসেবে চিন ও আরাকানে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনকামীদের বিরুদ্ধেও অভিযান চলছে। ভারত সংলগ্ন চিনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফালাম শহর বহু বছর পর আবার তাদের নিয়ন্ত্রণে গেছে। প্রধান শহর হাক্কা আগেই তাদের দখলে ছিল। চিনে তাতমা-দ’র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা নয়াদিল্লীর জন্যও সুবিধাজনক হতে পারে মনিপুরের কুকিদের কোনঠাসা করতে। তবে চিনে নেপিদোর নিয়ন্ত্রণে বড় প্রভাব পড়বে পার্শ্ববর্তী আরাকানে।

আরাকানে ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টি স্থানীয় গেরিলাদের দখলে থাকলেও তাতমা-দ’র ক্রমাগত বোম্বিং ও লজিসটিকের অভাব মিলে প্রথমোক্তরা বেশ মুশকিলে আছে। আছে তাদের আর্থিক সংকটও।

গত সপ্তাহে ব্যাপক বোম্বিং হলো উত্তর আরাকানের মংডুতে, যা ২০২৪ এ বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের সময় আরাকান আর্মি কয়েক মাসের যুদ্ধ শেষে দখল করেছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে মংডুর রয়েছে দীর্ঘ সীমান্ত। স্থানীয় অনেকে মনে করছেন তাতমা-দ চলমান বোম্বিংয়ের পর নেভাল এবং গ্রাউন্ড অফেনসিভ শুরু করলে আরাকান আর্মি কিছু কিছু এলাকা হারাতে পারে। তখন আরাকান থেকে বাংলাদেশে নতুন করে শরণার্থী ঢুকতে পারে। আবার রোহিঙ্গা সশস্ত্র উপদলগুলোও পরিস্থিতির সুযোগ নিতে উত্তর আরাকানে ঢুকতে পারে তখন। তবে এরকম কিছুই রোহিঙ্গা সমস্যার স্বস্তিকর কোন সমাধান দিবে বলে মনে হয় না। যার মূলে রয়েছে মিয়ানমারে বামারদের জাতিবাদী আইন-কানুন-শাসন।

দরকষাকষির জটিল সমীকরণের মুখে বাংলাদেশ

বামার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি কেউই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের জাতিসত্তা হিসেবে স্বীকার করে না। তবে রোহিঙ্গা বৈরিতায় তাতমা-দ অধিক আগ্রাসী ও নির্মম। এরকম অবস্থায় গণচীনের সরকার যদি বলে ‘সকল পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধানে’র জন্য তারা বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে তাহলেও খুব বেশি আশাবাদী হওয়ায় সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তাতমা’দই রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক বাংলাদেশে ঠেলে পাঠিয়েছে। এই মানুষদের নাগরিকত্বও অস্বীকার করে তারা। ফলে ভূ-রাজনৈতিক বহির্দেশীয় চাপ ছাড়া মিয়ানমার-চীন সম্পর্কের বর্তমান গভীরতায় নেপিদো বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে এমন আশা করা দুরূহ। তবে নেপিদোর শাসকদের চাপে ফেলার ক্ষমতা রাখে গণচীন। এই সরকারের সামরিক সক্ষমতা ও কূটনৈতিক বৈধতার অভিভাবক হলো গণচীনের কেন্দ্রীয় শাসক গোষ্ঠী। প্রশ্ন হলো তারা সেই শক্তি প্রয়োগ করবে কি না বা কেন করবে?

আরাকানে যারা স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার জন্য লড়ছে সে-ই প্রতিরোধকর্মীরাও দীর্ঘকাল চীনের সহায়তা পেয়েছিল। তাদেরও রোহিঙ্গা প্রশ্নে প্রভাবিত করতে পারে চীন। প্রশ্ন হলো চীন ‘সাধ্য মতো’ সেটাও করবে কি না? এসব প্রশ্নের বাস্তববাদী উত্তর হলো, বিনিময়ে বাংলাদেশ চীনকে কী দিবে তার উপর শেষোক্ত দেশের ভূমিকা নির্ভর করছে।

বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে কার্যত চীনের হাতে একটা ভূ-রাজনৈতিক হাতিয়ার তুলে দিয়েছিল। একই কথা মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় শাসকদের বেলাতেও সত্য। বাংলাদেশকে এখন রোহিঙ্গাদের পাঠাতে হলে এই দুই শক্তির পাশাপাশি আরাকানের রাখাইনদেরও কিছু কিছু ‘সুবিধা’ দিতে হবে! এর বিকল্প হতে পারতো রোহিঙ্গারা নিজেরা যদি সংগ্রাম করে মাতৃভূমিতে ফেরার সুযোগ করে নিতে পারতো। সেরকম কিছু ঘটেনি।

রোহিঙ্গা সশস্ত্রতা, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং মাদক আগ্রাসন

রোহিঙ্গাদের মাঝে অনেকগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠী আছে। যে তালিকায় আরসাই প্রধান। তবে কোন গ্রুপের মাঝে নিজ জাতির রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তোলা বা তাতে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য নেতৃত্ব দেখা যায়নি বিগত সময়ে। জাতিগত সংগ্রামের রণনীতি ও রণকৌশল বিষয়ে সুচিন্তিত রাজনৈতিক অবস্থান দেখা যায় না তাদের মাঝে। তাদের শত্রু-মিত্রের বিবেচনাও বেশ পরিবর্তনশীল! যা অনেক সময় তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল আন্তঃরাষ্ট্রীয় গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহের জন্য বিব্রতকর হয়ে ওঠে।

বামার তাতমা-দ’র থেকে দাবি-দাওয়া আদায়ে তৎপরতার চেয়ে আশ্রয় শিবিরগুলোতে উপদলীয় সংঘাতে লিপ্ত থাকতেই রোহিঙ্গা গ্রুপগুলোকে বেশি দেখা যায়। এরকম সংঘাতে গত ৯ বছরে প্রতি মাসে মানুষ মারা গেছে। শিবিরবাসী অনেকে চাঁদাবাজিরও অভিযোগ করেন এদের বিরুদ্ধে। যদিও এরকম অভিযোগের সত্যতা যাচাই সম্ভব নয়--কিন্তু বিভিন্ন শিবিরে গভীর রাতে গোলাগুলির শব্দ নৈমিত্তিক ব্যাপার। এসব গ্রুপের তৎপরতা থামানো বাংলাদেশের ক্যাম্পরক্ষীদের পক্ষে দুরূহ। আবার বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এতটা সবল ও নিখুঁত নয় যে, জিরো-লাইন জুড়ে এদের চলাচল থামানো গেছে। আগে তাতমা-দ এবং এখন আরাকান আর্মি এসব গ্রুপের আন্তঃসীমান্ত তৎপরতার জন্য বাংলাদেশকে অভিযুক্ত করে।

বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের দিক থেকে একটা দুর্ভাগ্যের ব্যাপার হলো রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে গত পাঁচ দশকে ঢাকার নেতৃত্ব পূর্বমুখী অন্যান্য স্বার্থ নিয়ে কূটনৈতিক পদক্ষেপ অগ্রাধিকারই দিতে পারছে না। যদিও বর্তমান সরকার আসিয়ানমুখী কূটনীতির কথা বলছে এখন—কিন্তু সীমান্তের চলতি জটিলতায় সেটা কীভাবে এগিয়ে নেয়া যাবে তা বড় এক প্রশ্ন হিসেবে থাকছে।

২০২৪ এ বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের কয়েক মাস পর থেকে গণচীন মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনেকখানি বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বৃদ্ধিকে চীন বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। তারা সেখানকার কেন্দ্রীয় সশস্ত্র বাহিনীকে জাতিগত বিভিন্ন গেরিলাদলের বিরুদ্ধে জোরেশোরে মদদ দিতে থাকে।

বাংলাদেশের প্রশাসন প্রায় সকল জেলায় মাদকযুদ্ধে যে পর্যুদস্ত তারও বড় কারণ দক্ষিণ সীমান্ত। এ নিয়ে সংবাদ মাধ্যমে বহু লেখালেখি হয়েছে। জাতীয় সংসদে বিষয়টা নিয়ে কথা হয়েছে। কিন্তু মাদকের প্রবেশ-অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়নি। এই সীমান্তে মাদক চোরাচালানের অর্থমূল অকল্পনীয়ভাবে বড়।

প্রশাসনের দায়িত্বশীল এবং স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের সংশ্লিষ্টতা ও সহযোগিতা ছাড়া বছরের পর বছর মাদকের এরকম চোরাচালান চলতে পারে না বলেই অভিজ্ঞদের বিশ্বাস। রোহিঙ্গা সমস্যা, তাদের আসা-যাওয়া, তাদের বিভিন্ন উপদলের উপস্থিতির সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মিলে এই সমস্যা বাংলাদেশের জন্য ভয়াবহ এক ক্যানসারে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের বিপরীত দিকের বহু গেরিলা দলের রাজস্ব আয়ের উৎস মাদকের উৎপাদন ও বিপনন। আবার এর সাপ্লাই চেইন আছে সীমান্তের সকল দিকে। কোন বিষয়ে এত পক্ষের স্বার্থ জড়িত থাকলে যত অবৈধই হোক সেটা বন্ধ করা দুরূহ। যে ধরনের শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ থাকলে সেটা সফল হতো তার স্পষ্ট ঘাটতিও আছে।

আরাকান নিয়ে বামার সেনাবাহিনী এবং আরাকান আর্মির চলমান যুদ্ধে এই সীমান্তে নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থা-বাণিজ্যও শুরু করা যায়নি। ফলে আরাকান ও মিয়ানমারের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্যের যে বিশাল একটা অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারতো রোহিঙ্গা সংকটে সেটাও হচ্ছে না।

এরকম বহুমাত্রিক নেতিবাচক চিত্রের কেন্দ্রীয় আরেক কারণ বাংলাদেশের কোন রোহিঙ্গা নীতি না থাকা। বাংলাদেশ শুরু থেকে এই সমস্যার সমাধানে অস্পষ্ট দৌদুল্যমান অবস্থান নিয়ে আছে।

২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ঢুকতে দেয়ায় দেশের জন্য বড় এক ঝুঁকি ও বোঝা ডেকে আনা হয়েছিল। বিস্ময়কর হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও এভাবে আগতদের ঢুকতে দেয়ার নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে বহাল ছিল।

বাংলাদেশের সামনে গত ৯ বছরে বিকল্প ছিল অনেক। প্রথমত, রোহিঙ্গাদের ‘যেকোন মূলে্য’ ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া; দ্বিতীয়ত তাদের মাঝে রাজনৈতিক সংগ্রামের এমন নেতৃত্ব গড়ে উঠতে সহায়তা করা-- যাতে নিজেদের লক্ষ্য তারা নিজেরা হাসিল করতে সক্ষম হয়।

আরাকান পরিস্থিতিতে নাটকীয় পরিবর্তনের কারণে তৃতীয়ত বিকল্প ছিল রাখাইন নেতৃত্বের সঙ্গে এ বিষয়ে একটা বোঝাপড়ায় আসা এবং রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে তাদের রাজি করানো। এরকম উদ্যোগে রোহিঙ্গাদেরও সম্পৃক্ত করতে হতো। কিন্তু তার জন্য এই সম্প্রদায়ের উপর বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের যেরকম প্রভাব থাকা দরকার সেটা আছে বলে মনে হয়নি কখনো।

চতুর্থ বিকল্প হলো আশ্রিত এই মানুষদের ভাগাভাগি করে পুনর্বাসনের ভার নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশকে রাজি করানো। সেরকম কোন উদ্যোগও কখনো নেয়া হয়নি। শেষ বিকল্প হিসেবে আশ্রিত এই মানুষদের বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করে নেয়ার কথাও বলেছেন কোন কোন বিশেষজ্ঞ। যেভাবে উর্দুভাষী আটকেপড়া পাকিস্তানীদের নাগরিকত্ব দেয়া হয়েছে। বলাবাহুল্য, রোহিঙ্গাদের বেলায় এরকম প্রস্তাব যথেষ্ট বিতর্ক তোলে। তবে একটু একটু করে মূল জনগোষ্ঠীতে তারা যে ইতিমধ্যে মিশে যাচ্ছে সেটাও রূঢ় এক বাস্তবতা। সম্ভবত এই বাস্তবতাই চলতে থাকবে আগামীতে কিংবা আরও ‘খারাপ’ও হতে পারে পরিস্থিতি।

রোহিঙ্গা সংকট যখন রাজনীতির অগ্রাধিকারে নেই

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের স্থানীয় বাংলাভাষীদের সম্পর্ক মধুর নয়। আবার আরাকানের রাখাইনদের সঙ্গেও তাদের সামাজিক সম্পর্ক ভালো নয়। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর সঙ্গেও রোহিঙ্গা নেতারা কোন টেকসই আস্থাযোগ্য সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেননি। যে সংগঠকরাই এরকম সম্পর্ক গড়ার মনোভাব দেখিয়েছে বা এরকম সম্পর্ককে প্রয়োজনীয় মনে করেছে তারা আশ্রয় শিবিরে রহস্যময়ভাবে খুন হয়েছে।

অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, দেশ-বিদেশের নানান ধরনের গোপন, আধা-গোপন শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গড়াতেই প্রভাবশালী রোহিঙ্গা সংগঠকরা গুরুত্ব দিয়েছেন বেশি। আবার বাংলাদেশের মূলধারার রাজনৈতিক শক্তিগুলোও রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনায় নেয়নি কখনো। আজও উভয় তরফে এরকম দূরত্ব রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে নতুন নির্বাচন শেষে যে দল ক্ষমতায় এসেছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারেও এই সমস্যা এবং তার সমাধানচিন্তার জোরালো উল্লেখ পাওয়া যায় না। বিদ্যমান বিরোধী দলগুলোও এই প্রশ্নে ধারাবাহিক কোন সরব অবস্থান নিয়েছে এমন দেখা যায়নি। ফলে আপাতত এই সমস্যার কোন সমাধান আশা করা যায় না।

২০১৭ সালের আগস্টে তাতমা-দ যে সমস্যা তৈরি করেছিল, বাংলাদেশ এবং রোহিঙ্গা সমাজ নিজেদের কৌশলগত দুর্বলতায় তার ভার বইছে আজও ভাগাভাগি করে। সম্ভবত আরও বহুদিন এভাবেই চলবে। কোন জনগোষ্ঠী নিজেদের সমস্যার সমাধানে মরিয়া না হলে আন্তর্জাতিক সমাজ তার সমাধান করে দিবে এমন ভাবা ভুল।

  • আলতাফ পারভেজ: দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ে গবেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত