কলকাতা বিমানবন্দর মসজিদে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা, বিজেপি সরকারের কড়া অবস্থান

প্রকাশ : ১৩ জুলাই ২০২৬, ২২: ২২
১৩৬ বছরের পুরনো গৌরীপুর জামে মসজিদ। সংগৃহীত ছবি

কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিতরে অবস্থিত ১৩৬ বছরের পুরনো গৌরীপুর জামে মসজিদ, যা অনেকের কাছে ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামেও পরিচিত, তাকে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য মসজিদে প্রবেশের পাস দেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে নিয়মিত নামাজ পড়তে আসা বহু মানুষের প্রবেশ আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না।’

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, মসজিদটি বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকার মধ্যে অবস্থিত। বিশেষ করে দ্বিতীয় রানওয়ের খুব কাছাকাছি হওয়ায় নিরাপত্তা এবং বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই এটি উদ্বেগের বিষয়। এতদিন আধার কার্ড দেখিয়ে দর্শনার্থীদের অস্থায়ী প্রবেশপত্র দেওয়া হতো। কিন্তু নিরাপত্তা পর্যালোচনার পর সেই ব্যবস্থা আপাতত স্থগিত করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়। একদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, বিমানবন্দরের মতো অতিসংবেদনশীল এলাকায় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী মহলের একাংশের দাবি, ধর্মীয় উপাসনার অধিকার যাতে অযথা ক্ষুণ্ণ না হয়, সেই বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই প্রসঙ্গে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, দেশের নিরাপত্তাই সবার আগে। তাঁর মতে, কোনো ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি জানান, বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করার কোনো সুযোগ নেই।

গৌরীপুর জামে মসজিদের ইতিহাস অবশ্য অনেক পুরনো। প্রায় ১৩৬ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদটি তখনকার সময়ে বিমানবন্দর ছিল না, সম্পূর্ণ অন্য পরিবেশে গড়ে উঠেছিল। পরে বিমানবন্দর সম্প্রসারণের ফলে এটি বিমানবন্দরের সীমানার মধ্যে চলে আসে। সেই থেকেই মসজিদটির ভবিষ্যৎ এবং সম্ভাব্য স্থানান্তর নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়নি।

বিদেশে বর্তমানে দুটি রানওয়ে রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান রানওয়েটিই সাধারণত বড় বিমান ওঠানামার জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো কারণে যদি মূল রানওয়েটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখতে হয়, তাহলে দ্বিতীয় রানওয়ের উপর নির্ভর করতে হয়। সেই দ্বিতীয় রানওয়ের খুব কাছেই রয়েছে এই ঐতিহাসিক মসজিদ। বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে দ্বিতীয় রানওয়েটিকে আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু মসজিদের অবস্থানের কারণে সেই কাজ দীর্ঘদিন ধরেই আটকে রয়েছে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি শুধু পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রশ্ন নয়, নিরাপত্তার বিষয়ও। প্রতিদিন বহু মানুষ বিমানবন্দরের সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করলে তাদের পরিচয় যাচাই, নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং নজরদারি বজায় রাখা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে বর্তমান আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে এই ধরনের সংবেদনশীল এলাকায় প্রবেশ আরও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে প্রশাসন।

তবে এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতাও হয়েছে। প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক ও জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের নেতা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, বহু বছর ধরে এই মসজিদে কোনো নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি হয়নি। তাই নামাজ বন্ধ করার বা প্রবেশ নিষিদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখছেন না। তাঁর মতে, প্রশাসন চাইলে আরও উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, কিন্তু উপাসনার সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা উচিত নয়।

প্রশাসনের তরফে এখনও পর্যন্ত মসজিদটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কোনো ঘোষণা করা হয়নি। আপাতত শুধুমাত্র প্রবেশপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে নিরাপত্তা পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত পরিবর্তনের ভিত্তিতে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে মসজিদ স্থানান্তরের সম্ভাবনাও আবার আলোচনায় এসেছে, যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনো সরকারি ঘোষণা করা হয়নি।

এই ঘটনাকে ঘিরে এখন দুটি বিষয় সমান গুরুত্ব পেয়েছে। একদিকে রয়েছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, অন্যদিকে রয়েছে ধর্মীয় উপাসনার অধিকার। প্রশাসনের দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রথম দায়িত্ব। অন্যদিকে বিরোধী ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলির বক্তব্য, নিরাপত্তা বজায় রেখেও উপাসনার অধিকার রক্ষা করার পথ খুঁজে বের করা সম্ভব।

আগামী দিনে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ, রাজ্য সরকার এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলির আলোচনার উপরই নির্ভর করবে এই ঐতিহাসিক মসজিদের ভবিষ্যৎ কী হবে। তবে আপাতত স্পষ্ট, কলকাতা বিমানবন্দরের এই শতাব্দীপ্রাচীন মসজিদকে ঘিরে নিরাপত্তা, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং ধর্মীয় অধিকারের প্রশ্ন একসঙ্গে উঠে এসে নতুন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত