নন্দলালপুর চরবাসীর দুর্ভোগ, ৩ কিলোমিটার নৌপথে একটি ট্রলারই ভরসা

স্ট্রিম সংবাদদাতা
স্ট্রিম সংবাদদাতা
দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা)

ছাউনিবিহীন ট্রলারে পদ্ম নদী পার হন নন্দলালপুর চরের বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি

রাজধানী থেকে দোহার উপজেলার নন্দলালপুর চরের দূরত্ব মাত্র ৪৫ কিলোমিটার। তবে উপজেলার মূল ভূখণ্ড থেকে এই দ্বীপে যেতে পাড়ি দিতে হয় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ নৌপথ। এখানে খোলা ছাউনির ইঞ্জিনচালিত নৌকাই চরের বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে একটি মাত্র ট্রলারে প্রতিদিন পদ্মা নদী পাড়ি দিতে হয় তাঁদের। আকাশে মেঘের ঘনঘটা বা ঝড়ের আভাস দেখা দিলে পারাপার বন্ধ হয়ে ব্যাহত হয় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। এদিকে নদী পারাপারে দিনে মাত্র একটি ট্রলার নির্দিষ্ট করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন চরবাসী। স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতা এই নৌ-চলাচল ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে যাত্রী ও চালকদের সূত্রে জানা গেছে।

নারিশা ও নন্দলালপুরের বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রায় দুই যুগ আগে পদ্মার ভাঙনে নারিশা ইউনিয়নের দক্ষিণ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম মূল ভূখণ্ড থেকে আলাদা হয়ে যায়। কয়েক বছর পর নদীর মাঝে চর জেগে ওঠে। পুরোনো নথিতে এটি ‘নন্দলালপুর চর’ হিসেবে পরিচিত। সেখানে সরদারকান্দি, সিকদারকান্দি, মোল্লাকান্দি, চুঙ্গাকান্দি, হাওলাদারকান্দি, দর্জিকান্দি, ঈমান ব্যাপারীকান্দি, তুতা খা’র গ্রাম ও মালেকের গ্রামের মতো বেশ কয়েকটি ছোট গ্রাম রয়েছে। কয়েক বছর আগেও নারিশা থেকে নন্দলালপুরের দূরত্ব ছিল মাত্র আধা কিলোমিটার। তবে ভাঙনের ফলে নদী প্রশস্ত হয়ে এখন প্রায় ৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়।

দিনে একটিমাত্র ট্রলারে পদ্ম নদী পার হন নন্দলালপুর চরের বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি
দিনে একটিমাত্র ট্রলারে পদ্ম নদী পার হন নন্দলালপুর চরের বাসিন্দারা। স্ট্রিম ছবি

সম্প্রতি নন্দলালপুর চর ঘুরে দেখা গেছে, কৃষিই এখানকার মানুষের প্রধান পেশা। বাদাম, ধান, ভুট্টা, মাষকলাই, কলা চাষ এবং মাছ শিকার ও গবাদিপশু পালনের মাধ্যমে তাঁরা জীবিকা নির্বাহ করেন। চরে বড় কোনো হাট-বাজার না থাকায় কৃষিপণ্য বিক্রির জন্য তাঁদের পদ্মা পাড়ি দিয়ে নারিশা, মেঘুলা ও জয়পাড়া বাজারে আসতে হয়। এ ছাড়া চিকিৎসা, শিক্ষা ও দাপ্তরিক কাজের জন্য তাঁদের নিয়মিত উপজেলা সদরে যেতে হয়।

নন্দলালপুর চরে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। রোদ-বৃষ্টির দুর্ভোগের মধ্যেই সারা বছর ইঞ্জিনচালিত খোলা নৌকায় নদী পার হয়ে মূল ভূখণ্ডে আসে শিক্ষার্থীরা। ঝড়বৃষ্টির দিনে বা বর্ষায় নদীতে পানির স্রোত বেড়ে গেলে ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের পারাপার হতে হয়। নারিশা উচ্চবিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান জানায়, পদ্মা নদী উত্তাল থাকলে নৌকা চলাচল বন্ধ থাকে, তখন আর স্কুলে যাওয়া হয় না। নৌকায় ওঠার সময় ও নামার সময় তাঁদের হাঁটু সমান পানি ভেঙে যাতায়াত করতে হয়। সন্তানকে নারিশা মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর জন্য নৌকা পার হচ্ছিলেন আকলিমা নামের এক নারী। তিনি জানান, বৈরী আবহাওয়া ও জোয়ারের সময় ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের পারাপার হতে হয়।

শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমুস সিহার বলেন, ‘নন্দলালপুর চরটি দোহার ও চরভদ্রাসন—এই দুই উপজেলার মাঝে পড়েছে। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়তে হলে দুই উপজেলার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এখন যেসব শিক্ষার্থী দোহারের মূল ভূখণ্ডে আসে, তাঁদের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেট বা বিশেষ নৌকার বিষয়ে ইউএনও মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নিতে হবে।’

ট্রলারে ওঠা-নামার সময় পানি মারাতে হয় নন্দলালপুর চরের যাত্রীদের। স্ট্রিম ছবি
ট্রলারে ওঠা-নামার সময় পানি মারাতে হয় নন্দলালপুর চরের যাত্রীদের। স্ট্রিম ছবি

দোহারের নারিশা থেকে ফরিদপুরের চরভদ্রাসন পর্যন্ত নৌরুটটি সরকারি বার্ষিক ইজারায় চলে। এর অধীনেই পরিচালিত হয় নারিশা-নন্দলালপুর নৌ-পারাপার। তবে স্থানীয় প্রভাবশালীরা এটি নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শাহীন খন্দকার এটি নিয়ন্ত্রণ করছেন। চালক ও যাত্রীরা জানান, ইঞ্জিনচালিত নৌকা প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলাচল করে। প্রতিবার যাতায়াতে সময় লাগে এক ঘণ্টা। একটি ট্রলার দিনে আট থেকে নয়বার পারাপার করতে পারে। জনপ্রতি ২০ টাকা ভাড়ায় প্রতিবার ৭০ থেকে ৮০ জন যাত্রী পরিবহন করা হয়। নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে কোনো যাতায়াতের সুযোগ নেই। চরে কেউ অসুস্থ হলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রলারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

নন্দলালপুর এলাকার মাছ ব্যবসায়ী মোতালেব ব্যাপারী জানান, জেলেদের কাছ থেকে মাছ কিনে বিক্রির জন্য উপজেলা সদরে যেতে হয়, কিন্তু সময়মতো ট্রলার না পেলে বাজার ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। ট্রলারচালক মনির হোসেন বলেন, ‘নারিশা-নন্দলালপুর ঘাটে তিনটি ট্রলার তিন দিন করে পর্যায়ক্রমে পারাপার করে। একটি ট্রলার তিন দিন চালানোর পর আবার সুযোগ পেতে ছয় দিন অপেক্ষা করতে হয়। একসঙ্গে দুটি ট্রলার চালানোর অনুমতি নেই।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিএনপি নেতা শাহীন খন্দকারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিকবার কল ও বার্তা পাঠানো হলেও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। নারিশা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান ও নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা মো. আলমগীর হোসেন জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে বিদেশে অবস্থান করছেন। বর্তমানে ইউপি প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা দোহার উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসানকেও ফোনে পাওয়া যায়নি।

দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাঈদুল ইসলাম জানান, নন্দলালপুর চরাঞ্চলের মানুষ ঝুঁকি নিয়ে নৌকায় যাতায়াত করছেন। যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত