জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন: ভোটারদের মনস্তত্ত্ব ও জয়-পরাজয় নির্ধারণী ইস্যুসমূহ

স্ট্রিম গ্রাফিক

আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সারা দেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গণভোট ও জাতীয় নির্বাচন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এই নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান যে 'নতুন বাংলাদেশ'-এর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, এই নির্বাচন তারই প্রথম অগ্নিপরীক্ষা। এবারের নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের লক্ষ্যে একই দিনে আয়োজিত হচ্ছে 'জুলাই সনদ'-এর ওপর ঐতিহাসিক গণভোট।

একদিকে ৩০০ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচন, অন্যদিকে সংবিধানের আমূল সংস্কারে জনগণের প্রত্যক্ষ সম্মতি—এই দ্বিমুখী প্রক্রিয়া বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এই নির্বাচন কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে রূপান্তরের এক চূড়ান্ত প্রয়াস।

২০২৬ সালের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতায় একটি বিপ্লবী ও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, যা প্রথাগত রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। প্রথাগতভাবে বাংলাদেশের ভোটাররা নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট দিয়ে আসতেন নিছক দলীয় আনুগত্যের ভিত্তিতে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটারদের মধ্যে 'ব্লাইন্ড পলিটিক্যাল লয়্যালটি' বা অন্ধ দলীয় আনুগত্যের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত স্বচ্ছতা, দলের ভবিষ্যৎ ইশতেহার এবং সংস্কারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার গুরুত্ব বেড়েছে।

অতীতে ভোটকেন্দ্র দখল বা প্রাণহানির আশঙ্কায় সাধারণ মানুষ ভোটবিমুখ হয়ে পড়তেন। ২০২৬ সালের নির্বাচনে নির্ভয় ও উৎসবমুখর পরিবেশ হতে পারে, যা ভোটারদের কেন্দ্রমুখী করে তুলতে পারে। নিজের মত নির্ভয়ে প্রকাশের এই মানসিক প্রস্তুতি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াতে পারে, কারণ পেশিশক্তির জোরে ফলাফলের ওপর আর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হবে না।

জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান অর্জন ছিল 'রাষ্ট্র মেরামতের' চেতনা। ভোটারদের মনস্তত্ত্বে এখন এই বিশ্বাস গেঁথে গেছে যে, ভোট কেবল সরকার গঠনের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রব্যবস্থার যে পচনশীল রূপ তারা দেখেছেন, তা মেরামতের জন্য। ফলে যে দল সংস্কারের গ্যারান্টি দিতে পারবে, ভোটারদের ঝোঁক তাদের দিকেই বেশি হবে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের প্রধান চাবিকাঠি রয়েছে তরুণ প্রজন্মের হাতে। হালনাগাদ ভোটার তালিকা অনুযায়ী, ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪৪ শতাংশই তরুণ (১৮-৩৭ বছর বয়সী)। এই জেনারেশন জেড বা 'জেন-জি' ভোটাররা অন্য যেকোনো প্রজন্মের তুলনায় বেশি সচেতন ও তথ্যনির্ভর। ডিজিটাল লিটারেসির কারণে এই তরুণরা রাজনৈতিক দলগুলোর ফাঁপা প্রতিশ্রুতি দ্রুত ধরে ফেলতে পারে। তাদের কাছে প্রথাগত রাজনীতির 'আবেগীয় বয়ান' খুব একটা কার্যকর নয়। তারা চায় আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, নিরাপদ সড়ক, বাকস্বাধীনতা এবং সবচেয়ে বড় কথা—যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থান।

এই তরুণরাই জুলাই অভ্যুত্থানের অগ্রসেনানী ছিল এবং তারাই এখন ক্ষমতার নতুন 'কিংমেকার'। বড় রাজনৈতিক দলগুলো (বিএনপি, জামায়াত) যেমন তাদের কাছে টানার চেষ্টা করছে, তেমনি ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির মতো নতুন রাজনৈতিক শক্তিগুলোও তরুণদের সমর্থন নিয়ে এক বড় ফ্যাক্টর হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

২০২৬ সালের নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে কয়েকটি ফ্রন্টে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবে। প্রথমত, সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও দুর্নীতি দমন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এবং সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। ভোটাররা এখন এমন নেতৃত্ব খুঁজছেন যারা সিন্ডিকেট ভাঙতে পারবে এবং টেন্ডারবাজি ও স্থানীয় পর্যায়ের চাঁদাবাজি নির্মূল করতে পারবে। নির্বাচনে যে দল দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দিতে পারবে, তারাই এগিয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। এটি মূলত রাষ্ট্র সংস্কার ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি সামাজিক চুক্তি।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। ২০২৬ সালের শুরুতে বাংলাদেশের সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির হার ৮.৫৮ শতাংশ, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো সাধারণ মানুষের নাগালে আসেনি। চাল, ডাল, তেলের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ভোটারদের কাছে সবচেয়ে বড় ইস্যু। যারা একটি টেকসই অর্থনৈতিক রূপরেখা এবং তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা দেবে, ভোটাররা তাদেরকে বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

তৃতীয়ত, সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন; নির্বাচনের সাথে আয়োজিত গণভোটে ৩০টি প্রধান সংস্কার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা (সর্বোচ্চ ১০ বছর), দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠন (উচ্চকক্ষে ১০০ সদস্য), নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সাংবিধানিক স্থায়ী রূপ, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা। ভোটের মাঠে দলগুলোর অবস্থান, তারা এই সংস্কারগুলোকে কতটা আন্তরিকভাবে সমর্থন করছে, তা ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি শিক্ষিত ভোটারদের কাছে প্রধান বিবেচ্য।

চতুর্থত, আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বিগত সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিপ্লব-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে যারা জনমনে নিরাপত্তার বোধ ফিরিয়ে আনতে পারবে, সাধারণ ভোটাররা তাদের ওপরই আস্থা রাখবে। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষার ইস্যুটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও বাংলাদেশের নির্বাচন কখনোই কেবল দেশের সীমানার ভেতর সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব মোকাবিলার কৌশলকে ভোটাররা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেবে। ভারতের সাথে নিরাপত্তা ও ট্রানজিট ইস্যু, চীনের বিনিয়োগ এবং আমেরিকার মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের মানদণ্ড—এই বিষয়গুলো বাংলাদেশের ভোটারদের জাতীয়তাবাদী চেতনাকে স্পর্শ করে।

ভোটাররা দেখতে চান ভারতের সাথে সম্পর্কটি যেন 'পারস্পরিক স্বার্থের' ভিত্তিতে হয়, কেবল 'একতরফা' কোনো সুবিধা না হয়। বড় বড় মেগা প্রজেক্ট ও অবকাঠামো উন্নয়নে চীনের বিনিয়োগ ভোটারদের চোখে উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে কাজ করে। তবে ঋণের ফাঁদ বা সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি নিয়ে সচেতন ভোটাররা সজাগ। পশ্চিমাদের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভোটাররা এমন নেতৃত্ব চান যারা আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করে দেশের সম্মান বজায় রাখতে পারবে।

জেন-জি ভোটাররা তথ্যের সহজলভ্যতার কারণে এখন জানে কোন দেশ বাংলাদেশে কী ভূমিকা রাখছে। ফলে কোনো দলের নির্বাচনী ইশতেহারে যদি পররাষ্ট্রনীতির স্পষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ রূপরেখা না থাকে, তবে তারা এই সচেতন ৪৪ শতাংশ ভোটারের আস্থা হারাতে পারে। বিশেষ করে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো দলের নতজানু নীতি থাকলে সচেতন ভোটাররা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলে যে দলের গ্রহণযোগ্যতা বেশি এবং যারা ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির আশ্বাস দিতে পারবে, ভোটাররা তাদেরকেই বেছে নিতে চাইবে।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে যে বিশাল ভোটার গোষ্ঠী এখন সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে, তাদের অংশগ্রহণ এবং ভোটাধিকার প্রয়োগই হবে জয়-পরাজয়ের মূল চাবিকাঠি। এই ভোটগুলো কি বিএনপি, জামায়াত নাকি বিকল্প কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে বেছে নেবে, তার ওপরই নির্ভর করছে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল। এক্ষেত্রে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং দৈনন্দিন জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিই ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রধান হাতিয়ার। স্থানীয় পর্যায়ে যারা ভোটারদের স্বাভাবিক ও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা দিতে পারবে, তাদের দিকেই এই বিশাল অংশের সমর্থন ঝুঁকে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণ। এটি মূলত রাষ্ট্র সংস্কার ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি সামাজিক চুক্তি।

নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার ওপরই নির্ভর করছে একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ। রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়, তবে গণঅভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। মূলত ভোটারদের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরই নির্ধারণ করবে, বাংলাদেশ কি পুরনো ধারার রাজনীতিতে আবর্তিত হবে, নাকি এক বৈষম্যহীন ও আধুনিক নাগরিক রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

  • ড. মো. আবু সালেহ: শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
Ad 300x250

সম্পর্কিত