বাজেট: স্বাস্থ্য খাতে যেসব ঘোষণা সরকারের

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ১১ জুন ২০২৬, ১৭: ১৬
বাজেটে স্বাস্থ্য খাত । স্ট্রিম গ্রাফিক

স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক সংস্কার, সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ০১ শতাংশ।

বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এসব ঘোষণা দেন।

অর্থমন্ত্রী বলেন, একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গঠনই টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের পূর্বশর্ত। অতীতের সরকারগুলো স্বাস্থ্য খাতে বিপুল ব্যয় করলেও দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে স্বাস্থ্যসেবার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। ফলে দেশের হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত রোগীর চাপে রয়েছে, সাধারণ মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ায় বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।

বাজেট বক্তৃতায় সরকার স্বাস্থ্য খাতের পাঁচটি প্রধান লক্ষ্য তুলে ধরে। এগুলো হলো সর্বজনীন ও ন্যায়সংগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা; চিকিৎসাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা থেকে প্রতিরোধকেন্দ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় রূপান্তর। গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য জোরদার করা, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি ও চিকিৎসা শিল্পের বিকাশ ঘটানো।

প্রতিটি ইউনিয়নে স্বাস্থ্য ইউনিট

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে এবং শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে এক বা একাধিক আধুনিক প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।

এ ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার আওতায় প্রত্যেক নাগরিককে জাতীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অধীনে আধুনিক ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

জেলা হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসা

সরকার প্রতিটি জেলা হাসপাতাল ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সমন্বিতভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘সেকেন্ডারি স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি মা, নবজাতক, শিশু ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা এবং ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থা থাকবে।

অন্যদিকে সার্জারিসহ জটিল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে কেন্দ্রীভূত করা হবে। সেখানে করোনারি কেয়ার ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিসসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত সেবা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।

রোগী পরিবহনে ভোগান্তি কমাতে দেশব্যাপী ‘জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল ও জরুরি সেবা নেটওয়ার্ক’ গঠনের কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

পুষ্টি, টিকা ও শিশুস্বাস্থ্য

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের খর্বাকৃতি বা স্টান্টিং মোকাবিলায় বহুমুখী ও বহু-খাতভিত্তিক জাতীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একইসঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক ও আধুনিক জাতীয় পুষ্টি কর্মসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, অতীতের অব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার অভাবে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যেই প্রায় শতভাগ শিশুকে হাম-রুবেলা টিকার আওতায় এনেছে।

চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ

স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট দূর করতে অবিলম্বে ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। পাশাপাশি দেশব্যাপী নতুন করে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ কার্যক্রম শুরু হয়েছে, যার ৮০ শতাংশ হবেন নারী।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষায় উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং নার্সিং বিষয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে আসন বৃদ্ধির কথাও জানান তিনি।

এ ছাড়া ইন্টিগ্রেটেড মডুলার পদ্ধতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চিকিৎসা জ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার অন্তর্ভুক্ত করে নতুন এমবিবিএস কারিকুলাম চালুর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরা হয়।

ওষুধ ও চিকিৎসা শিল্পে জোর

দেশীয় ওষুধ শিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে এপিআই (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট) শিল্পে অবকাঠামো, গবেষণা ও বিনিয়োগে সহায়তা অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও ওষুধ শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে আর্থিক প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

এ ছাড়া প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত প্রয়োজনীয় ওষুধ ও টিকা পৌঁছে দিতে একটি আধুনিক ও টেকসই জাতীয় ওষুধ ও ভ্যাকসিন সরবরাহ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

স্বাস্থ্য বাজেটে বড় বৃদ্ধি

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে, যা জিডিপির ১ দশমিক ০১ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৫ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যও ঘোষণা করেছে সরকার।

সম্পর্কিত