বর্জ্য বিদ্যুৎ: অন্ধকারে আগের প্রকল্প, নতুন উদ্যোগে প্রশ্ন

প্রকাশ : ০৮ মে ২০২৬, ২৩: ৫৪
রাজধানীর আমিনবাজারে বর্জ্যের স্তূপ। স্ট্রিম ছবি

শহরাঞ্চলের বর্জ্যব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকট নিরসন এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির প্রসারে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের (ওয়েস্ট টু এনার্জি) উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এজন্য জরিপ পরিচালনা ও পরীক্ষামূলক (পাইলট) প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হয়েছে।

২০২০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার একই ধরনের উদ্যোগ নেয়। তবে দীর্ঘদিনেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে নতুন করে আবার একই ধরনের প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সরকারের বিদ্যুৎ বিভাগ আগামী পাঁচ বছরের এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছে, সেখানে এই উদ্যোগের বিস্তারিত এসেছে। এমনকি আগামী অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনায় এই বিষয়ে জরিপ ও পাইলট প্রকল্পের জন্য ৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে কর্মপরিকল্পনায়।

সরকারের কর্মপরিকল্পনার নথিতে বলা হয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বহুমুখী উৎস খোঁজার অংশ হিসেবে বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন খাতে নজর দেওয়া হবে। প্রথমে মাঠপর্যায়ে জরিপ চালানো হবে এবং এরপর পাইলট প্রকল্প নেওয়া হবে।

প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য দুটি। প্রথমত, বর্জ্যের সঠিক ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ দূষণ কমানো এবং পরিবেশের সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, এই বর্জ্যকে পুড়িয়ে বা প্রক্রিয়াজাত করে তা থেকে টেকসই বিদ্যুৎ উৎপাদন।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যে, দেশে বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক ৬ হাজার ২৭৩, ফার্নেস অয়েলের ৫ হাজার ৬৪১ এবং সৌরবিদ্যুৎ ৮৩৯ মেগাওয়াট। তবে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো কেন্দ্র নেই।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের এই পাইলট প্রকল্প সফল হলে তা দেশের অন্যান্য এলাকায় সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে। এটি একদিকে যেমন প্রচলিত জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর চাপ কমাবে, তেমনি আবর্জনা ব্যবস্থাপনায় টেকসই সমাধান বয়ে আনবে। যদিও আগের প্রকল্প আলোর মুখ না দেখায় নতুন উদ্যোগ নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

এর আগে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সাভারের আমিনবাজারে এই ধরনের একটি প্রকল্প হাতে নিলেও তার কোনো কার্যক্রম এগোয়নি। ২০২০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) ‘আমিনবাজার ল্যান্ডফিল সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি অনুমোদন পায়।

এই প্রকল্পের আওতায় চায়না মেশিনারিজ ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন কোম্পানির (সিএমইসি) কারিগরি সহায়তায় ‘ইনসিনারেশন’ (বর্জ্য পুড়িয়ে) পদ্ধতিতে প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ছিল। চূড়ান্ত পরিবেশগত ছাড়পত্র না পাওয়ায় এখন পর্যন্ত ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু করা যায়নি। তবে দুই দফায় প্রকল্পের ব্যয় ৭৮৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৪২৬ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

ডিএনসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এসএম শফিকুর রহমান স্ট্রিমকে বলেন, পরিবেশগত চূড়ান্ত ছাড়পত্র পাওয়া যায়নি। সেটি পেলেই মূল কাজ শুরু করা যাবে।

সরকারি সূত্র বলছে, ২০১৩ সালে ইতালীয় প্রতিষ্ঠান ম্যানেজমেন্ট এনভায়রনমেন্ট ফাইন্যান্স এসআরএল-এর সঙ্গে বর্জ্য বিদ্যুতের একই ধরনের চুক্তি করে তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছিল ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনসিনারেশন পদ্ধতিতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিষয়টি সংবেদনশীল। সঠিক উপায়ে বর্জ্য আলাদা না করে পুড়ালে এবং রক্ষণাবেক্ষণ না করা হলে তা পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এজন্য এ ধরনের প্রকল্পে যাওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।

টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (স্রেডা) সদস্য (নবায়নযোগ্য জ্বালানি) ড. আশরাফুল আলম স্ট্রিমকে বলেন, বর্জ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কয়েকটি সমস্যা দেখা দেবে। এরমধ্যে রয়েছে সিটি করপোরেশন থেকে নিয়মিতভাবে বর্জ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও উৎপাদন ব্যয়। বর্জ্যবিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হয়। যেহেতু, আমাদের বর্জ্য রাখার মতো জায়গার সংকট আছে, বিকল্প হিসেবে বর্জ্য বিদ্যুতের চিন্তা সামনে আসবে।

সম্পর্কিত