হামের প্রাদুর্ভাব: সুস্থ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ছাড়ার হিড়িক, নেপথ্যে ঈদ

রাজধানীর ডিএনসিসি হাম হাসপাতাল। স্ট্রিম ছবি

ঈদুল আজহা উপলক্ষে রাজধানীর ডিএনসিসি হাম হাসপাতালে পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার আগেই ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফেরার হিড়িক পড়েছে। এতে হামের সংক্রমণ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে নার্সদের আচরণ নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন সেবাগ্রহীতারা।

হাসপাতালের দেওয়া তথ্যমতে, গত ১৮ থেকে ২৬ মে পর্যন্ত ৯ দিনের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে নতুন রোগী ভর্তির চেয়ে হাসপাতাল ছাড়ার হার বেশি। এই সময়ে তৃতীয় তলায় মোট ২৮২ জন নতুন রোগী ভর্তি হলেও ছাড়পত্র নিয়ে ফিরে গেছেন ৩৩২ জন। অর্থাৎ ভর্তির তুলনায় হাসপাতাল ছাড়ার হার প্রায় ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি।

বিশেষ করে ঈদের ছুটি যত কাছে এসেছে, হাসপাতাল ছাড়ার প্রবণতা ততটাই ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গত ২৪, ২৫ ও ২৬ মে এই চিত্র আরও প্রকট হয়েছে। এই তিন দিনে মাত্র ৫৯ জন রোগী ভর্তি হলেও ছাড়পত্র নিয়েছেন ১০৮ জন।

ছাড়পত্রের এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ২৬ মে। এদিন মাত্র ৯ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি গেছেন ৩৭ জন, যা নতুন ভর্তির চেয়ে চার গুণেরও বেশি। শতকরা হিসাবে এদিন হাসপাতালমুখী ও বাড়িমুখী মোট মানুষের মধ্যে ৮০ শতাংশের বেশি ছিলেন ছাড়পত্র নেওয়া ব্যক্তি।

এর আগের দিনগুলোতে চিত্র কিছুটা ভিন্ন ছিল। ২৩ মে সর্বোচ্চ ৪৯ জন রোগী ভর্তি হলেও ছাড়পত্র নেন ৩২ জন। ২২ মে ভর্তি ও ছাড়পত্র দুটিই ছিল সমান ৩৩ জন করে। ২০ ও ১৯ মে-ও ছাড়পত্রের চেয়ে নতুন ভর্তির সংখ্যা কিছুটা বেশি ছিল। তবে ১৮ মে ঈদের আমেজ শুরুর দিকে এক দিনে সর্বোচ্চ ৫৬ জন রোগী হাসপাতাল ছাড়েন, যার বিপরীতে ভর্তি হয়েছিলেন ৩৩ জন।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরা

ঈদের কারণে পুরোপুরি সুস্থ না হয়েই অনেক রোগীর হাসপাতাল ছাড়ার বিষয়ে চিকিৎসাধীন ১২ বছর বয়সী স্মৃতি আক্তারের বাবা মোহাম্মদ শরীফ মিয়া বলেন, 'হাসপাতালে অল্প মানুষ ঢুকছে আর বেশি মানুষ চলে যাচ্ছে। মানে পুরোপুরি ভালো না হলেও অনেকে নিজে থেকে ছুটি নিয়ে চলে যাচ্ছে।'

ডেডিকেটেড এই হাসপাতালের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শয্যা ফাঁকা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, 'পুরোপুরি সুস্থ না হয়ে চলে গেলে তো আসলে উপকার হলো না, সরকারের বিনিয়োগটা ভালো কাজে লাগল না। আমি আমার মেয়েকে পুরোপুরি সুস্থ হলেই বাড়ি নিয়ে যাব।'

ইটভাঙা শ্রমিক সোহেলের পাঁচ দিন ধরে জ্বরে ভোগা ছোট মেয়ে ফাতেমা হাসপাতালে ভর্তি থাকায় এবার তাঁর রংপুরের গ্রামের বাড়ি যাওয়া হচ্ছে না। হাসপাতালের শয্যাপাশে বসে তিনি বলেন, 'টার্গেট ছিল মেয়েটা সুস্থ না হলে দেশে যেতাম না। এখন ঈদ ঢাকাতেই হবে।'

একই কথা জানিয়ে আরেক অভিভাবক আব্দুর রহমান বলেন, 'আমার লক্ষ্য হলো বাচ্চা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি হাসপাতাল ছাড়ব না। ঈদ যদি এখানেই করতে হয়, তাতেও আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই।'

রোগীদের স্বেচ্ছায় হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে তৃতীয় তলায় দায়িত্বরত এক নার্স বলেন, 'রোগীরা যেতে চাইলে "ডিসচার্জ অন রিকোয়েস্ট বন্ড" (ডিওআরবি) নামে একটি অপশন আছে। চিকিৎসক রোগীদের সম্মতি নিয়ে অর্থাৎ "রোগীর কিছু হলে হাসপাতাল দায়ী থাকবে না" মর্মে স্বাক্ষর নিয়ে ছুটি দিয়ে দেন। বিশেষ করে ঈদের মৌসুম হওয়ায় অনেকেই থাকতে চাইছেন না।'

স্টাফ নার্স সমাপ্তি মণ্ডল জানান, অন্তত পাঁচ দিনের অ্যান্টিবায়োটিক ডোজ শেষ হলে এবং জ্বর না থাকলে শুধু কাশি থাকলেও ছুটি দেওয়া হয়। তবে কেউ নিজ দায়িত্বে মুচলেকা দিয়ে যেতে চাইলে কর্তৃপক্ষের কিছু করার থাকে না। তবে এভাবে সুস্থ না হয়ে বাড়ি যাওয়া হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন তিনি।

স্ট্রিম ছবি
স্ট্রিম ছবি

নার্সদের অদক্ষতার অভিযোগ

হাসপাতালের চিকিৎসক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রশংসা করলেও নার্সদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে অভিভাবক আব্দুর রহমান বলেন, 'এখানকার নার্সরা সবচেয়ে বেশি অদক্ষ। তাঁরা চিকিৎসকের লেখা বোঝেন না। আমি যখন দেখলাম ওটি ফাইলে কী লেখা আছে এবং নার্সকে জিজ্ঞেস করলাম যে পাতলা পায়খানার জন্য "মেট্রোনিডাজল" দেওয়া হয়েছে কি না, তিনি প্রথমে বললেন "হ্যাঁ, দিয়েছি"। কিন্তু একটু চাপাচাপি করতেই বললেন, "থাকলে দেব"। তার মানে তিনি ওষুধটা দেননি।'

তিনি আরও বলেন, 'একবার ফাইলে স্পষ্ট "ওমিট" লেখা ছিল, কিন্তু একজন নার্স তা দেখে বললেন— "কী লিখল ডাক্তাররা, লেখা তো বুঝলামই না"। তাঁদের তো একটা প্রশিক্ষণ নেওয়া দরকার ছিল। নার্সদের প্রতিদিন ব্রিফ করা বা প্রশিক্ষিত করা জরুরি, নইলে অনেক শিশু হয়তো ভুল চিকিৎসায় মারা যাবে।'

নার্সদের আচরণের বিষয়ে মোহাম্মদ শরীফ মিয়া বলেন, 'সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে যে আন্তরিকতা পেয়েছি, এখানকার নার্সদের মধ্যে তার চরম অভাব রয়েছে। নার্সদের কাছে গিয়ে ভালো-মন্দ কিছু জিজ্ঞেস করলে তাঁরা কথা বলতে চান না, উল্টো রাগ করেন। তাঁরা এমন ভাব করেন যেন তাঁরাই দেশের নীতিনির্ধারক।'

রোগীদের অভিযোগের বিপরীতে নার্সরা তুলে ধরেছেন ডেপুটেশনে আসা কর্মীদের অবস্থা ও প্রতিকূল পরিবেশের কথা। হাসপাতালের তৃতীয় তলায় দায়িত্বরত এক নার্স বলেন, 'আমি শ্যামলীর অর্থোপেডিক হাসপাতাল (নিটোর) থেকে এসেছি। তার আগে কক্সবাজার সদরে ছিলাম। আমাকে এই হাসপাতালে এখন বদলি করা হয়েছে। এখানকার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা না থাকায় পাঁচ মিনিট কাজ করলেই আমরা নিজেদের অসুস্থ বোধ করি।'

জনবল সংকটের কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, একসঙ্গে ১০ জন রোগী চলে এলে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় কাউকে সঠিক সেবা দিতে না পারলে কেবল আমাদের ওপর দোষ দেওয়া হয় কেন?

ডেডিকেটেড এই হাসপাতালে কর্মরত সবাই বাইরের হাসপাতাল থেকে ডেপুটেশনে আসা জানিয়ে সমাপ্তি মণ্ডল বলেন, 'অধিকাংশ কর্মী সাভার, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ বা আশপাশের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আনা হয়েছে।'

আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া ওয়ার্ড বয় সফর আলী মজুমদার বলেন, 'আমাদের দায়িত্ব ছয় ঘণ্টা। তবে আউটসোর্সিংয়ের কাজ হওয়ায় মাসে আমাদের মাত্র দুই দিন ছুটি দেওয়া হয়। শুক্রবার বা শনিবার বলে আলাদা কোনো ছুটি নেই। ছুটিটা খুবই সীমিত হওয়াটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।' সেই সঙ্গে রোগীদের ডাস্টবিন ব্যবহার না করা এবং যত্রতত্র ময়লা ফেলার বিষয়েও অভিযোগ করেন তিনি।

হাসপাতালে অনেক শিশুর মৃত্যুর পেছনে সঠিক তদারকি ও মা-বাবাদের অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন অভিভাবক আব্দুর রহমান ও নার্স সমাপ্তি মণ্ডল। আব্দুর রহমান বলেন, 'এখনকার মায়েরা শিশুকে একদিকে শুইয়ে রেখে মুঠোফোন টিপতে থাকেন। এটি এখন একটি সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।'

যাঁদের মৃত্যু হচ্ছে তাঁদের বেশির ভাগের বয়স দুই বছরের কম উল্লেখ করে সমাপ্তি মণ্ডল বলেন, 'এরা মায়ের বুকের দুধ ছাড়া অন্য কিছু খেতে চায় না। কিছু মা-বাবা আছেন যাঁরা যত্নশীল নন, মুঠোফোন ব্যবহারে ব্যস্ত থাকেন। সেদিন এক নারী বসে বসে মুঠোফোন দেখছিলেন আর তাঁর শিশু শয্যা থেকে পড়ে গিয়ে ১১টি সেলাই নিয়ে ঢাকা মেডিকেলে গেল।'

রোগীরা হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও খাবার পাওয়ার কথা জানালেও কিছু ওষুধ ও সরঞ্জাম বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন। চিকিৎসাধীনদের স্বজনরা জানান, তিন বেলার খাবার এবং সরকারি প্যারাসিটামল ও ইনজেকশন দেওয়া হলেও থার্মোমিটার নিজেদের কিনতে হচ্ছে। মোহাম্মদ শরীফ মিয়া বলেন, 'হাসপাতাল থেকে কোনো সিরাপ দিচ্ছে না। ম্যাক্সি ব্যাক নামের একটি ওষুধ আমাদের প্রতি পিস ৭০ টাকা দিয়ে বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।'

অভিযোগের বিষয়ে হাসপাতালের দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা (ডিউটি এনসিও) বলেন, 'নার্সদের বিষয়ে অভিযোগটি আমার নজরে পড়েনি। যেহেতু অভিযোগ এসেছে, আমি আজই নার্সিং সুপারভাইজারের সঙ্গে কথা বলব। রোগীদের যত্নশীল সেবা নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রশিক্ষণের বিষয়ে জানানো হবে।' ঈদ উপলক্ষে রোগীদের জন্য উন্নত মানের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

সম্পর্কিত