এত জনপ্রিয় বালেন্দ্র শাহ, তবু কেন পদত্যাগ চায় জেন-জিরা

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ২০: ২৮
বালেন্দ্র শাহ। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

দুর্নীতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিধিনিষেধ এবং ব্যাপক বেকারত্বের অভিযোগে গতবছর নেপালজুড়ে তরুণদের নজিরবিহীন বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে চারবারের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সে সময় দেশের তরুণদের কাছে আশার প্রতীক হয়ে ওঠেন কাঠমুন্ডুর জনপ্রিয় ময়র বালেন্দ্র শাহ।

২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, নগর ব্যবস্থাপনায় সংস্কার এবং প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর বাইরে বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাবনা তৈরি করেন। ফলে নেপালের জেন-জি বা তরুণ প্রজন্মের বড় একটি অংশ তাঁকে নিজেদের প্রতিনিধি এবং পরিবর্তনের মুখ হিসেবে দেখতে শুরু করে। সেই জনপ্রিয়তায় ২০২৬ সালের মার্চে তিনি নেপালের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

কিন্তু ক্ষমতায় বসার মাত্র তিন মাসের মাথায় সেই সমর্থন ক্রমেই ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #JusticeForActivists, #StandWithGenZ, #Nepal Protest এর মতো হ্যাশট্যাগ ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন হঠাৎ তরুণ প্রজন্ম তাদের প্রিয়নেতা বালেন্দ্র শাহের উপর ক্ষিপ্ত? কেন তারা বালেন্দ্র শাহের পদত্যাগ দাবি করছে?

ঘটনার সূত্রপাত যেভাবে

গত বৃহস্পতিবার নেপালের সংবাদমাধ্যম দ্য কাঠমান্ডু পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কাঠমুন্ডুর পাসপোর্ট কার্যালয়ের সামনে গ্রাহকের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ২৫ বছর বয়সী গণেশ নেপালি নামের এক রাইড শেয়ারিং চালক। ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করার কারণে সেই সময় পুলিশের কয়েকজন সদস্য সেখানে হাজির হন এবং আকস্মিকভাবে তার মোটরসাইকেলের চাকায় তালা মেরে দেন এবং এক হাজার রুপি জরিমানা করেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, এই ঘটনার জেরে ব্যাপক ক্ষুব্ধ ও মরিয়া হয়ে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে নিজের শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন গণেশ।

পরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার মারা যান তিনি। মর্মান্তিক এই ঘটনা দেশটির সরকারের অনমনীয় আচরণ ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে আবারও উসকে দিয়েছে।

যুবকের আত্মহুতির জেরে গত রোববার (১২ জুলাই) রাজধানী কাঠমুন্ডুর সরকারি দপ্তর ‘সিংহদরবার সচিবালয়ের’ বাইরে শত শত মানুষ জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের অনেকের হাতেই ছিল ‘গরিবের ওপর নির্যাতন বন্ধ কর’ এবং ‘মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাও’ স্লোগান লেখা বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড। এ ছাড়া বিক্ষোভকারীরা প্রশাসনকে অবৈধ গ্রেপ্তার বন্ধ এবং বালেন শাহ সরকারের উচ্ছেদ অভিযানের শিকার বন্যায় ভূমিহীন বস্তিবাসীদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।

তিন জেন-জি অ্যাক্টিভিস্ট কেন আলোচনায়

আত্মাহুতির ঘটনার পর কীর্তিপুরের একটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যায় ও উচ্ছেদে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমিহীনদের মর্যাদাপূর্ণ আশ্রয়ের ব্যবস্থার পক্ষে সংহতি প্রকাশ করে বিক্ষোভ করেন নেপালের তিন জেন-জি অ্যাক্টিভিস্ট মজিদ আনসারি, সারিসমা থাপা এবং নেলসন ঘাটানি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ তাদের একজনকে লাঠিপেটা করে রক্তাক্ত করেন এবং বাকি দুজনকে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে গাড়িতে তোলেন। পরে তারা যেন আর কখনো বিক্ষোভ না করে এই মর্মে মুচলেকা স্বাক্ষরের পর তাদের ছেড়ে দেয় পুলিশ।

কেন বালেন্দ্র শাহের পদত্যাগ চায় জেন-জিরা

নেপালের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, প্রধানমন্ত্রী হয়েও বালেন্দ্র শাহ কেন দ্রুত হস্তক্ষেপ করলেন না। সমালোচকদের অভিযোগ মানবিক সংকটের সময় তিনি দৃশ্যমান নেতৃত্ব দেখাতে পারেননি। পুলিশি আচরণের বিরুদ্ধে দ্রুত অবস্থান নেননি। ক্ষোভে ফুঁসে ওঠা তরুণদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগও ছিল সীমিত। প্রশাসনের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে বিলম্ব করেছেন।

এদিকে তরুণদের এই ক্ষোভ কেবল একটি ঘটনার ফল নয়। জেন-জি নেপাল সংগঠনের দাবি, বালেন্দ্র শাহ সরকার জনবিরোধী ও স্বৈরাচারী শাসন চালাচ্ছে। সাম্প্রতিক বাজেট ও সরকারি নীতিতে যুবকদের কর্মসংস্থান বা আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের মতো কোনো বাস্তব পদক্ষেপ দেখা যায়নি। দেশের যুবসমাজের কর্মসংস্থান, আয় বৃদ্ধি ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সরকারের কোনো কার্যকর পরিকল্পনা নেই। ফলে তরুণ সমাজ তাঁর এই শাসনের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তরুণ প্রজন্মের দাবি, যে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটাতে বালেন্দ্র শাহকে ক্ষমতায় আনা হয়েছে, ক্ষমতার মসনদে বসে বালেন্দ্র শাহ সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছেন।

পরিবর্তনের প্রতীক থেকে এখন জবাবদিহির মুখে বালেন্দ্র শাহ। তরুণদের প্রশ্ন একটাই, যিনি একসময় প্রতিবাদের ভাষা ছিলেন, সংকটের মুহূর্তে তিনি কেন চুপ? এই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না মিললে, বালেন্দ্র শাহকে ঘিরে ক্ষোভ ও পদত্যাগের দাবি আরও জোরালো হওয়ার আশঙ্কায় দেখছেন বিশ্লেষকরা।

তথ্যসূত্র: কাঠমান্ডু পোস্ট, নেপালি টাইমস, এনডিটিভি ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত