খাল দখল, নকশায় গলদ: মেগা প্রকল্পেও ডুবছে ঢাকা

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ০০: ০২
স্ট্রিম গ্রাফিক

আধা ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি উপচে পড়ে পানিতে। বাসাবাড়ি আর রাস্তার পাশের দোকানেও ঢুকে যায় পয়োনিষ্কাশন নালার দুর্গন্ধযুক্ত পানি। বছরের পর বছর ধরে চলা এই ভোগান্তির কারণ শুধু অতিবৃষ্টি নয়; অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল, বক্স কালভার্টের বিরূপ প্রভাব এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পও নকশার ত্রুটিতে এখন নগরবাসীর গলার কাঁটা।

সম্প্রতি রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারের (আরডিআরসি) এক গবেষণায় ঢাকার এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ ও সরেজমিন জরিপের সমন্বয়ে তৈরি এই প্রতিবেদনে ১৮৮৮ থেকে ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক ভূমি জরিপ এবং ২০২২ সালের আধুনিক স্যাটেলাইট ইমেজের তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

‘মনে হয় নদীর ওপর দিয়ে যাচ্ছি’

কিছুক্ষণ ভারী বৃষ্টি হলেই মিরপুর, কাজীপাড়া, জুরাইন, শান্তিনগর, খিলগাঁও, ধানমন্ডি ও পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে খোদ মতিঝিলের মতো বাণিজ্যিক এলাকার সড়ক তলিয়ে যায়। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানি ভেঙে গন্তব্যে ছুটতে হয় মানুষকে।

বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তা কেয়া রানীর যাতায়াত মালিবাগ থেকে। গত ৭ জুলাই অফিস শেষে বাসায় ফিরছিলেন এই নারী। কাকরাইল মোড়ে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিক দিনে অফিসে যেতে সময় লাগে ২০-২৫ মিনিট। কিন্তু বৃষ্টি হলে এক ঘণ্টার বেশি লাগে। কাকরাইল থেকে মৌচাক পর্যন্ত বাসে যাওয়ার সময় মনে হয় যেন কোনো নদীর ওপর দিয়ে যাচ্ছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘হালকা বৃষ্টি হলেই রাজারবাগ এলাকা ডুবে যায়। লোকাল বাসগুলো যখন যায়, মনে হয় কোনো খালের মধ্য দিয়ে চলছে।’

অন্যদিকে মিরপুর এলাকায় রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এই জনদুর্ভোগ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আগারগাঁওয়ে কর্মরত সাহেদ আমীন বলেন, ‘বৃষ্টি হলে আগারগাঁও থেকে মিরপুর ১০ পর্যন্ত পুরো রাস্তায় যাতায়াতই বন্ধ হয়ে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকতে হয়।’

কোথায় আটকে থাকে পানি

আরডিআরসির মানচিত্র বিশ্লেষণ করলে ঢাকার ভোগান্তির একটি ভয়ংকর ভৌগোলিক কাঠামো চোখে পড়ে। গবেষণায় ঢাকার ভেতরে থাকা ৭৭টি চ্যানেল, খাল ও লেকের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে মানচিত্রের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে ‘লাল রেখা’। এই রেখাগুলো সেই সব খাল নির্দেশ করে, যেগুলো সম্পূর্ণ বেদখল বা হারিয়ে গেছে। বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে এই খালগুলো দিয়েই নদীতে পড়ার কথা ছিল।

গবেষণায় দেখা যায়, রূপনগর ও ইস্টার্ন হাউজিং এলাকার বৃষ্টির পানি ‘রূপনগর মেইন খাল’ দিয়ে নিষ্কাশিত হওয়ার কথা থাকলেও তা মারাত্মকভাবে দখল-দূষণে আক্রান্ত। মিরপুর ১১ ও কালশীর পানি নামার কথা বাউনিয়া, বাইশটেকী এবং সাংবাদিক কলোনি খাল দিয়ে। কিন্তু এই তিনটি খালই এখন মৃতপ্রায়। টোলারবাগ, কাজীপাড়া ও কাফরুলের পানি কল্যাণপুর খাল ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে আটকে যাচ্ছে। একইভাবে হাতিরপুল ও ধানমন্ডি ২৭-এর পানি নামার কথা পান্থপথ খাল দিয়ে। কিন্তু সেটিকে অপরিকল্পিতভাবে বক্স কালভার্টে রূপান্তর করায় পানি সরার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

গবেষকেরা বলছেন, ঢাকার জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট সংকট। বক্স কালভার্ট করে প্রাকৃতিক জলাধারগুলো মেরে ফেলা হয়েছে। এখন ভারী বৃষ্টি হলে পানি নামার কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই।

হাজার কোটির প্রকল্পে নকশার গলদ

২০১৬ সালে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। প্রকল্পের বাজেট ধরা হয় প্রায় ১ হাজার ২৯৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা। এই প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলার সদর, ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, শ্যামপুর এবং কদমতলি এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন।

পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আওতায় ৫৫৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়নের কাজ হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। পরে নকশা পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নতুন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার কারণে প্রকল্পটি সংশোধন করা হলে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ২৯৯ কোটি টাকায়। সেইসঙ্গে মেয়াদ বেড়ে দাঁড়ায় ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত।

তবে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তদারকি সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে ডিএনডি এলাকার পানি নিষ্কাশনের জন্য নেওয়া প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

আইএমইডির পর্যালোচনায় বলা হয়, এই প্রকল্পের প্রধান দুর্বলতা হলো প্রাথমিক পরিকল্পনা ও সম্ভাব্যতা সমীক্ষার সীমাবদ্ধতা। মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে প্রকল্পের ব্যয় ও সময় তুলনামূলকভাবে কম ধরা হলেও পরে সংশোধন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের পর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো নিয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো রূপরেখা নেই। খালে নিয়মিত বর্জ্য ফেলা, পলি জমা হওয়া, অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিতভাবে সাঁকো বা কালভার্ট নির্মাণের ফলে প্রকল্পের সুফল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে জুরাইন এলাকাটি নিম্ন জলাভূমি হলেও একসময় বন্যা মোকাবিলায় এটি বেশ কার্যকর ছিল। কিন্তু প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়ার পর ওই এলাকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। এখন ১০ মিনিটের বৃষ্টিতেই জুরাইন প্লাবিত হয়। কারণ, প্রকৌশলগত ত্রুটির কারণে রাস্তা উঁচু করা হয়েছে, ফলে মানুষের বাসাবাড়ি নিচু হয়ে গেছে।

২০১৯ সালে ওয়াসার এমডিকে জুরাইন এলাকার দূষিত পানির শরবত খাওয়াতে গিয়ে দেশজুড়ে আলোচিত হওয়া মোহাম্মদ মিজানুর রহমান স্ট্রিমকে জানান, জুরাইন এলাকার পানি নামে বুড়িগঙ্গা এবং শীতলক্ষ্যায়। ডিএনডি বাঁধের ভেতরে পানির স্তরের তুলনায় নদী দুটির পানির স্তর অন্তত ১০ ফিট নিচে। নদী থেকে ডিএনডি বাঁধ অনেক উঁচু। কিন্তু ডিএনডি প্রকল্পে স্বাভাবিক পানি প্রবাহের ব্যবস্থা করা হয়নি। এখানে বাঁধের এ পাশ থেকে নদীতে পানি নেওয়ার জন্য পাম্পিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পাম্পগুলোর মধ্যে আবার সব চলে না ঠিকঠাক। যদি পাম্প ব্যবস্থায় না গিয়ে স্বাভাবিক প্রবাহের ব্যবস্থা করা হতো, তাহলেও এই পরিস্থিতি হতো না।

আক্ষেপ করে মিজান বলেন, ‘জুরাইন এলাকার জলাবদ্ধতা কেউ কমাতে চায় না। কারণ জলাবদ্ধতা থাকলে একটা প্রকল্প রানিং থাকে, আর প্রকল্প রানিং মানে হচ্ছে একটা লুটপাটের চাকা সচল থাকা।’

শুধু জুরাইন নয়, কালশী রোডের নিচ দিয়ে বাউনিয়া খালের যে কালভার্টগুলো করা হয়েছে, তার নকশা ‘এল’ বা ‘ইউ’ আকৃতির হওয়ায় স্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

প্রশাসনিক ও কাঠামোগত এই ব্যর্থতার ভেতরের কারণ জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ স্ট্রিমকে বলেন, ‘মেগা প্রকল্পগুলোর ডিজাইনে বড় ত্রুটির কারণ হলো, এগুলো করার সময় জনগণের সঙ্গে কোনো আলোচনাই করা হয়নি। শুধু নিজস্ব ইঞ্জিনিয়ারদের টেবিলে বসে নেওয়া সিদ্ধান্তের কারণে এই কারিগরি ত্রুটিগুলো হয়েছে এবং বিপুল অর্থের অপচয় হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, শেওড়াপাড়া-কাজীপাড়ায় আগে প্রায় তিন কিলোমিটার কোনো স্টর্ম ওয়াটার নেটওয়ার্ক (বৃষ্টির পানি নামার পাইপ) ছিল না। পানি জমলে মেট্রোরেলকে দোষ দিত। পরে কার্পেটিং কেটে নেটওয়ার্ক তৈরি করা হলেও খিদির খালের সঙ্গে সংযোগ না থাকায় সেখানে পানি জমছেই।

দখলে খাল, ময়লার ভাগাড় ড্রেন

আরডিআরসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিরপুরের সাংবাদিক কলোনি খালটির পানিনিষ্কাশন বন্ধ হয়েছে খোদ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দখলের কারণে। রূপনগর ও পল্লবীতে মানচিত্রে খালের অস্তিত্ব থাকলেও তা দখলদারদের কবলে পড়ে ছোট নালায় পরিণত হয়েছে।

প্রশাসক হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে মোহাম্মদ এজাজ বলেন, একবার সিটি করপোরেশনের কুইক রেসপন্স টিম সারা রাত কাজ করে সকাল ৮টায় একটি ড্রেন পুরোপুরি পরিষ্কার করল। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই দেখলাম, ফুটপাতের এক তাল বিক্রেতা তালের সব বর্জ্য সরাসরি ওই ড্রেনের পাইপেই ফেলে দিচ্ছেন।

উত্তরণের উপায় কী

ঢাকায় ভারী বৃষ্টি হলে শহরজুড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। উত্তরণের উপায় হিসেবে আরডিআরসি চেয়ারম্যান ও নদী গবেষক মোহাম্মদ এজাজ বলেন, সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ইতিমধ্যে অনেক খালের সীমানা নির্ধারণ করে লাল দাগ ও পিলার দেওয়া হয়েছে। এখন কোনো ছাড় না দিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালাতে হবে। বক্স কালভার্টগুলো ভাঙা যেহেতু সম্ভব নয়, তাই বছরে অন্তত দুবার বড় সাকশন পাম্প দিয়ে এর ভেতরের কঠিন বর্জ্য পুরোপুরি পরিষ্কার করতে হবে।

নগরবিদ ও ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান স্ট্রিমকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক ড্রেনেজ সিস্টেমের অংশ হিসেবে খাল ও জলাধারকে সর্বোচ্চ উপযোগী করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। কৃত্রিম ড্রেনগুলো রুটিন মেনে পরিষ্কার না করায় সুফল পাচ্ছি না। এ ছাড়া প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম ড্রেনেজের মধ্যে সংযোগ বাড়ানো এবং একটি ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা জরুরি, যা এখনো নেই। প্ল্যান ছাড়াই বিচ্ছিন্নভাবে উদ্যোগ চলায় সামগ্রিক ফল পাওয়া যাচ্ছে না।’

তবে জলাবদ্ধতার বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (উপসচিব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান স্ট্রিমকে বলেন, ‘খাল উদ্ধারে দুই সিটির সমন্বয়ে কমিটি কাজ করছে। আমাদের এলাকায় এখন আর কোনো জলাবদ্ধতা নেই। বৃষ্টির পানি জমছে এবং নেমে যাচ্ছে। আমাদের লোকেরা মাঠে কাজ করছে।’

অন্যদিকে জলাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আবদুস সালাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘পানি বের হওয়ার ড্রেনগুলোর অনেকগুলোই বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা ঢাকা দক্ষিণে জলাবদ্ধতার ৩১টি পয়েন্ট নির্ধারণ করেছি। এসব এলাকায় পানি যাতে দ্রুত নামতে পারে, সে জন্য মোবাইল পাম্প কেনা হয়েছে। খুব দ্রুতই নগরবাসীর এই ভোগান্তি আমরা কমিয়ে আনতে সক্ষম হব।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেসব খাল দখল হয়েছে, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সঙ্গে কথা বলে আমরা সেগুলো উদ্ধারের চেষ্টা করছি। পাশাপাশি দূষিত খালগুলোও পরিষ্কার করা হচ্ছে।’

Ad 300x250

সম্পর্কিত