‘ক্রসফায়ার’ নাটক সাজিয়ে হত্যা: হাসানাত আবদুল্লাহসহ ট্রাইব্যুনালে চার জনের বিচার শুরু

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক

প্রকাশ : ২০ মে ২০২৬, ২২: ২০
আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ছাত্রদল নেতাসহ দুই জনকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসানাত আবদুল্লাহসহ চারজনের বিচার শুরু হয়েছে।

বুধবার (২০ মে) ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠনের আদেশ দেন।

সূচনা বক্তব্য ও রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১৭ জুন দিন ধার্য করেছেন আদালত। মামলার আসামিরা হলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ, বরিশালের তৎকালীন এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহ, উজিরপুর থানার সাবেক এএসআই মো. মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন। তাঁদের মধ্যে মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন কারাগারে আছেন। বাকি দুজন পলাতক রয়েছেন।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টিপু হাওলাদার ও উপজেলা জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার সাংগঠনিক সম্পাদক কবির মোল্লা। এদিন কাঠগড়ায় থাকা গ্রেপ্তার দুই আসামিকে অভিযোগ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল। দোষ স্বীকার করবেন কি না—জানতে চাওয়া হলে তাঁরা নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করেন।

গত ১৪ মে অব্যাহতির আবেদনের শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী আবুল হাসান দাবি করেন, তাঁর মক্কেলরা এই ঘটনায় জড়িত নন এবং মিথ্যা ও বানোয়াট গল্পের মাধ্যমে তাঁদের আসামি করা হয়েছে। রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীও পলাতক আসামিদের পক্ষে অব্যাহতির আবেদন করেছিলেন। পাল্টা যুক্তিতে প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম জানান, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনের যথেষ্ট প্রমাণ তাঁদের হাতে রয়েছে।

প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তাঁদের হত্যার পরিকল্পনা করেন। তাঁর নির্দেশে তৎকালীন এসপি এহসান উল্লাহ তা বাস্তবায়ন করেন। ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তাঁদের গ্রেপ্তার করে উজিরপুর থানা-পুলিশ। পরে এএসআই মাহাবুল ও জসিমকে দিয়ে আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কের পাশে ‘ক্রসফায়ারের নাটক’ সাজিয়ে তাঁদের হত্যা করা হয়।

এর আগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, একটি গাড়ি পোড়ানোর মামলায় তাঁদের গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকায় আনা হয় এবং সেখান থেকে ‘ক্রসফায়ারের’ উদ্দেশ্যে বরিশালে নেওয়া হয়। রাত দুইটার দিকে আগৈলঝাড়ার ভোদাল নামক স্থানে তাঁদের হত্যা করা হয়। তিনি আরও বলেন, ঘটনা ধামাচাপা দিতে পুলিশ নিজেরাই থানায় জিডি ও ময়নাতদন্ত করিয়েছিল। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনেও গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কথা উল্লেখ আছে। পুলিশের রেখে যাওয়া এই নথিপত্রই এখন তাঁদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও তৎকালীন পুলিশের দাবি ছিল, পিকআপ ভ্যানে পেট্রলবোমা হামলা মামলার আসামি হিসেবে ঢাকা থেকে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ করা হয়। তদন্ত শেষে ২০ ডিসেম্বর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয় সংস্থাটি। চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ট্রাইব্যুনাল। ১৮ ফেব্রুয়ারি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির পর নির্দিষ্ট সময়ে আত্মসমর্পণ না করায় ২৫ মার্চ হাসানাত আবদুল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘পলাতক’ ঘোষণা করা হয়। ১ এপ্রিল এই মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে হাসানাত আবদুল্লাহর মেজো ছেলে সেরনিয়াবাত মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহকে ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাঁর আরেক ছেলে ও ভাই খোকন সেরনিয়াবাত আত্মগোপনে রয়েছেন। গত বছর অক্টোবরে হাসানাত আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগে মামলা করে দুদক। নভেম্বরে তাঁর বিরুদ্ধে বরিশালে বিএনপির সভায় হামলার অভিযোগেও মামলা হয়েছে।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত