জ্বালানি সংকটে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যাহত, বাড়ছে লোডশেডিং

দেশে দিনে ও রাতে গড়ে এখন ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট।

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

স্ট্রিম গ্রাফিক

জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দেশে বর্তমানে ৩৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদার চেয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হলেও বিতরণ কোম্পানিগুলোকে লোডশেডিংয়ের পথে হাঁটতে হচ্ছে।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) গত কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, পিক আওয়ারে (সর্বোচ্চ চাহিদার সময়) সারা দেশে লোডশেডিং ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

বিদ্যুতের ঘাটতি ১ হাজার মেগাওয়াট হলে সারা দেশে এক থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হয়। রাজধানী বা শহর এলাকার তুলনায় গ্রামে লোডশেডিং বেশি দেওয়া হয়। বর্তমানে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের ব্যবহার কমায় দোকানপাট ও শপিং মল সন্ধ্যা ৭টায় বন্ধ হলেও লোডশেডিং কমানো যাচ্ছে না।

পিডিবি ও পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র (আমদানিসহ) রয়েছে। এগুলোর সর্বমোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। আর প্রকৃত ব্যবহারযোগ্য সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট। এর মধ্যে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ১২ হাজার ৪৭২ মেগাওয়াট, কয়লাভিত্তিক ৬ হাজার ২৭৩ মেগাওয়াট, ফার্নেস অয়েলের ৫ হাজার ৬৪১ মেগাওয়াট এবং সৌরবিদ্যুৎ ৮৩৯ মেগাওয়াট।

পিডিবির গত কয়েক দিনের তথ্য বলছে, দেশে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ১২ এপ্রিল (রোববার) সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় সারা দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে ১৩ হাজার ৯২৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ, মোট সক্ষমতার অর্ধেকেরও কম বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাকি অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি থাকায় কিছুটা লোডশেডিং হচ্ছে। অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র কয়লার ঘাটতির কারণে বন্ধ রয়েছে। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হলে আমরা চাহিদার পুরো জোগান দিতে পারব।’

পিজিসিবির আওয়ারলি বা ঘণ্টাসূচক ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত কয়েক দিন ধরে দিন ও রাত—উভয় সময়েই লোডশেডিং হচ্ছে। ১২ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭টায় দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৯৫০ মেগাওয়াট। ওই সময় উৎপাদন করা সম্ভব হয় ১৩ হাজার ৮৪৭ মেগাওয়াট। ফলে ওই এক ঘণ্টাতেই লোডশেডিং করতে হয় ১ হাজার ৫৩ মেগাওয়াট।

সোমবার বেলা ১টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট, বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৬৪৫ মেগাওয়াট। এ সময় লোডশেডিং ছিল ৯১২ মেগাওয়াট।

৩৩ কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত

পিডিবির তথ্য বলছে, সারা দেশে বর্তমানে অন্তত ৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘আন্ডার মেইনটেন্যান্স’ বা রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি না থাকার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর মধ্যে ঘোড়াশাল, হরিপুর, মেঘনাঘাট, আশুগঞ্জ, সিদ্ধিরগঞ্জ এবং বড়পুকুরিয়ার মতো কেন্দ্রগুলোর বেশ কয়েকটি ইউনিট রয়েছে।

জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। ঢাকা জোনে ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যাদের মোট সক্ষমতা ৬ হাজার ৭৬৭ মেগাওয়াট। কিন্তু গ্যাস ও ফার্নেস অয়েলের অভাবে ১২ এপ্রিল সন্ধ্যায় ঢাকা জোনে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছে মাত্র ২ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট।

চট্টগ্রাম জোনে দেশের বড় বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো। এই জোনের ২৩টি কেন্দ্রের সক্ষমতা ৪ হাজার ৯১৬ মেগাওয়াট, অথচ গতকাল উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৭২ মেগাওয়াট।

কয়লার অভাবেও দেশের বড় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন পূর্ণমাত্রায় করা যাচ্ছে না। ১ হাজার ১৫০ মেগাওয়াট সক্ষমতার মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রটি থেকে গতকাল সন্ধ্যায় মিলেছে মাত্র ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। চট্টগ্রামের বাঁশখালীর এসএস পাওয়ারের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট। এই কেন্দ্র থেকে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ২৯০ মেগাওয়াট। ১ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার রামপাল (মৈত্রী সুপার থার্মাল) কেন্দ্রটি অর্ধেক উৎপাদন করছে। গতকাল কেন্দ্রটি থেকে ৬০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে।

তবে এর মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র। ১ হাজার ২৪৪ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রটি থেকে ১ হাজার ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ভারতের আদানি পাওয়ারের ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট সক্ষমতার কেন্দ্রটি থেকে সন্ধ্যায় ১ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে।

জাতীয় গ্রিডে ১ হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং থাকা মানে মাঠপর্যায়ে গ্রাহকদের অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মুখে পড়া। এই ঘাটতির পুরো চাপটাই গিয়ে পড়ছে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ওপর।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলার সংকটের কারণে পর্যাপ্ত জ্বালানি কেনা সম্ভব হচ্ছে না। তাই লোডশেডিং অনিবার্য হয়ে গেছে। সামনে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়বে। ডলারের সংস্থান করা না গেলে গ্রীষ্মের বাকি দিনগুলোতে দেশজুড়ে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘দেশে তেলভিত্তিক বিদ্যুতের দরকার নেই। আমাদের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সাত হাজার মেগাওয়াটের ওপর। এটি গত বছরে ৪৫ শতাংশ ক্যাপাসিটিতে চলেছে। এটি ৯০ শতাংশ পর্যন্ত চালানো যায়। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ বন্ধ করে যদি আমরা কয়লার সরবরাহ বাড়াই, তাহলে পূর্ণ ক্যাপাসিটিতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ব্যবহার করা সম্ভব।’

সম্পর্কিত