জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

স্থায়ী পুনর্বাসন ও সামাজিক স্বীকৃতি চান উর্দুভাষীরা

প্রকাশ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩: ৫৭
মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে উর্দুভাষী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্ট্রিম ছবি

রাজধানীর ক্যাম্পগুলোতে বসবাসরত হাজারো উর্দুভাষী মানুষ ভোটকেন্দ্রে এসেছেন। তাঁদের দাবি—স্থায়ী পুনর্বাসন, মাদক নির্মূল এবং সামাজিক মর্যাদার পূর্ণ স্বীকৃতি।

বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে উর্দুভাষী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। মিরপুর বাংলা কলেজসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট দিতে আসা এই মানুষদের কথায় উঠে এসেছে মানবেতর জীবনযাপন আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাহীনতার গল্প।

আইনি নয়, চান সামাজিক স্বীকৃতি

দীর্ঘ ৩৭ বছর রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচয়হীন থাকার পর ২০০৮ সালে উচ্চ আদালতের রায়ে নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকার পান ক্যাম্পবাসীরা। কিন্তু এই আইনি স্বীকৃতি তাঁদের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে পারেনি। মিরপুরের তালাব ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ সেলিম ক্ষোভের সঙ্গে স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা আইডি কার্ড পাইছি, বিদেশেও গেছি। তারপরও অনেকে বলে “তোরা আটকা পড়া পাকিস্তানি”। এই কথা শুনলে কষ্ট হয়। যারা চোখ খুইলা পাকিস্তান দেখছে তারা আগে পাকিস্তানি। আমরা জন্মের পর চোখ খুইলা বাংলাদেশ দেখছি। তাইলে আটকা পড়া পাকিস্তানি কে?’

সেলিম আরও বলেন, ‘ভোট আমাদের অধিকার। যেই দলই আসুক, আমাদের ইয়াং জেনারেশনের জন্য পুনর্বাসন আর ভালো পরিবেশ চাই।’

বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে উর্দুভাষী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্ট্রিম ছবি
বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে উর্দুভাষী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্ট্রিম ছবি

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ আলীও একই সুর স্ট্রিমকে বলেন, ‘২০০৮ থেকে ভোট দিচ্ছি। সরকার আমাদের সিটিজেনশিপ দিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো পুনর্বাসন আর বাড়িঘরের অনেক আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কিছুই পাইনি।’

আবাসন সংকট

মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের ক্যাম্পে ১০ বাই ১০ ফুটের ঘরে গাদাগাদি করে বাস করে ৮-১০ জন মানুষ। মিল্লাত ক্যাম্পের মোহাম্মদ আবিদ স্ট্রিমকে বলেন, ‘জায়গা খুব কম, এক বাসায় পাঁচ-আটজন করে থাকতে হয়। পানির কষ্ট, বিদ্যুতের কষ্ট, গ্যাসের কষ্ট আছে।’

আবাসন ক্যাম্পের বাসিন্দা সোহেল আহমেদ জানান, চারজনের পরিবার এক রুমে থাকে, প্রধান সমস্যা টয়লেট ও বাথরুমের। আরেক বাসিন্দা রোকসানা স্ট্রিমকে বলেন, ‘এক রুমেই থাকি। খাট বিছিয়েও দিনের পর দিন খুব কষ্ট করে ঘুমাতে হয়। ঘরে চারপাশে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। সরকারের কত খাস জমি আছে, আমাদের পুনর্বাসনে এই জমিগুলো বরাদ্দ দিলে সংকট কিছুটা কমত।’

তালাব ক্যাম্পের সেলিম জানান, বিয়ের পর আলাদা রুমের দরকার হলেও জায়গা নেই, তাই ঝুঁকি নিয়ে দুই-তিন তলা ঘর তুলতে হচ্ছে। ওয়াপদা বিল্ডিং ক্যাম্পের নূরজাহান ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুরবস্থা ও অনিয়মিত গ্যাস-পানির অভিযোগ করেন।

মাদকমুক্ত সমাজের আশা

জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইসমাইল ভোট দিয়ে এসে স্ট্রিমকে বলেন, ‘একটাই সমস্যা মাদক। এই সমস্যাটা যদি কোনো জনপ্রতিনিধি দূর করে দেয়, তাকে আমরা আল্লাহর ওলি মনে করব।’ তিনি অভিযোগ করেন, অভিযানের সময় মূল অপরাধীরা পালিয়ে যায় আর নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হয়।

বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে উর্দুভাষী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্ট্রিম ছবি
বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে উর্দুভাষী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। স্ট্রিম ছবি

মিল্লাত ক্যাম্পের আবিদ জানান, বাসার সামনে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়। প্রতিবাদ করলে উল্টো মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। তালাব ক্যাম্পের তরুণী ভোটার সুমি স্ট্রিমকে বলেন, ‘সন্ধ্যার পর কোনো মেয়ে নিরাপদে বাসা থেকে বের হতে পারে না। নেশাখোরদের সরিয়ে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।’

মাদ্রাসা ক্যাম্পের খালেদা বেগম জানান, তাঁর স্বামী নেশাসক্ত, ঘরে খাবার নেই। তিনি নেতাদের কাছে নেশাজাতীয় দ্রব্য বন্ধের দাবি জানান।

শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সংকটও প্রকট

মোহাম্মদ আলী জানান, সরকারি স্কুলে উর্দুভাষী শিশুদের ভর্তিতে অনেক সময় বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। রাশেদা রানী জানান, তাঁর মেয়ে দশম শ্রেণিতে পড়লেও ভালো শিক্ষার জন্য অনেক কষ্টে বাইরে প্রাইভেটে পড়াতে হচ্ছে। মাদ্রাসা ক্যাম্পের এক তরুণ ভোটার অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে এখন বেকার। তিনি ইয়াং জেনারেশনের জন্য কাজের সুযোগ চান।

এত বঞ্চনা আর কষ্টের মধ্যেও ভোটের দিনটিকে তাঁরা ‘ঈদের মতো’ মনে করছেন। মাদ্রাসা ক্যাম্পের হালিমা বেগম স্ট্রিমকে বলেন, ‘ভালো লাগছে, ঈদের মতো লাগতাছে। সবাই আনন্দ করতাছে। আল্লাহ যেন ভালোভাবে, শান্তিপূর্ণভাবে ভোট হয়।”

আবাসন ক্যাম্পের সোহেল আহমেদ বলেন, কঠিন পরিস্থিতি সত্ত্বেও দেশ ও রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসার কারণে তাঁরা ভোট দিতে এসেছেন।

ক্যাম্পবাসীরা কেবল ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল ‘উদ্বাস্তু’ হয়ে থাকতে চান না; তাঁরা চান রাষ্ট্রের সমান অংশীদার হতে। ২০২৬ সালের এই নির্বাচন তাঁদের দীর্ঘস্থায়ী মুক্তির পথে কোনো নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে কি না, উর্দুভাষীরা এখন সেই অপেক্ষায়।

Ad 300x250

সম্পর্কিত