হামের টিকাদান শুরু রোবাবার, তিন ধাপে পরিকল্পনার পরামর্শ

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৯: ২৮
হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুরা। ছবি: সংগৃহীত

মার্চ মাসেই সারা দেশে হামে অর্ধশতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত ছাড়িয়েছে সাত শর বেশি। হাসপাতালে শয্যা ও আইসিইউ সংকটে দিশাহারা রোগীর স্বজনেরা। এমন পরিস্থিতিতে রোববার থেকে দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা তিন ধাপে পরিকল্পনা করে জাতীয় নির্দেশিকা প্রস্তুতের পরামর্শ দিয়েছেন।

বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, এই মুহূর্তে আপদকালীন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা দরকার। আর এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দ্রুত অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করতে হবে। এরপর তিনটি ধাপে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদে রোগীদের আইসোলেট করে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিতে হবে। এ জন্য একটি জাতীয় নির্দেশিকা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট চিকিৎকদের ওরিয়েন্টেশেন দিতে হবে। আগামী কয়েক দিনের জন্য চিকিৎসার আগাম প্রস্তুতি নিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, মধ্যমেয়াদে যত দ্রুত সম্ভব টিকা কার্যক্রম শুরু করতে হবে। আর দীর্ঘমেয়াদে গবেষণা করতে হবে যে, কেন এমনটি ঘটলো। এটি যেন ভবিষ্যতে না হয় বা পুনরাবৃত্তি না ঘটে; কারণ বের করে তাই ব্যবস্থা নিতে হবে।

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামে আক্রান্তদের অধিকাংশের বয়স ১০ মাসের নিচে। এমনকি প্রথম টিকা নেওয়ার বয়স (৯ মাস) হওয়ার আগেই অনেক শিশু হামে আক্রান্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদেরা এটিকে উদ্বেগজনক বলছেন।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ স্ট্রিমকে বলেন, জন্মের পর বেশ কয়েক মাস পর্যন্ত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি শিশুকে হামের জীবাণু থেকে সুরক্ষিত রাখে। এ কারণে ৯ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। কিন্তু এর আগেই কেন শিশুরা ব্যাপক হারে হামে আক্রান্ত হচ্ছে, এটি খতিয়ে দেখতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় সারা দেশের সব শিশুকে হামের টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়ে থাকে। ৯ মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে সাধারণত এ টিকা দেওয়া হয় না। দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে।

হামের প্রাদুর্ভাবে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, বরিশাল ও ময়মনসিংহসহ বেশ কয়েকটি জেলার পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ঢাকায়ও শিশুরা এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ঢাকা ও বাইরের জেলাগুলোর ‘গুরুতর’ অবস্থার রোগীরা ভর্তি হচ্ছে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট এবং মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। এই দুই হাসপাতালে এখন সক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

শিশু হাসপাতালে মঙ্গলবার ২২ শিশু ভর্তি হয়েছে। চলতি বছর এই হাসপাতালে ১২৪ শিশু ভর্তি হয়, যার মধ্যে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে শয্যার অভাবে রোগীদের বারান্দা ও মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এই হাসপাতালে গতকাল ভর্তি হয় ৪২ শিশু। গত মার্চ মাসে হাসপাতালটিতে ২৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃতরা হামে আক্রান্ত হলেও অন্য জটিলতাও ছিল।

সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, শুধু হাম নিয়ে ভর্তি রোগীদের গড়ে পাঁচ থেকে সাত দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে তা বেড়ে ১০ থেকে ১৪ দিন পর্যন্ত থাকতে হচ্ছে। শয্যাসংকটে হাম ও জলবসন্তের রোগীদের ঝুঁকির আশঙ্কা সত্ত্বেও একসঙ্গে রাখতে হচ্ছে।

এদিকে, টিকা নিয়ে সংকট ও সমালোচনার মুখে অবশেষে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বুধবার জানিয়েছেন, আগামী রোববার থেকেই হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। ৬ মাস বয়সী থেকে ১০ বছর বয়সী পর্যন্ত শিশুদেরও এই টিকা দেওয়া হবে বলে জানান মন্ত্রী।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মধ্যে টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে সারা দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সারা দেশে টিকা কার্যক্রম ভালোভাবে সম্পন্ন করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ছুটি বাতিল করা হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি শুরু করলেই হবে না, সংক্রমণ ঠেকাতে দ্রুত রোগী শনাক্তকরণ (কনটাক্ট ট্রেসিং) এবং আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিষয়:

টিকাহাম

সম্পর্কিত