নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে উন্মাদনা, পেছনে আছে কি পুরাণকাহিনির প্রভাব

রাহাত মিনহাজ
রাহাত মিনহাজ

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ২১: ৩৯
নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে উন্মাদনা, পেছনে আছে কি পুরাণকাহিনির প্রভাব? স্ট্রিম গ্রাফিক

অস্কারজয়ী ব্রিটিশ নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’ এখন আলোচনার তুঙ্গে। নোলান সময়ের আলোচিত নির্মাতা, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মহাকাশ অভিযান, ইতিহাস ও পুরাণ কাহিনিভিত্তিক সিনেমা তৈরির প্রতি তাঁর বিশেষ দুর্বলতা আছে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর অন্যতম বড় স্বপ্ন ছিল, ট্রয় সিনেমাটি নির্মাণ করা।

কিন্তু উলফগ্যাং পিটারসেন চলচ্চিত্রটি নির্মাণে উদ্যোগী হওয়ায় এবং তিনি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় তখন আর সেটি করা হয়নি। বলাই বাহুল্য, ব্রাড পিট (একিলিস) ও এরিক বেনা (হেক্টর) অভিনীত ‘ট্রয়’ ২০০৪ সালের অন্যতম সেরা সিনেমা। যা এখনও আগ্রহী দর্শকদের নিয়ে যায় হাজার বছরের পুরাতন গ্রিক পুরাণকথার এক রহস্যময় অধ্যায়ে।

‘ট্রয়’ সিনেমা নির্মাণের ইচ্ছে পূরণ না হলেও, ট্রয়ের পরের পুরাণ কথা নিয়ে একটি সিনেমা বানানোর পরিকল্পনা নোলান দীর্ঘদিন ধরেই করছিলেন। তাঁর সেই পরিকল্পনার সার্থক বাস্তবায়ন ‘দ্য ওডিসি’ এখন বিশ্বের সিনেমা থিয়েটারগুলোতে এক রকম ঝড় তুলছে। সমালোচকরাও করছেন চুলচেরা সব বিশ্লেষণ। এসব ঢামাডোলের মধ্যে আসুন একটু গ্রিক পুরাণ থেকে জেনে নিই নোলানের ‘দ্য ওডিসি’র হাজার বছরের গল্পগাঁথা।

হোমারের মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য ওডিসি’
হোমারের মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য ওডিসি’

গ্রিক পুরাণের প্রতি সারা বিশ্বের মানুষের আগ্রহ চিরকালের। এ কারণেই 'ইডিপাস' বা রাজা 'ওয়াইদিপাউস'-এর মতো নাটকগুলো আজও পৃথিবীর হাজার হাজার মঞ্চে প্রদর্শিত হয়। এ ছাড়া গ্রিক এইসব পুরাণকথার সঙ্গে আদৃষ্টবাদ, প্রেম-ভালোবাসা, কামনা-বাসনা, ষড়যন্ত্র, দেবতার বাণী, দেবতার আর্শিবাদ-অভিশাপের বিষয়গুলো এমন নাটকীয়ভাবে যুক্ত, যা মানুষকে দ্রুত আকর্ষিত করে। মানুষকে মোহিত করার মতো এমনই এক গ্রিক উপকথা ‘ওডিসি’। এটির অন্যতম প্রধান চরিত্র ওডিসিউস। রোমানরা গ্রিক ওডিসিউসকে ‘ইউলিসিস’ নামে ডাকত।

মার্কিন শিক্ষাবিদ ও ধ্রুপদী সাহিত্যিক এডিথ হ্যামিল্টনের ‘মিথলজি’ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪২ সালে। এই বইতে তিনি গ্রিক পুরাণকথা সাধারণ পাঠকের কাছে খুব সহজ ও সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। যে কারণে গ্রন্থটি এখনও বিশ্বের অন্যতম বহুল পঠিত ও চর্চিত। বাংলা ভাষাতেও অনুবাদ হয়েছে। আসুন, আসাদ ইকবাল মামুন অনুদিত ঐতিহ্য প্রকাশনের ‘মিথলজি’ অনুসারে একটু জেনে নিই ওডিসি এবং ওডিসিউসের পুরাণ কথা।

জার্মান চলচ্চিত্র পরিচালক এবং চিত্রনাট্যকার উলফগ্যাং পিটারসেনের সিনেমা ‘ট্রয়’ যারা দেখেছিলেন, তাঁরা নিশ্চয় মনে করতে পারবেন, ট্রয়-এর সমাপ্তি হয়েছিল ট্রয় নগরীর পতন ও গ্রিক বীর একিলিসের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। যুদ্ধ শেষে একিলিসের মরদেহ যখন পোড়ানো হচ্ছিল, তখন ট্রয়ও একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত, বিধ্বস্ত নগরী। ওডিসি এবং ওডিসিউসের কাহিনি এখান থেকেই শুরু, যা মহাকবি হোমারের মাধ্যমে প্রথম যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছিল।

গ্রিক দেবতাদের আশীর্বাদ ও অভিশাপের এই গল্পগুলো এতটাই রোমাঞ্চকর যে সেগুলোতে আজও সারাবিশ্বের লাখো পাঠক বুঁদ হয়ে থাকেন। সে কারণেই হয়তো নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে এত মাতামাতি। গ্রিক মিথলজিতে আগ্রহী বা আসক্ত পাঠকগণ নোলানের ‘দ্য ওডিসিতে’ হয়তো নতুন স্বাদের সন্ধান পেতে পারেন।

গ্রিক দেবতারা যেমন ট্রয় নগরীর পতনের ভবিষ্যতবাণী করেছিলেন, আবার ঠিক তেমনি দেবতাকূল বিশেষ করে ন্যায়বিচার ও যুদ্ধ কৌশলের দেবী অ্যাথেনা এবং সমুদ্র দেবতা পোসাইডন ট্রয় নগরীর ধ্বংসলীলায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। যে কারণে যুদ্ধজয়ী গ্রিকদের সমুদ্রপথে ফেরার পথে ভয়ংকর শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল। যেমন মাইসিনি রাজ্যের প্রতাপশালী রাজা আগামেমনন ফেরার পথে তীব্র ঝড়ে তার সবগুলো জাহাজ হারান। বীরদের পুণ্যভূমি স্পার্টার রাজা মেনেলাউসকে তীব্র স্রোত ভাসিয়ে নিয়েছিল মিশরে। আর ট্রয় যুদ্ধে চরম পাপী ও ভ্রষ্টাচারী হিসেবে ঘৃণিত সালামিসের রাজা অ্যাজাক্সতো পানিতে ডুবেই মরেছিল। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন একিলিসের পর অ্যাজাক্সকে সবচেয়ে যোগ্য বীর যোদ্ধা হিসেবে গণ্য করা হতো। এদের মধ্যেই ছিল ইথাকার রাজা ওডিসিউস। যার ট্রয় থেকে ঘরে ফেরার গল্পটি ছিল আরও রোমাঞ্চকর। এ যেন দেবতার সঙ্গে মানবের সরাসরি যুদ্ধ।

ট্রয় থেকে ফেরার সমুদ্র যাত্রায় সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয় ওডিসিউসকে। টানা ১০ বছর তাঁকে ও তাঁর সৈন্যদলকে সম্মুখীন হতে হয় অলঙ্ঘনীয় সব দুর্ভেদ্য প্রাচীরের। নোলান ‘দ্য ওডিসি’ সিনেমায় এই সংগ্রামকেই বড় পর্দায় তুলে ধরেছেন। গ্রিক পুরাণের ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, দেবতাদের অভিশাপে ওডিসিউসের দল প্রবল সমুদ্র ঝড়ে প্রায় লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। এরপর এক চোখা ভয়ংকর দৈত্য পলিফেমাসকে মোকাবিলা, জাদুকরি সির্সির—যিনি ওডিসিউসের দলের সদস্যদের শুকরে পরিণত করেছিলেন—কবল থেকে মুক্তিসহ নানা বিপদ জয় করেন। এরপর মুখোমুখি হন অর্ধেক নারী ও অর্ধেক পাখির মতো রূপধারী সাইরেনদের। পরের দিকে পাতালপুরীর দেবতা হেডিস ও ক্যালিপসোর দ্বীপের দুঃসাহসিক অভিযানই এই রূপকথার মূল চিত্রনাট্য।

‘দ্য ওডিসি’ পেইন্টিং। সংগৃহীত
‘দ্য ওডিসি’ পেইন্টিং। সংগৃহীত

অন্যদিকে, ইথিকায় অপেক্ষায় ছিলেন ওডিসিউসের রাণী পেনিলোপি ও পুত্র সন্তান টেলোমাকাস। সমরবিদ, রাজ্যের জ্যোতিষী থেকে শুরু করে গৃহের ভৃত্যরাও নিশ্চিত ছিলেন, রাজা ওডিসিউস মৃত্যুবরণ করেছেন। টানা ১০ বছর সমুদ্র পথে তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা নেই। যদিও পেনোলোপি ও পুত্র টেলোমাকাসের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ওডিসিউস ফিরবেন। কিন্তু ষড়যন্ত্র থামছিল না। পেনোলোপিকে বিয়ে করার জন্য প্রভাবশালীরা রাজ্যের রাজারা ভীড় করছিল। একজন সামান্য বালক টেলোমাকাসের কিছুই করার ছিল না। চারদিকে ছিল অপমান, তাচ্ছিল্য ও প্রবল চাপ। যদিও পেনোলোপি ও টেলোমাকাস হার মানেননি। শত প্রতিকূলতার মধ্যে ওডিসিউসের ফেরার অপেক্ষায় চালিয়ে গেছেন এক অসম যুদ্ধ। যে যুদ্ধে পেনোলোপি নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন। কখনও কখনও পরিচয় দিয়েছেন কঠোরতার। অন্যদিকে টেলোমাকাস ছিলেন দেবতা জিউসের প্রিয়পাত্র। তাই জিউস এক সময় টেলোমাকাসের অপেক্ষার অবসানের ইচ্ছে প্রকাশ করেন। এসবের সূত্র ধরেই ১০ বছর পর পরিবারের কাছে ফেরত আসেন ওডিসিউস।

গ্রিক দেবতাদের আশীর্বাদ ও অভিশাপের এই গল্পগুলো এতটাই রোমাঞ্চকর যে সেগুলোতে আজও সারাবিশ্বের লাখো পাঠক বুঁদ হয়ে থাকেন। সে কারণেই হয়তো নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ নিয়ে এত মাতামাতি। গ্রিক মিথলজিতে আগ্রহী বা আসক্ত পাঠকগণ নোলানের ‘দ্য ওডিসিতে’ হয়তো নতুন স্বাদের সন্ধান পেতে পারেন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত